আজ ৩১ মে, ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’। তামাকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছরের মতো এবারও বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
চলতি বছর দিবসটির আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘আনমাস্কিং দ্য অ্যাপিল- কাউন্টারিং নিকোটিন অ্যান্ড টোব্যাকো অ্যাডিকশন’ (Unmasking the appeal: countering nicotine and tobacco addiction)।
বাংলাদেশে তামাকের ব্যবহার এবং এর স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বর্তমান জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪৮ শতাংশই তরুণ, আর এই তরুণ প্রজন্মই এখন তামাক কোম্পানিগুলোর প্রধান লক্ষ্য।
বাংলাদেশে তামাকের ভয়াবহ চিত্র: মৃত্যু ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে তামাকের ব্যবহার ও এর ক্ষতিকর প্রভাব অত্যন্ত উদ্বেগজনক:
আক্রান্তের সংখ্যা: বর্তমানে দেশে প্রায় ৩.৭৮ কোটি মানুষ সরাসরি তামাক ব্যবহার করছেন।
মৃত্যুর হার: তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। দেশে মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের প্রধান চারটি কারণের অন্যতম একটি তামাক।
অর্থনৈতিক ক্ষতি: ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এটি তামাক খাত থেকে সরকারের আহরিত রাজস্ব আয়ের দ্বিগুণেরও বেশি।
চিকিৎসা ব্যয়: তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা এবং কর্মক্ষমতা হ্রাসের কারণে বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা।
তামাক চাষে জমির অপচয় ও পরিবেশ বিপর্যয়
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর ও কম আবাদযোগ্য জমির দেশ হওয়া সত্ত্বেও তামাক চাষে বিশ্বে ওপরের সারিতে রয়েছে।
শীর্ষ ১৩ নম্বরে বাংলাদেশ: বাংলাদেশে মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ মাত্র ৩ কোটি ৭৬ লাখ ৭ হাজার একর। অথচ তামাক চাষে ব্যবহৃত মোট জমির পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। বিশ্বের মোট তামাকের ১.৩ শতাংশ উৎপাদিত হয় এই বাংলাদেশে।
বন নিধন: ‘টোব্যাকো অ্যাটলাস’-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৩১ শতাংশ বন উজাড় বা নিধনের পেছনে সরাসরি তামাক চাষ দায়ী।
জ্বালানি কাঠের অপচয়: গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার তিনটি উপজেলাতেই তামাকপাতা শুকানোর (কিউরিং) কাজে এক বছরেই প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি কাঠ পোড়ানো হয়েছে।
কোম্পানিগুলোর কূটকৌশল ও কিশোরদের আসক্তি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যমতে, বিশ্বে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী অন্তত ৩ কোটি ৭০ লাখ কিশোর-কিশোরী নিয়মিত তামাক ব্যবহার করে। এদেরকে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডে আসক্ত করতে তামাক কোম্পানিগুলো বিভিন্ন কূটকৌশল অবলম্বন করছে:
আকর্ষণীয় সুগন্ধিযুক্ত (Flavored) তামাকপণ্য বাজারজাতকরণ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে তামাকপণ্য সহজে লভ্য বা দৃশ্যমান করা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেলিব্রেটিদের দিয়ে পরোক্ষ প্রচার চালানো।
বিভিন্ন করপোরেট অনুষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতা (Sponsorship) প্রদান।
তামাক নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী আইন ও কর পদক্ষেপের বিরোধিতা করা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল’ (CDC)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ২১ বছর বয়সের আগেই তামাকে আসক্ত হয়ে পড়ে, তাদের মধ্যে নিকোটিন নির্ভরতা ও আমৃত্যু তামাক ব্যবহারের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি থাকে।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও করণীয়
বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে এক প্রতিক্রিয়ায় গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান ‘প্রজ্ঞা’র (প্রগতির জন্য জ্ঞান) নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের বলেন:
"বাংলাদেশের বর্তমান মোট জনগোষ্ঠীর ৪৮ শতাংশই তরুণ-তরুণী এবং এরাই তামাক কোম্পানিগুলোর মূল টার্গেট। তামাক ও নিকোটিন আসক্তির ফাঁদ থেকে এই বিপুল তরুণ সমাজকে সুরক্ষায় ই-সিগারেট ও ভেপিংসহ নতুন প্রজন্মের সব ধরনের তামাকপণ্যের বিরুদ্ধে সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।"
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে অনতিবিলম্বে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালী করা এবং কর বৃদ্ধির মাধ্যমে এর ব্যবহার কমিয়ে আনা জরুরি।
চামড়া পাচার রোধে সীমান্তে বিজিবির টহল জোরদার
ইরানের ভয়ে ‘অন্ধকারে’ জাহাজ চলাচল