'পরমাণু ইস্যু অজুহাত, ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিরোধই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য'

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১০ পিএম

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের আড়ালে দেশটির ইসলামি শাসনব্যবস্থা, স্বাধীনতার আদর্শ এবং মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থানের বিরোধিতা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তেহরান ও ওয়াশিংটনের দ্বন্দ্বের মূল কারণ পরমাণু ইস্যু নয়, বরং ইরানের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন ও মার্কিন শক্তির কাছে নতি স্বীকার না করার নীতি। এমন মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।

মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) ইরাকি মিডিয়া নেটওয়ার্ককে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের ইসলামি ব্যবস্থার ভিত্তিতে থাকা চিন্তাধারা এবং ইরানিদের মানসিকতাই যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির মূল জায়গা। মার্কিন আধিপত্যের বিরোধিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ না করার যে অবস্থান ইরান নিয়েছে, ওয়াশিংটন তা মেনে নিতে চায় না।

আরাঘচির ভাষায়, এ কারণেই পরমাণু ইস্যু আসলে একটি অজুহাত ছাড়া আর কিছু নয়। তার বক্তব্য, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধকে শুধু পরমাণু কর্মসূচির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করে দেখলে দুই দেশের সংঘাতের গভীরতর কারণ আড়ালে থেকে যাবে।

‘যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থানের ওপর আস্থা নেই’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আরাঘচি বলেন, ইরান এর আগে মার্কিন পক্ষের সঙ্গে তিন দফা আলোচনায় বসেছিল। কিন্তু প্রতিবারই আলোচনার পরিণতি হয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।

তিনি গত বছরের জুনে এবং চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে চালানো হামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দফা হামলাই এমন সময়ে চালানো হয়েছিল, যখন তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা চলছিল।

আরাঘচি আরও বলেন, জুনে আলোচনার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের পথ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্র সেই সমঝোতা লঙ্ঘন করে। এসব অভিজ্ঞতার কারণে মার্কিন কূটনৈতিক অবস্থানের ওপর তেহরানের আস্থা নেই বলে জানান তিনি।

কূটনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়া ঠেকাতে সাত দিনের পরিকল্পনা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ নিরসনের সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ না করে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার অংশ হিসেবে সাত দিনের একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে ইরান। আরাঘচির ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি শর্তসাপেক্ষে পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যেই এ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রকে ইসলামাবাদে হওয়া সমঝোতা স্মারকের আওতায় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করতে হবে। এরপর হরমুজ প্রণালি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে এবং সম্মত ব্যবস্থার অধীনে জলপথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে অগ্রসর হতে হবে। এর পরবর্তী ধাপে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে আরও আলোচনা হতে পারে।

আরাঘচি বলেন, কূটনীতি যেন পুরোপুরি ভেঙে না পড়ে, সে লক্ষ্যেই এই পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে আলোচনার মাধ্যমে ফল পেতে হলে অপর পক্ষকে আগে অর্জিত সমঝোতাগুলো মেনে চলতে হবে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র আগের প্রতিশ্রুতি পূরণ করে এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছালেই পরবর্তী পদক্ষেপের পথ তৈরি হতে পারে।

অর্থনৈতিক চাপেও নীতি বদলাবে না তেহরান

যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা অর্থনৈতিক চাপের মুখে ইরান তার নীতি ও আদর্শ পুনর্বিবেচনা করবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আরাঘচি বলেন, নিজেদের মর্যাদা, স্বাধীনতা, সম্মান ও মহত্ত্ব রক্ষার জন্য ইরানিরা অর্থনৈতিক মূল্য দিতে প্রস্তুত।

তিনি বলেন, তেহরানের তাৎক্ষণিক দাবি হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে ইসলামাবাদের সমঝোতায় থাকা প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। সেগুলো পূরণ হওয়ার পরই কেবল অন্য বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে কাজ করছে ইরান

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য নির্ধারিত সামুদ্রিক পথ চিহ্নিত করতে ওমানের সঙ্গেও কাজ করছে তেহরান। আরাঘচি জানান, এসব পথের মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে এবং সেগুলোর ভৌগোলিক স্থানাঙ্কও নির্ধারণ করা হয়েছে।

তার মতে, পরবর্তী ধাপে এসব পথ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার কাছে নিবন্ধনের জন্য জমা দিতে হবে, যাতে সংস্থাটি সেগুলো বিবেচনা করতে পারে। আরাঘচি এই উদ্যোগকে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সম্ভাব্য ব্যবস্থার প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে তুলে ধরেন।

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পদক্ষেপকে যুদ্ধের পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখারও বিরোধিতা করেন তিনি। তার যুক্তি, বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের ফলে এবং মার্কিন পক্ষের ধারাবাহিক লঙ্ঘনের পরিণতি হিসেবেই সংকট আরও জটিল হয়েছে।

আরাঘচি বলেন, পুরো বিশ্বের বোঝা উচিত, পথ আটকে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান নয়। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, ইরান কূটনীতির জন্য যেমন প্রস্তুত, তেমনি নতুন করে অন্যায্য আগ্রাসন চালানো হলে তার মোকাবিলার প্রস্তুতিও নিচ্ছে।

তিনি বলেন, কূটনীতির জন্য আমরা যেমন প্রস্তুত, যুদ্ধের জন্যও ঠিক তেমনই প্রস্তুত। সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল

এএস
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত