একই মায়ের গর্ভে জন্ম। একসঙ্গে বড় হয়ে ওঠা। একই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা। একই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ। আর ফলাফলও একই তিনজনই ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিপ্রাপ্ত। বরগুনার শিক্ষাঙ্গনে এমন বিরল কৃতিত্ব গড়ে আলোচনায় এসেছে একসাথে জন্ম নেওয়া তিন বোন অন্বেশা হালদার, অঙ্কিতা হালদার ও অনুষ্কা হালদার। তাদের এই ব্যতিক্রমী সাফল্যে আনন্দের জোয়ার বইছে পরিবার, বিদ্যালয় এবং পুরো এলাকায়।
তিন বোনের বাড়ি বরগুনা সদরের দক্ষিণ মনসাতলী গ্রামে। তাদের বাবা চিন্ময় হালদার এবং মা কাজলী রানী। চিন্ময় হালদার বরগুনার গৌরীচন্না নওয়াব সলিমুল্লাহ মাধ্যমিক বিদ্যালয় আর মা কাজলী রানী গৌরীচন্না হাই সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক৷ বাবা মায়ের স্নেহ, শাসন ও শিক্ষক দম্পত্তির দায়িত্বশীল দিকনির্দেশনার সঙ্গে নিজেদের কঠোর পরিশ্রম মিলিয়েই তিন বোন অর্জন করেছে এই ঈর্ষণীয় সাফল্য।
জানাগেছে, এবারের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় গৌরীচন্না হাই সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেও এসেছে চমকপ্রদ ফলাফল। বিদ্যালয়ের ১২ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ১১ জনই বৃত্তি অর্জন করেছে। এর মধ্যে ৭ জন ট্যালেন্টপুলে এবং ৪ জন সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছে। মাত্র একজন শিক্ষার্থী বৃত্তি পায়নি। এমন ফলাফলে বিদ্যালয়জুড়ে এখন উৎসবের আবহ বিরাজ করছে। তবে সব অর্জনকে ছাপিয়ে মানুষের মুখে মুখে এখন জমজ তিন বোনের গল্প। একই পরিবারের তিন সন্তান একসঙ্গে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জনের ঘটনা এ অঞ্চলে খুবই বিরল।
এদিকে বরগুনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সুত্রে জানাগেছে, সদ্য প্রকাশিত প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় জেলার ৬টি উপজেলায় মোট ৭৫৮ জন বৃত্তি পেয়েছেন। তাদের মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ট্যালেন্টপুলে ৩৫৬ জন ও সাধরণ ৩৬৩ জন বৃত্তি পেয়েছে। এছারাও বেসরকারি বিদ্যালয় থেকে ট্যলেন্টপুলে ১৬ জন ও সাধারণ ২৩ জন বৃত্তি পেয়েছে।
বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও অভিভাবকরা জানায়, অন্বেশা, অঙ্কিতা ও অনুষ্কা ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী। বিদ্যালয়ের পাঠের পাশাপাশি বাড়িতেও নিয়মিত পড়াশোনা করত তারা। একজনের ভালো ফল অন্য দুজনকে আরও বেশি উৎসাহিত করত। সেই সুস্থ প্রতিযোগিতা, পরিবারের সহযোগিতা এবং শিক্ষকদের আন্তরিক তত্ত্বাবধানই তাদের সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করেছে।
স্থানীয়রা মনে করেন, এটি শুধু একটি পরিবারের সাফল্য নয়, বরং পুরো বরগুনার জন্য গর্বের বিষয়।
গৌরীচন্না বাজারের ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীর অভিভাবক হেমায়েত উদ্দিন বিশ্বাস বলেন, বর্তমান সময়ে শিশুদের একটি বড় অংশ মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। সেই বাস্তবতায় অন্বেশা, অঙ্কিতা ও অনুষ্কার এই অর্জন প্রমাণ করে, নিয়মিত অধ্যবসায়, পারিবারিক অনুপ্রেরণা এবং শিক্ষকদের সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। জমজ তিন বোনের এই অনন্য সাফল্য এখন পুরো বরগুনার গর্বের বিষয়।
ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিপ্রাপ্ত ত্রিযমজ তিন মেয়ের বাবা চিন্ময় হালদার বলেন, ছোটবেলা থেকেই ওদের পড়াশোনার প্রতি আলাদা আগ্রহ ছিল। কোনো দিন ওদের পড়তে জোর করতে হয়নি। স্কুল থেকে ফিরে নির্দিষ্ট সময় বিশ্রাম নিয়ে প্রতিদিন নিয়ম করে পড়াশোনা করত। শুধু বই মুখস্থ নয়, প্রতিটি বিষয় ভালোভাবে বুঝে শেখার চেষ্টা করত।
তিন বোনের মধ্যে খুব সুন্দর একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা রয়েছে। একজন কোনো বিষয়ে ভালো করলে অন্য দুজনও আরও ভালো করার চেষ্টা করত। আবার কেউ কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে অন্য দুজন তাকে বুঝিয়ে দিত। এভাবেই তারা একে অপরের সবচেয়ে বড় সহপাঠী ও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।
তিনি আরো বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি ওরা খুবই ভদ্র, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও দায়িত্বশীল। বাড়ির বড়দের সম্মান করে, ছোটদের স্নেহ করে এবং মায়ের সংসারের কাজেও সুযোগ পেলেই সহযোগিতা করে। মোবাইল ফোন বা টেলিভিশনে অযথা সময় নষ্ট না করে অবসর সময়ে বই পড়ে, ছবি আঁকে এবং নিজেদের মধ্যে পড়ালেখা নিয়ে আলোচনা করে।
এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ওদের মা, বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সৃস্টিকর্তার অশেষ কৃপা। আমি একজন বাবা হিসেবে খুবই গর্বিত। আমি সবার কাছে আমার তিন মেয়ের জন্য দোয়া ও আশীর্বাদ কামনা করছি।
তিন বোনের শ্রেণিশিক্ষক মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘তারা তিনজনই অত্যন্ত মেধাবী, ভদ্র ও পরিশ্রমী। ক্লাসে সব সময় মনোযোগী ছিল। কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে বারবার জানতে চাইত। তাদের এই সাফল্যে আমরা গর্বিত।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘একই পরিবারের জমজ তিন বোনের একসঙ্গে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন আমাদের বিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা। পাশাপাশি ১২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১১ জনের বৃত্তি অর্জন আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল।’
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুল ওয়াসী মতিন বলেন, ‘একই পরিবারের তিন বোনের একসঙ্গে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন সত্যিই বিরল ঘটনা। এই সাফল্য শুধু বিদ্যালয়ের নয়, পুরো এলাকার গর্ব। শিক্ষার্থীদের এমন অর্জন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষার প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলবে।’
তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
এমসি কলেজে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ: একজনের মৃত্যুদণ্ড, তিনজনের যাবজ্জীবন
টাঙ্গাইলের ঝিনাই নদীতে নৌকায় জুয়ার আসর
কাপ্তাই হ্রদে পানির উচ্চতা শতফুট ছাড়ালো
বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপপ্রচার রোধে ঘোড়াঘাটে জনসচেতনতামূলক সভা
তিন দফা দাবিতে চট্টগ্রামে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ