কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের পদত্যাগ

আপডেট : ০৬ জুন ২০২৬, ০৩:৩০ এএম

কলকাতা পৌরসংস্থার (কেএমসি) মেয়র হিসেবে দীর্ঘ আট বছরের এক গৌরবময় অধ্যায়ের অবসান ঘটালেন ফিরহাদ হাকিম। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও দক্ষ এই জননেতা অবশেষে মেয়রের দায়িত্বভার থেকে বিদায় নিলেন। তার এই বিদায় কলকাতার পুর-প্রশাসনের ইতিহাসে একটি বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

২০১৮ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে কলকাতার ভোল বদলে দিতে একাধিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি। বিশেষ করে পানীয় জলের সংকট দূরীকরণ, জলমগ্নতা থেকে মুক্তি এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

১. দূর হলো পানীয় জলের সংকট: টালিগঞ্জ-যাদবপুরে বড় সাফল্য

 

২০১৮ সালে ফিরহাদ হাকিম যখন মেয়র হন, তখন শহরের একটি বিস্তীর্ণ অংশ—বিশেষ করে টালিগঞ্জ, যাদবপুর, বেহালার একাংশ এবং ইএম বাইপাস সংলগ্ন এলাকাগুলো তীব্র পানীয় জলের সংকটে ভুগছিল।

ভূগর্ভস্থ জলের ওপর নির্ভরতা হ্রাস: তৎকালীন সময়ে শুধুমাত্র টালিগঞ্জ-যাদবপুর বেল্টের ২০টি ওয়ার্ডেই প্রতিদিন প্রায় ২৪.৩ মিলিয়ন গ্যালন ভূগর্ভস্থ জল তুলতে হতো। ফিরহাদ হাকিমের লক্ষ্য ছিল আগামী দুই বছরে এই নির্ভরতা ৬০ শতাংশ কমিয়ে আনা।

২০২৬-এর মেগা প্রোজেক্ট: ২০২৬ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্প সম্পন্ন করার ডেডলাইন বেঁধে দিয়ে কেএমসি জল বৃদ্ধির বিশেষ প্রকল্প হাতে নেয়। যদিও পুরো কাজ এখনও শেষ হয়নি, তবে একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

নতুন জল শোধনাগার ও বুস্টার পাম্পিং স্টেশন: নাগরিকদের ঘরে ঘরে পরিস্রুত পানীয় জল পৌঁছে দিতে ধাপা জল শোধনাগারের সম্প্রসারণ এবং গড়িয়ার ঢালাই ব্রিজে একটি নতুন জল শোধনাগার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এছাড়া ২০১৯ সালে এই অঞ্চলে প্রায় ৪০টি সেমি-আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার রিজার্ভার এবং ক্যাপসুল ওয়াটার বুস্টার পাম্পিং স্টেশন অনুমোদন করা হয়েছিল, যা এখন শেষের পথে।

বিদায়লগ্নে ফিরহাদ হাকিম বলেন: "আমি নাগরিকদের পরিস্রুত পানীয় জল দেওয়ার জন্য নিজের সাধ্যমতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। প্রকল্পগুলো সম্পূর্ণ শেষ করে যেতে না পারলেও ধাপা এবং ঢালাই ব্রিজের জল শোধনাগার দুটি প্রায় সমাপ্তির পথে। অদূর ভবিষ্যতেই নাগরিকরা এর সম্পূর্ণ সুবিধা পাবেন।"

২. কলকাতার দীর্ঘদিনের অভিশাপ 'জলমগ্নতা' দূরীকরণে বড় পদক্ষেপ

কলকাতার অন্যতম প্রধান সমস্যা বর্ষায় জল জমে যাওয়া। বিদায়ী মেয়র এই 'জলযন্ত্রণা' দূর করতে রাজ্য সরকারের বিশেষ তহবিল এনে ড্রেনেজ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করেছেন।

নবাব আলী পার্ক ড্রেনেজ পাম্পিং স্টেশন: খিদিরপুর-একবালপুর অঞ্চলের মানুষকে জলমগ্নতা থেকে মুক্তি দিতে একবালপুরের এই পাম্পিং স্টেশনের কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

চলতি প্রকল্প: তারাতলা, গার্ডেনরিচ এবং আমহার্স্ট স্ট্রিটে আরও তিনটি পাম্পিং স্টেশন নির্মাণের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে।

নেতাজির স্বপ্ন ও 'হৃষিকেশ পার্ক পাম্পিং স্টেশন'

বিদায়ের মুহূর্তে ফিরহাদ হাকিম তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প ‘হৃষিকেশ পার্ক ড্রেনেজ পাম্পিং স্টেশন’-এর উদ্বোধনকালে মেয়র পদে থাকতে না পারায় কিছুটা আক্ষেপ প্রকাশ করেন। ঠনঠনিয়া, সুকিয়া স্ট্রিট, আমহার্স্ট স্ট্রিট এবং কলেজ স্ট্রিটের বাসিন্দাদের জল জট থেকে মুক্তি দিতেই তিনি এটি তৈরি করেছিলেন। তিনি জানান:

"কলকাতার তৎকালীন মেয়র নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের জলমগ্নতা থেকে মুক্তি দিতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। এই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই আমি নিজে এই ড্রেনেজ পাম্পিং স্টেশনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলাম।"

৩. বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিপ্লব: গড়ে উঠছে 'নতুন ধাপা'

শহরের অন্যতম প্রধান সমস্যা বর্জ্য নিষ্কাশন নিয়েও দূরদর্শী পদক্ষেপ নিয়েছেন বিদায়ী মেয়র। কলকাতার একমাত্র বর্জ্য ডাম্পিং গ্রাউন্ড ধাপার আধুনিকীকরণের প্রস্তাব তিনি অনুমোদন করে গেছেন।

কলকাতার ১৪৪টি ওয়ার্ড থেকে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ আবর্জনা তৈরি হয়, তা থেকে যাতে সম্পদ তৈরি করা যায়, তার জন্য একটি ‘নতুন ধাপা’ গড়ে তুলতে রাজ্য অর্থ দপ্তরের কাছে তহবিল বরাদ্দের চিঠিও পাঠিয়েছেন তিনি।

আবর্জনা থেকে সম্পদ: ধাপা ডাম্পিং গ্রাউন্ডে ইতিমধ্যে আবর্জনাকে সার, কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস (সিএনজি) এবং প্লাস্টিকের আসবাবে রূপান্তরিত করার বেশ কয়েকটি প্রকল্প শুরু হয়েছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: এই পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ আরও বাড়িয়ে তুলতে ধাপার পাশেই আরও একটি বড় জমি চিহ্নিত করা হয়েছে, যা কলকাতার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এক নতুন যুগের সূচনা করবে।

জনমুখী উদ্যোগ, ‘টক টু মেয়র’ কর্মসূচির মাধ্যমে সরাসরি নাগরিকদের সমস্যা সমাধান এবং কলকাতার পরিকাঠামোগত আমূল পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে ফিরহাদ হাকিমের এই আট বছরের মেয়াদ কলকাতার ইতিহাসে সর্বদা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। (তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া)

HN
আরও পড়ুন