যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে কমছে বৈশ্বিক তেলের মজুত, রিজার্ভ কত?

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৮ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তেলের কৌশলগত মজুত দ্রুত কমছে। যুদ্ধ শুরুর আগে যে পরিমাণ মজুত ছিল, তার তুলনায় এখন পরিস্থিতি অনেক বেশি সংকটপূর্ণ। বিশ্লেষকদের হিসাবে, চীন ও ইরানের মজুত বাদ দিলে বিশ্বে ব্যবহারযোগ্য তেলের রিজার্ভ রয়েছে আনুমানিক ৪০০ মিলিয়ন বা ৪০ কোটি ব্যারেল। তবে এই তেলের সবটুকু জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা বা আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা সম্ভব নয়।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পার্টা কমোডিটিজের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক অ্যারন কিলডো জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের শেষ থেকে চীন ও ইরান বাদে বিশ্বের কৌশলগত তেলের মজুত প্রায় ৩২ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল কমেছে। এই হ্রাসের প্রায় ৯৫ শতাংশের জন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের মজুত থেকে তেল উত্তোলন।

বিশ্লেষকের হিসাবে, চীনের মজুত বাদ দিয়ে ব্যবহারযোগ্য বৈশ্বিক রিজার্ভ এখন প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেলে নেমে এসেছে। এর মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা তেলের মজুতও রয়েছে, যা হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।

বিশ্বের ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুতের প্রায় অর্ধেক রয়েছে জাপানে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে জাপানের রিজার্ভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ইউরোপের হাতে রয়েছে প্রায় ৭ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল তেল, যা এখনো অন্য কোনো জরুরি প্রয়োজনে বরাদ্দ করা হয়নি। তবে জার্মানির মতো কয়েকটি দেশ নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলার জন্য মজুতের একটি অংশ ধরে রাখছে।

কিলডোর ভাষায়, ‘কখন এবং কতটা মজুত ব্যবহার করা হবে—এই দুই প্রশ্নেই ইউরোপ সবচেয়ে অনিশ্চিত উপাদান।’

অর্থাৎ, ইউরোপের হাতে থাকা তেলের পরিমাণই শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়; সংকটের কোন পর্যায়ে দেশগুলো সেই মজুত বাজারে ছাড়তে রাজি হবে, সেটিও বিশ্ববাজারের জন্য বড় বিষয়।

চীনের স্থলভাগে অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে প্রায় ১১৩ কোটি ব্যারেল। বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলারের জ্যেষ্ঠ তেল বিশ্লেষক মিউয়ু শু আল জাজিরাকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে চীনের মজুত ছিল প্রায় ১২৩ কোটি ব্যারেল। অর্থাৎ এরপর মজুত কমেছে প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল। তারপরও বর্তমান মজুত দিয়ে দেশটির শোধনাগারগুলো প্রায় ৮০ দিন পর্যন্ত তেল পরিশোধন কার্যক্রম চালাতে পারবে বলে বিশ্লেষকের অনুমান।

তবে চীনের এই বিশাল মজুত আন্তর্জাতিক বাজারে সংকট মোকাবিলায় কতটা কাজে লাগবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণই অগ্রাধিকার পাওয়ায় এই তেলের বড় অংশ রপ্তানির জন্য উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্বের বড় তেল আমদানিকারক দেশগুলোর একটি ভারতের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির মজুত দিয়ে মাত্র আট দিনের তেল আমদানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও নিত্যপণ্যের পরিবহন ব্যয়ে।

তবে আট দিনের মজুত বলতে ঠিক কোন ধরনের রিজার্ভ, আমদানির কোন হিসাব এবং কোন সময়ের তথ্য বোঝানো হয়েছে, তা উদ্ধৃত অংশে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়নি।

পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি। এই নৌপথ বন্ধ হয়ে গেলে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা তেলের একটি অংশ উৎপাদিত হলেও ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে পারবে না।

এ কারণে বিশ্বে মোট কত ব্যারেল তেল মজুত আছে, তার পাশাপাশি কোথায় সেই তেল রয়েছে এবং কত দ্রুত তা বাজারে আনা সম্ভব—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কৌশলগত মজুতের সব তেল একসঙ্গে ব্যবহার করা যায় না; দেশগুলোকে নিজেদের জরুরি চাহিদা, পরিশোধন সক্ষমতা এবং সরবরাহব্যবস্থার বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়।

তেলের মজুত কমে যাওয়া, হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহের ঝুঁকি এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা একসঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করছে। সংকট বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। তবে দাম কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি, উৎপাদনকারী দেশগুলোর সরবরাহ, রিজার্ভ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত এবং বিকল্প পরিবহনপথের ওপর।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক বাজারের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা জ্বালানি আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ ও মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান মজুত কত দিনের চাহিদা পূরণ করতে পারবে, সে বিষয়ে এই প্রতিবেদনে কোনো তথ্য নেই।

এমএজেড
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত