ইরানে পুলিশ হেফাজতে মাহসা ‘জিনা’ আমিনির মৃত্যুর পর যে ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, চার বছর পরও তার চেতনা টিকে আছে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক মাই সাতো।
তিনি বলেছেন, কঠোর দমন-পীড়ন এবং নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক হিজাব আইন প্রয়োগ অব্যাহত থাকলেও আন্দোলনের মূল চেতনা নিঃশেষ হয়ে যায়নি। বরং ইরানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও প্রদেশের নারী-পুরুষকে সমান অধিকারের দাবিতে একত্রিত করেছিল এই আন্দোলন।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনিকে মাথার স্কার্ফ ঠিকভাবে না পরার অভিযোগে তেহরানে নৈতিকতা পুলিশের সদস্যরা আটক করেন। আটকের পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তিন দিন পর হাসপাতালে মারা যান। তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইরানজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ স্লোগানটি দ্রুত দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদী প্রতীকে পরিণত হয়।
ইরানি কর্তৃপক্ষ আমিনিকে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে তাঁর মৃত্যুর জন্য শারীরিক অসুস্থতাকে দায়ী করেছিল। তবে তাঁর পরিবার সেই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের একটি আন্তর্জাতিক তথ্য-অনুসন্ধানী মিশন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, আমিনির মৃত্যু বেআইনি ছিল এবং রাষ্ট্রীয় হেফাজতে শারীরিক সহিংসতার কারণে তাঁর মৃত্যু ঘটে।
আবারও দমন-পীড়ন
মাই সাতোর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের আন্দোলনের পরও ইরানে নারীদের অধিকার ও পোশাকের স্বাধীনতা নিয়ে সংঘাত থামেনি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশজুড়ে নতুন বিক্ষোভের সময়ও কর্তৃপক্ষ প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
একই সঙ্গে বাধ্যতামূলক হিজাববিষয়ক আইন প্রয়োগও অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ‘পরিবার সুরক্ষা ও সতীত্ব-হিজাব সংস্কৃতি উন্নয়ন’ আইন স্থগিত করা হলেও বাস্তবে হিজাব না পরার কারণে ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও দোকান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও এ ধরনের ঘটনায় গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে।
আন্দোলনের প্রভাব কোথায়
‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এটি শুধু রাজধানী তেহরানকেন্দ্রিক ছিল না। ইরানের বিভিন্ন প্রদেশ ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষ এতে যুক্ত হয়েছিলেন। বিশেষ করে নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, পোশাকের অধিকার, সমতা এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলনটির কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে ওঠে।
জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকের বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলছে, রাজপথের ব্যাপক বিক্ষোভ দমন করা গেলেও আন্দোলনের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি মুছে ফেলা যায়নি।
চার বছর পর মাহসা আমিনির নাম তাই শুধু ২০২২ সালের একটি বিক্ষোভের স্মৃতি নয়; ইরানে নারীর অধিকার ও সামাজিক পরিবর্তনের দাবির সঙ্গেও এটি জড়িয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় ইরানের মানবাধিকার
মাহসা আমিনির মৃত্যুর পরের আন্দোলন ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত করে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বিক্ষোভ দমন, আটক, মৃত্যুদণ্ড এবং নারীদের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন।
২০২৩ সালে তৎকালীন জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক জাভাইদ রেহমানও মাহসা আমিনির মৃত্যুর পরিস্থিতি এবং পরবর্তী বিক্ষোভ দমনের বিষয়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছিলেন।
ফলে মাই সাতোর সাম্প্রতিক মন্তব্যের তাৎপর্য শুধু ২০২২ সালের আন্দোলনের স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ইঙ্গিত করে যে কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের দাবি ও প্রতিরোধের চেতনা ইরানের সমাজে এখনো সক্রিয় রয়েছে।
সাংবাদিকতায় ‘ক্রাইসিস ফ্যাটিগ’, গাজার খবরে কী মনোযোগ কমছে?
আল-আকসা প্রাঙ্গণে জোর করে ইসরায়েলিদের প্রবেশ
ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র প্রকাশ