ইরানের সস্তা ড্রোন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ব্যয় বাড়িয়েছে

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৮ এএম

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের অন্যতম বড় শিক্ষা হলো, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিস্ময়করভাবে সক্ষম একটি ব্যয়বহুল প্রতিপক্ষকে উন্মোচিত করেছে। 

এই সংঘাতটি তুলে ধরেছে যে, বিপুল সম্পদে সমৃদ্ধ মার্কিন সামরিক আধিপত্য, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, তা প্রতিপক্ষের সস্তা, বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত ড্রোন মোতায়েনের কারণে ক্রমবর্ধমানভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

শুধু আক্রমণাত্মক অবস্থান নয়, ইরান যুদ্ধক্ষেত্রে স্বল্পমূল্যের ড্রোনের উত্থানকে সামনে এনে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতিরক্ষা কৌশলের দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের সস্তা ড্রোনের ব্যবহার যুদ্ধের চরিত্র বদলে দিয়েছে। 

একইভাবে ইরান এমন এক কৌশলগত ফাঁক কাজে লাগিয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত ব্যয়বহুল কিন্তু সীমিত পরিসরের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করে এসেছে।

ইরানের ড্রোনগুলো বাণিজ্যিক মানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি, যার প্রতিটির উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৩৫ হাজার ডলার। এর বিপরীতে এগুলো ভূপাতিত করতে ব্যবহৃত উচ্চপ্রযুক্তির মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কয়েক গুণ বেশি ব্যয়বহুল। 

এই ভারসাম্যহীনতা মার্কিন প্রতিরক্ষা কার্যক্রমের উপর একটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক বোঝা তৈরি করেছে। সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি-এর মতে, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনে যুক্তরাষ্ট্র ১১শ’ ৩০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। 

আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট পরে হিসাব করে দেখায়, মোট ব্যয় ২৫শ’ কোটি থেকে ৩৫শ’ কোটি ডলার, যার বড় অংশই প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র বাবদ ব্যয়। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে মজুদ এখন চাপের মধ্যে রয়েছে।

আদর্শ পরিস্থিতিতে আগাম সতর্কতামূলক বিমান ড্রোন শনাক্ত করে এবং এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এপিকেউডব্লিউএস-২ রকেট ব্যবহার করে সেগুলো ভূপাতিত করে। ইরান আগাম সতর্কীকরণ বিমানগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে, যার ফলে তাদের শনাক্তকরণ ক্ষমতা কমে ব্যয় বেড়েছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষায় প্রতিটি শত্রু ড্রোনের জন্য অস্তত দুই থেকে তিনটি রকেট ছোড়া হয়, যা সহ একটি এফ-১৬ ব্যবহারের ঘন্টা প্রতি ব্যয় নূন্যতম ৬৫হাজার ডলার, যা একটি ইরানি শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের খরচের প্রায় দ্বিগুণ।
পৃথিবীর বক্রতার কারণে ভূমি-ভিত্তিক ব্যবস্থাগুলো জ্যামিতিক এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হয়। 
যুক্তরাষ্ট্রের সি-র‌্যাম ব্যবস্থায়, প্রায় নয় মাইলের মধ্যে কার্যকর কায়োটি ইন্টারসেপ্টর-এর দুটি ইউনিটের দাম প্রায় ২লাখ ৫৩হাজার ডলার, তবুও এর সংখ্যা সীমিতই রয়ে গেছে।

মার্কিন নৌ-প্রতিরক্ষাগুলোর খরচ আরও বেশি। একটি নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ থেকে এসএম-২ মিসাইল নিক্ষেপ করতে প্রতিটি লক্ষ্যের জন্য অন্তত দু’টি মিসাইলের প্রয়োজন হয়, যার প্রতিটি আক্রমণের খরচ প্রায় ৪২ লাখ ডলার, যা একটি শাহেদ ড্রোনের দামের প্রায় ১শ’ ২০ গুণ।

এই অসামঞ্জস্যটি স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী মার্কিন পরিকল্পনার প্রতিফলন, যা ব্যাপক ড্রোন যুদ্ধের পরিবর্তে উচ্চ-স্তরের হুমকির উপর বেশি মনোযোগ দিয়েছে। তুলনামূলকভাবে ব্যাপক সস্তা ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের পাল্লা ১৫শ’ মাইল, যা সধ্যপ্রাচ্য জড়ে সহজেই আক্রমণ চালাতে সক্ষম।

২৭ মাইল দূরবর্তী ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম মার্কিন প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাতেও অস্তত ২ টি পিএসি-৩ ইন্টারসেপ্টর নিক্ষেপ করতে হয়, যা একটি ব্যয়বহুল বহুস্তরের প্রতিরক্ষা নীতি অনুসরণ করে। উচ্চ-মূল্যের সরঞ্জামগুলো এই খরচকে যৌক্তিক করে তোলে, যার মধ্যে কাতারে একটি ১শ’ ১০ কোটি ডলারের রাডার এবং জর্ডানে একটি ৫০ কোটি ডলারের সেন্সর অন্তর্ভুক্ত।

সর্বনিম্ন স্তরে, মার্কিন সেঞ্চুরিয়ন সি-র‍্যাম কামানগুলো শেষ অবলম্বন হিসেবে প্রতিরক্ষা প্রদান করছে। সেন্টার ফর স্ট্র‍্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের টম কারাকো বলেন, ‘সমস্যা শুধু ব্যয়ের নয়, বরং সেগুলো প্রতিস্থাপন করার আগেই আমাদের মজুদ ফুরিয়ে যাবে।’

এই পুরো পরিস্থিতি মার্কিন সামরিক আধিপত্যের উপর একটি কাঠামোগত চাপ প্রকাশ করে, যেখানে সস্তা ও সম্প্রসারণযোগ্য প্রযুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে অর্থনৈতিক আধিপত্য ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।

HN
আরও পড়ুন