রমজান মাসে বিশ্ববিদ্যালয় তরুণদের ভাবনা: আত্মসংযমেই পরিবর্তনের স্বপ্ন

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:০০ এএম

রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আবার এসেছে পবিত্র মাহে রমজান। আত্মশুদ্ধি, সংযম ও মানবিকতার অনন্য শিক্ষায় ভরপুর এই মাসকে ঘিরে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে আধ্যাত্মিক আবহ। ইবাদত-বন্দেগি, কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা ও আত্মসংযমের চর্চায় জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার প্রত্যাশা জাগে সবার মাঝে। রোজার তাৎপর্য, ব্যক্তিজীবনে এর প্রভাব এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন তাদের অনুভূতি ও ভাবনা। শিক্ষার্থীদের বক্তব্য লিপিবদ্ধ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মী মো. মাহিদুজ্জামান সিয়াম।


রমজানে মলিন আত্মা পবিত্র করার সৌভাগ্যসন্ধি

মাহে রমজান আত্মাকে শুদ্ধ করার এক অনন্য ঋতু। সারা বছরের ব্যস্ততা, ভুলত্রুটি ও গুনাহের ভারে ক্লান্ত হৃদয়কে নবজাগরণের আহ্বান জানায় এই মাস। রোজা কেবল ক্ষুধা-তৃষ্ণা দমন নয় বরং চোখকে অশোভন দৃশ্য থেকে, জিহ্বাকে মিথ্যা ও পরনিন্দা থেকে, মনকে হিংসা-লোভ থেকে এবং আচরণকে অন্যায় থেকে সংযত রাখার সামগ্রিক সাধনা। এই সংযম মানুষকে তাকওয়া ও নৈতিকতার পথে পরিচালিত করে। রমজান এলে সমাজজীবনেও পরিবর্তনের সুর বাজে। মসজিদমুখী মানুষের সংখ্যা বাড়ে, ঘরে ঘরে কুরআন তিলাওয়াতের ধ্বনি শোনা যায়, দান-সদকা ও যাকাতের মাধ্যমে সহমর্মিতার চর্চা বিস্তৃত হয়। ধনী-গরিবের দূরত্ব কিছুটা হলেও কমে আসে। এই মাসেই নাজিল হয়েছে পবিত্র কুরআন এবং রয়েছে লাইলাতুল কদর, হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ এক রজনী। রমজানের শিক্ষা যদি সারা বছর জীবনের অংশ হয়ে ওঠে, তবেই মলিন আত্মা সত্যিকার অর্থে পবিত্রতার আলোয় আলোকিত হবে এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে শান্তি ও কল্যাণ।

আরিফা আক্তার সোমা, 
৩য় বর্ষ, ইংরেজি বিভাগ।

রমজানজুড়ে অটুট থাকুক সৌহার্দ্য

রমজান রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মহিমান্বিত মাস। এটি শুধু উপবাসের মাস নয় বরং আত্মশুদ্ধি, সংযম ও মানবিকতার এক অনন্য প্রশিক্ষণকাল। রোজা আমাদের ধৈর্য শেখায়, নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলে এবং হৃদয়কে পরিশুদ্ধতার পথে পরিচালিত করে। আত্মসংযমের এ অনুশীলন মানুষকে নৈতিকতা, সততা ও দায়িত্ববোধে আরও দৃঢ় করে। এ মাসে নামাজ, তারাবিহ, তিলাওয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পায় এবং অন্তরে অনুভব করে গভীর প্রশান্তি। পারিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলেও ভিন্ন এক ধর্মীয় আবহ সৃষ্টি হয়, যা মানুষকে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে অনুপ্রাণিত করে। ক্ষুধার অভিজ্ঞতা মানুষের মাঝে সহমর্মিতা জাগায় এবং যাকাত, ফিতরা ও সদকার মাধ্যমে সমাজে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির চেতনা দৃঢ় হয়। ইবাদত, সংযম ও মানবকল্যাণের চর্চায় রমজানজুড়ে অটুট থাকুক সৌহার্দ্য।

মো. মোকাররম হোসেন,
৪র্থ বর্ষ, ভেটেরিনারি এন্ড এনিমেল সায়েন্সেস অনুষদ।


রোজা ধৈর্যশীলতা ও আত্মচেতনার পাঠ শেখায়

রোজা কেবল নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উপবাস থাকার বিধান নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম ও নৈতিক পরিশুদ্ধতার এক মহৎ অনুশীলন। পবিত্র রমজান মানুষকে বাহ্যিক ভোগবিলাস থেকে সাময়িক বিরত রেখে অন্তর্জগতে প্রত্যাবর্তনে উদ্বুদ্ধ করে। সেহরি থেকে ইফতার পর্যন্ত ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার মধ্য দিয়ে রোজাদার উপলব্ধি করেন ধৈর্যের প্রকৃত তাৎপর্য। এ ধৈর্য শুধু শারীরিক কষ্ট সহ্য করার শক্তি নয় বরং মন ও আচরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বাস্তব প্রশিক্ষণ। রোজা মানুষকে আত্মচেতনার দিকে আহ্বান জানায়। দৈনন্দিন ব্যস্ততা ও প্রতিযোগিতার ভিড়ে যে আত্মা ক্লান্ত হয়ে পড়ে, রমজান তাকে জাগ্রত করে। লোভ, ক্রোধ, অহংকার ও হিংসা থেকে দূরে থাকার সচেতন অঙ্গীকার ব্যক্তিকে নৈতিকভাবে দৃঢ় করে। একই সঙ্গে ক্ষুধার অভিজ্ঞতা দরিদ্র মানুষের দুঃখকষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা বাড়ায় এবং সমাজে সহমর্মিতা ও সহানুভূতির চর্চা জোরদার করে। রোজা তাই ব্যক্তি জীবনে শৃঙ্খলা এবং সমাজজীবনে সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার এক অনন্য মাধ্যম।

ফাহমিদা আফরিন সূচনা,
৩য় বর্ষ, বাংলা বিভাগ।

রমজানের অভ্যাস রমজান শেষে থেমে যাওয়া উচিত নয়

পবিত্র রমজান মাস মুসলমানদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আত্মশুদ্ধির এক অনন্য সুযোগ। এক মাস সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে আমরা যে বড় শিক্ষাটি অর্জন করি তা হলো ধৈর্য ও সংযম। মাসজুড়ে ভিন্ন এক আধ্যাত্মিক আবহ বিরাজ করে। রমজানের প্রকৃত সফলতা তখনই, যখন এ মাসের অভ্যাস পরবর্তী সময়েও জীবনে ধরে রাখা যায়। নিয়মিত জামাতে নামাজ আদায়, শেষ রাতে তাহাজ্জুদ, মিথ্যা ও গীবত থেকে বিরত থাকা- এসব চর্চা শুধু রমজানের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; বরং সারাজীবনের জন্য অনুসরণীয়। অনেকেই ঈদের চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে রমজানের পবিত্রতা ভুলে আগের জীবনে ফিরে যান। কিন্তু যদি রমজান শেষে চরিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন না আসে, তবে এক মাসের উপবাস কেবল ক্ষুধার্ত থাকা ছাড়া আর কিছু নয়। ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে, মানুষ যা শিখে তা আমলে পরিণত করে। তাই প্রতিদিন অল্প হলেও কুরআন তিলাওয়াত, নিয়মিত নামাজ এবং নফল ইবাদতের অভ্যাস ধরে রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি অসহায় মানুষের দুঃখকষ্ট উপলব্ধি করে দান-সদকার মাধ্যমে তাদের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাও বজায় রাখতে হবে। মহান আল্লাহর ইবাদত কোনো নির্দিষ্ট মাসের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত অব্যাহত। রমজানের শিক্ষা যদি সারা বছর ধারণ করা যায়, তবেই ব্যক্তি ও সমাজ সত্যিকার অর্থে পরিবর্তিত হবে।

মো. আশিক মিয়া, 
১ম বর্ষ, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ।

HN
আরও পড়ুন