ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জনমনে অসন্তোষ বাড়ছে। যুদ্ধ পরিচালনায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা এবং সামরিক অভিযানের লক্ষ্য অর্জন নিয়ে সংশয় তাঁর প্রশাসনের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। আগামী মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনের আগে এ পরিস্থিতি রিপাবলিকানদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ এজেন্সির ২৪ অক্টোবরের বিশ্লেষণে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে যুক্তরাষ্ট্রের জনমত জরিপ এবং ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফির সমালোচনার ভিত্তিতে যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব পর্যালোচনা করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পিউ রিসার্চ সেন্টারের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত জরিপে দেখা গেছে, ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে ৬৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকান অসন্তুষ্ট। বিপরীতে, ৩৩ শতাংশ তাঁর কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট।
৫ হাজার ৬২ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে এ তথ্য উঠে আসে। মার্চের জরিপে ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনায় অসন্তুষ্টির হার ছিল ৬১ শতাংশ, আর সন্তুষ্টির হার ছিল ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে অসন্তুষ্টি বেড়েছে চার শতাংশ পয়েন্ট।
যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েও জনমতে প্রশ্ন রয়েছে। জরিপে মাত্র ৩৪ শতাংশ উত্তরদাতা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রাথমিক সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে মনে করেছেন। মার্চের তুলনায় এ হার চার শতাংশ পয়েন্ট কম।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, জনমতের একটি বড় অংশের আপত্তি শুধু যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল নিয়ে নয়; সামরিক অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েও তাদের সংশয় রয়েছে।
যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন নিয়ে সংশয়
পিউ রিসার্চ সেন্টারের একই জরিপে ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ইরান সংঘাতে ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে—এ বিষয়ে তাঁদের সামান্য বা কোনো আস্থা নেই। বিপরীতে, ২৪ শতাংশের আস্থা রয়েছে অনেকটা বা মোটামুটি। আরও ১৬ শতাংশ কিছুটা আস্থা প্রকাশ করেছেন এবং ৮ শতাংশের আস্থা অত্যন্ত বেশি বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধ কত দিন চলতে পারে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। জরিপে ৪৭ শতাংশ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান আরও এক বছরের বেশি সময় চলতে পারে। ৩০ শতাংশের ধারণা, সংঘাত চলবে আরও ছয় মাস থেকে এক বছর। অর্থাৎ ৭৭ শতাংশ উত্তরদাতা যুদ্ধ আরও অন্তত ছয় মাস স্থায়ী হতে পারে বলে মনে করছেন।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, সামরিক ব্যয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে প্রশাসনের ঘোষিত লক্ষ্য এবং বাস্তব ফলাফলের মধ্যে ব্যবধান নিয়ে সমালোচনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
জ্বালানির দাম ও সেনাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবও মার্কিন জনমতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, ৭৩ শতাংশ আমেরিকান সংঘাতের কারণে গ্যাসোলিন ও অন্যান্য জ্বালানির দাম বাড়া নিয়ে অত্যন্ত বা কিছুটা উদ্বিগ্ন।
এ ছাড়া ৭১ শতাংশ উত্তরদাতা মার্কিন সেনাদের আহত বা নিহত হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইরানে স্থলসেনা পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বিগ্ন ৫৮ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত করে, যুদ্ধের প্রভাবকে অনেক মার্কিন নাগরিক শুধু সামরিক অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধভাবে দেখছেন না। জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি, সেনাদের প্রাণহানির আশঙ্কা এবং সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনাও তাঁদের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধ বন্ধে কংগ্রেসের প্রতি মারফির আহ্বান
যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি ইরান যুদ্ধের ব্যয় ও পরিণতি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করেছেন। ২৪ সেপ্টেম্বর সিনেটের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাবের পক্ষে কথা বলেন এবং সংঘাতের অবসানে কংগ্রেসকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান।
মারফি তাঁর বক্তব্যে একটি সিএনএন জরিপের উল্লেখ করে বলেন, মাত্র ১৮ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উপকারী। তাঁর দাবি, ৭০ শতাংশ মনে করেন, এসব সিদ্ধান্ত আমেরিকানদের ক্ষতি করছে।
তিনি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মার্কিন সেনাদের ঝুঁকি এবং যুদ্ধের জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত পরিণতি তুলে ধরে সংঘাত বন্ধের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তবে ১৮ ও ৭০ শতাংশের পরিসংখ্যান পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপের নয়; এগুলো মারফির বক্তব্যে উদ্ধৃত আলাদা সিএনএন জরিপের ফল।
মারফির বক্তব্যে যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। তাঁর মতে, সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু ঘোষিত লক্ষ্য নয়, বরং মার্কিন নাগরিকদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ, সেনাদের ঝুঁকি এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
রিপাবলিকানদের সমর্থনেও কিছুটা পতন
যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ শুধু ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিরোধীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকান এবং রিপাবলিকানপন্থী স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় সন্তুষ্টির হার মার্চের ৬৯ শতাংশ থেকে অক্টোবরে ৬৩ শতাংশে নেমেছে।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট ও ডেমোক্র্যাটপন্থী ভোটারদের মধ্যে এই সন্তুষ্টির হার মার্চ ও অক্টোবরে ৯ শতাংশই ছিল। অর্থাৎ ট্রাম্পের নিজ দলের সমর্থকদের মধ্যেও যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে সন্তুষ্টি কমেছে, যদিও তাঁদের অধিকাংশ এখনো তাঁর পক্ষে রয়েছেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বাড়তে পারে রাজনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে ইরান যুদ্ধ রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয়, জ্বালানির দাম, সেনাদের নিরাপত্তা এবং সামরিক অভিযানের লক্ষ্য অর্জন নিয়ে প্রশ্নের মুখে প্রশাসনকে আরও জবাবদিহির চাপ সামলাতে হতে পারে।
তবে জনমত জরিপে অসন্তুষ্টি বৃদ্ধি পেলেই নির্বাচনের ফল নির্ধারিত হয়ে যায় না। অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা, প্রার্থীদের প্রচার, অন্যান্য অভ্যন্তরীণ ইস্যু এবং সংঘাতের পরবর্তী পরিস্থিতিও ভোটারদের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধ এখন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির বাইরেও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। জনমতের বর্তমান চিত্র ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপের ইঙ্গিত দিলেও সেই চাপ মধ্যবর্তী নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে আগামী মাসগুলোর ঘটনাপ্রবাহের ওপর।
সূত্র: মেহের নিউজ এজেন্সি, পিউ রিসার্চ সেন্টার, মার্কিন সিনেটর ক্রিস মারফির দপ্তর।
গ্রেপ্তার হলেই বাতিল হবে মার্কিন ভিসা, সতর্ক করলো দূতাবাস
নতুন সেতু দিয়ে চীনে গেলেন কিম জং উন
ইরান যুদ্ধ শেষে কিউবার উপকূলে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর হুমকি ট্রাম্পের
সাগরে সুস্পষ্ট লঘুচাপ, ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে কমছে বৈশ্বিক তেলের মজুত, রিজার্ভ কত?