দেশে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন বিরোধী কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও, ‘ধর্ষণ’ শব্দটির আইনি ব্যাখ্যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে নানাবিধ বিভ্রান্তি রয়েছে। প্রায়ই স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীর ধর্ষণের অভিযোগ, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক, কিংবা পারস্পরিক সম্মতিতে সম্পর্কের পর ধর্ষণের মামলার মতো ঘটনাগুলো আমাদের সামনে আসে। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলোর ব্যাখ্যাকবুল ব্যাখ্যা কী? কখন একটি ঘটনা আইনত ‘ধর্ষণ’ হিসেবে গণ্য হয়, আর কখন নয়?
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আলোকে বিষয়টি বিস্তারিত নিচে আলোচনা করা হলো।
১. যেসব ঘটনা আইনানুযায়ী ‘ধর্ষণ’ হিসেবে বিবেচিত
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে:
১৬ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী, ১৬ বছর বা তার কম বয়সী যেকোনো ছেলে বা মেয়েকে 'শিশু' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এই বয়সে আইনিভাবে কোনো সম্মতি (Consent) দেওয়ার ক্ষমতা শিশুর থাকে না। তাই ১৬ বছরের কম বয়সী কোনো নারীর সাথে সম্মতিসহ বা সম্মতি ছাড়া—যেকোনোভাবেই যৌন সম্পর্ক করা হোক না কেন, তা আইনত ধর্ষণ বলে গণ্য হবে।
১৬ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে: বিবাহ বন্ধন ছাড়া ১৬ বছরের বেশি বয়সী কোনো নারীর সাথে যদি তার ইচ্ছা বা সম্মতি ছাড়া, ভয়ভীতি দেখিয়ে, ব্ল্যাকমেইল করে কিংবা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে সম্মতি আদায় করে যৌন সম্পর্ক করা হয়, তবে তাও ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
শাস্তির বিধান: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধিত ধারা অনুযায়ী, ধর্ষণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অতিরিক্ত ন্যূনতম ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড হতে পারে। বাংলাদেশ বিশ্বের সপ্তম দেশ হিসেবে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করেছে।
২. বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক: আইন কী বলে?
আমাদের সমাজে বিয়ের আশ্বাসে সম্মতি নিয়ে শারীরিক সম্পর্কের পর পুরুষ সঙ্গীটি বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানালে প্রায়ই ধর্ষণের মামলা হতে দেখা যায়। আইনের ভাষায় একে "প্রতারণামূলকভাবে সম্মতি আদায়" বলা হলেও, আদালতে এটি প্রমাণ করা বেশ জটিল।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের বিষয়টি আদালতে টিকবে কিনা তা নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ের ওপর:
কতদিন ধরে বিয়ের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছিল।
উভয়ের সম্পর্কের গভীরতা কেমন ছিল।
লিখিতভাবে বিয়ে না হলেও সামাজিকভাবে বা ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে হয়েছিল কিনা।
কোনো নির্ভরযোগ্য সাক্ষী আছে কিনা।
তবে মনে রাখা প্রয়োজন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী—কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ (যিনি নিজে প্রলোভনের শিকার হয়েছেন দাবি করেন) কোনো নারীর বিরুদ্ধে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ আনার সুযোগ নেই।
৩. ‘বৈবাহিক ধর্ষণ’ বা স্বামীর দ্বারা স্ত্রী ধর্ষণ
বাংলাদেশের ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে’ সরাসরি ‘বৈবাহিক ধর্ষণ’ (Marital Rape) শব্দটির উল্লেখ নেই। তবে এ বিষয়ে দণ্ডবিধিতে একটি বিশেষ ব্যতিক্রমী ধারা রয়েছে:
স্ত্রীর বয়স ১৩ বছরের কম হলে: কোনো স্ত্রীর বয়স যদি ১৩ বছরের কম হয় এবং তার স্বামী যদি তার সাথে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন, তবে স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনতে পারবেন। এক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণিত হলে স্বামীর সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
স্ত্রীর বয়স ১৩ বছর বা তার বেশি হলে: স্ত্রীর বয়স ১৩ বছর বা তার বেশি হলে স্বামীর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ধর্ষণের ফৌজদারি মামলা দায়েরের সুযোগ নেই। তবে ভুক্তভোগী নারী ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন’-এর অধীনে যৌন সহিংসতার অভিযোগ এনে দেওয়ানি আদালতে প্রতিকার চাইতে পারেন। এর অধীনে আদালত স্বামীকে ক্ষতিপূরণ বা ভরণপোষণের আদেশ দিতে পারেন। স্বামী যদি আদালতের এই আদেশ লঙ্ঘন করেন, তখন তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা সম্ভব।
৪. অভিযুক্ত বা ভুক্তভোগী ‘শিশু’ হলে বিচার কোন আইনে?
বাংলাদেশ শিশু আইন অনুযায়ী, ১৮ বছর বা তার কম বয়সী প্রত্যেকেই শিশু। যদি ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির (অপরাধী) বয়স ১৮ বছর বা তার কম হয়, তবে তার বিচার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে না হয়ে শিশু আদালতে ‘শিশু আইন’ অনুযায়ী সম্পন্ন হবে।
অন্যদিকে, ধর্ষণের ভুক্তভোগীর বয়স যদি ১৮ বছরের নিচে হয় এবং তিনি জীবিত থাকেন, তবে তিনি শিশু আদালতের সুবিধাজনক পরিবেশে সাক্ষ্য দেওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে মূল অপরাধের বিচার ও দণ্ড ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ অনুসারেই নির্ধারিত হবে।
৫. যৌন নিপীড়ন ও পুলিশ হেফাজতে ধর্ষণের শাস্তি
আইনে কেবল সরাসরি ধর্ষণই নয়, বরং যৌন নিপীড়ন ও হেফাজতে ধর্ষণের বিরুদ্ধেও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে:
যৌন নিপীড়ন (Sexual Harassment): কোনো ব্যক্তি যদি যৌন কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে কোনো নারীর শ্লীলতাহানি করেন, তবে তা যৌন নিপীড়ন হিসেবে গণ্য হবে। এর শাস্তি ন্যূনতম ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ড।
পুলিশ হেফাজতে ধর্ষণ: পুলিশ বা যেকোনো আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে থাকাকালীন যদি কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হন, তবে সংশ্লিষ্ট হেফাজতকারী ব্যক্তিরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায়ে অভিযুক্ত হবেন। এর শাস্তি হিসেবে ন্যূনতম ৫ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং ন্যূনতম ১০,০০০ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া:
বাংলাদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান কার্যকর করার পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা 'অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল' এর সমালোচনা করেছে। সংস্থাটির মতে, চরম বা মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তি সমাজে সহিংসতা প্রতিরোধ করে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা সহিংসতাকে টিকিয়ে রাখে। তবে দেশের আইন অনুযায়ী বর্তমানে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডই বহাল রয়েছে।
দাদা-দাদির কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত শিশু রামিসা
তুরস্কে বন্ধ করা হচ্ছে ইসরায়েলের ইস্তাম্বুল কনস্যুলেট
মারা গেছেন অভিনেতা দিলু মজুমদার
অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানো হবে বাংলাদেশে: শুভেন্দু অধিকারী
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অর্থনৈতিক পরিণতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে জি-৭-এর হুঁশিয়ারি