চলমান সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সংশোধিত ১৪ দফার নতুন শান্তি পরিকল্পনা জমা দিয়েছে ইরান। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে এই প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইরানের এই নতুন শান্তি প্রস্তাবের পর এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অনুরোধে তেহরানের ওপর নির্ধারিত সামরিক হামলা আপাতত স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
পরমাণু চুক্তি নিয়ে আশাবাদী ট্রাম্প, তবে রইল হুঁশিয়ারি
সোমবার (১৮ মে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেজন্য তাদের সঙ্গে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর এখন ‘খুব ভালো সম্ভাবনা’ তৈরি হয়েছে।
তবে ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এর এক পোস্টে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সতর্ক করে বলেছেন:
"ইরান যদি কোনো গ্রহণযোগ্য চুক্তিতে না আসে, তবে যেকোনো মুহূর্তে তাদের ওপর বড় ধরনের পূর্ণাঙ্গ হামলা চালানো হবে।"
উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরু হওয়ার ছয় সপ্তাহ পর, গত ৮ এপ্রিল একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। এর পর থেকে সংঘাত অনেকটাই কমেছে, কিন্তু স্থায়ী শান্তি চুক্তি এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
শান্তি আলোচনার মাঝেই নতুন করে ড্রোন হামলা
স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনার মধ্যেই আঞ্চলিক উত্তেজনা নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে। সোমবার সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা তিনটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এর আগের দিনই সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। শান্তি আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ার মাঝেই এই ড্রোন হামলাগুলো নতুন করে যুদ্ধের শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি বিবেচনা করে ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ পোস্টে লিখেছেন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) নেতাদের অনুরোধে তিনি মঙ্গলবারের নির্ধারিত সামরিক হামলাটি স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও মার্কিন সামরিক বাহিনীকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তি না হলে যেকোনো মুহূর্তে ইরানের ওপর বড় আকারের হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
ইরানের ১৪ দফা পরিকল্পনায় কী আছে?
ইরানের নতুন ১৪ দফা পরিকল্পনার সব তথ্য এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, এই প্রস্তাবে ইরান মূলত কয়েকটি প্রধান দাবি উত্থাপন করেছে:
আটকে থাকা অর্থ ও নিষেধাজ্ঞা: বিদেশে আটকে থাকা ইরানের অর্থ ফেরত এবং দেশটির ওপর থেকে সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।
ক্ষতিপূরণ ও অবরোধ প্রত্যাহার: ইরানের ওপর হওয়া পূর্ববর্তী হামলার ক্ষতিপূরণ এবং মার্কিন নৌ-অবরোধের অবসান।
আঞ্চলিক শান্তি: লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব জায়গায় যুদ্ধ বন্ধ করা।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবি হলো—ইরান যেন তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধের প্রধান ৩টি কারণ
বর্তমান সংকটের পেছনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার প্রধান তিনটি বিরোধের ক্ষেত্র হলো:
১. ইউরেনিয়ামের মজুত ও পারমাণবিক কর্মসূচি
যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তাদের কাছে থাকা বিপুল পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করুক, যা দিয়ে পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব। ইরান তা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে দিতে রাজি নয়; তবে রাশিয়ার কাছে এই মজুত জমা রাখার একটি প্রস্তাব তারা বিবেচনা করছে।
২. হরমুজ প্রণালি ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ
গত মার্চ মাস থেকে ইরান বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তারা এই পথ দিয়ে যাওয়া বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ট্যাক্স বা টোল বসাতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ দিয়ে রেখেছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম ক্রমাগত বাড়ছে।
৩. আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী (যেমন—ইয়েমেনের হুথি ও লেবাননের হিজবুল্লাহ) নিয়ে যুক্তরাদষ্ট্রের তীব্র আপত্তি রয়েছে। তবে সংঘাতের মূল সূত্র কাটানোর জন্য এই বিষয়টি আলোচনার পরবর্তী ধাপের জন্য তুলে রাখা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ফের হামলা করলে যেভাবে আঘাত হানতে পারে ইরান
পিছু হটলেন ট্রাম্প; দায় চাপালেন অন্যদের ঘাড়ে!