জাতীয় নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও ভোট গণনার চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪১ পিএম

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা এবং ভোট গণনার সময়কালীন ঝুঁকি নিয়ে নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও গাণিতিক বিশ্লেষণের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মহসিন আলী খান। দীর্ঘ সামরিক ক্যারিয়ারে চারটি জাতীয় নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কমান্ড চ্যানেলে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি এই মতামত প্রদান করেন।

কর্নেল মহসিন তার বিশ্লেষণে উল্লেখ করেন, আসন্ন নির্বাচনকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সুষ্ঠু ও অবাধ করার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। তিনি একটি গাণিতিক হিসাব তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের ৩০০ আসনের বিপরীতে যদি প্রতিটি আসনে সেনাবাহিনীর মাত্র একটি করে কোম্পানি নিয়োজিত করা হয়, তবে সব মিলিয়ে ৭৫টি ব্যাটালিয়ন প্রয়োজন পড়বে।

তিনি আরও জানান, সশস্ত্র বাহিনীকে শুধু অপারেশনাল কাজেই নয়, বরং প্রশাসনিক কাজ, বিভিন্ন পর্যায়ের হেডকোয়ার্টার রক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তাতেও নিয়োজিত থাকতে হয়। ফলে প্রতি উপজেলা বা আসনে এক কোম্পানি সেনা মোতায়েন করা বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। একইসাথে বিজিবি-র ওপর সীমান্ত পাহারার মূল দায়িত্ব থাকায়, তারাও খুব বেশি জনবল নির্বাচনে দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী সেনাবাহিনী মূলত ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ (Striking Force) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। এর অর্থ হলো, সরাসরি ভোটকেন্দ্রের ভেতরকার নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব থাকবে পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের ওপর। 

কর্নেল মহসিন প্রশ্ন তুলেছেন, ৫ আগস্টের পরবর্তী পরিস্থিতিতে পুলিশ এবং আনসার-ভিডিপি তাদের মনোবল, দক্ষতা ও সক্ষমতা কতটুকু ফিরিয়ে আনতে পেরেছে, তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ রয়েছে। তিনি মনে করেন, ব্যাটালিয়ন কমান্ড থেকে শুরু করে অপারেশনে নিয়োজিত বেশির ভাগ সদস্যেরই এ ধরনের বড় নির্বাচন সামলানোর পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।

দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি ভোট গণনার প্রক্রিয়াকে চিহ্নিত করেছেন। এবারের নির্বাচনে দুটি ব্যালট পেপারে ভোট গ্রহণ করা হচ্ছে। এর ফলে ভোট গণনায় আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগবে। কর্নেল মহসিন সতর্ক করে বলেন, বর্তমানে সন্ধ্যা দ্রুত নেমে আসে। দীর্ঘ সময় ধরে গণনা চললে এবং সন্ধ্যার অন্ধকারে কেন্দ্রের নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, যদি দ্রুততম সময়ে গণনা শেষ করা না যায়, তবে ভোটকেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষমাণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে, যা বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) গদবাধা কথার বাইরে এসে কার্যকর ও নতুন কোনো পন্থা অবলম্বনের অনুরোধ জানান। 

তিনি পরামর্শ দেন, সশস্ত্র বাহিনীর সাথে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত ও কার্যকর সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ভোট গণনার সময়কাল কমিয়ে আনা এবং সেই সময়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

লেখক: লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মহসিন আলী খান;
রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

DR/FJ
আরও পড়ুন