ডিজিটাল ভ্যালু অ্যাকাউন্ট (DVA) কী এবং কীভাবে কাজ করবে?

মোবাইল ব্যাংকিং: সম্ভাবনার সঙ্গে বাড়ছে সাইবার ঝুঁকি ও প্রতারণা

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশের ধারাবাহিকতায় দেশের আর্থিক খাতে নতুন যুগের সূচনা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তর্জাতিক লেনদেনকে আরও সহজ, নিরাপদ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চালু করেছে ‘ব্যাংক-ইন্টারমিডিয়েটেড ফ্রেমওয়ার্ক’। এর আওতায় প্রবর্তিত ডিজিটাল ভ্যালু অ্যাকাউন্ট (ডিভিএ) দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং আন্তর্জাতিক সেবা বাণিজ্যে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশে গত এক দশকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে কোটি কোটি মানুষ অর্থ লেনদেন, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, সরকারি ভাতা গ্রহণ, মোবাইল রিচার্জ এবং অনলাইন কেনাকাটার মতো নানা কাজে মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহার করছেন। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৈদেশিক মুদ্রায় ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন উদ্যোগ সেই সীমাবদ্ধতা দূর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নতুন ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় চালু হওয়া ডিজিটাল ভ্যালু অ্যাকাউন্ট (ডিভিএ) মূলত একটি ডিজিটাল ওয়ালেট বা সংরক্ষিত-মূল্যভিত্তিক অ্যাকাউন্ট হিসেবে কাজ করবে। এটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অধীনে পরিচালিত মাস্টার ডিভিএর আওতায় পরিচালিত হবে। ফলে গ্রাহকরা অনুমোদিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক খাতে সহজেই বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন করতে পারবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ডিভিএর মাধ্যমে ব্যক্তিগত ভ্রমণ, চিকিৎসা, সরকারি সফর, ভিসা ফি, হোটেল বুকিং, সদস্যপদ ফি এবং তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) সেবার মূল্য পরিশোধ করা যাবে। পাশাপাশি সীমিত পরিসরে আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মেও অনলাইন পেমেন্টের সুযোগ থাকবে। এ সুবিধা রিটেনশন কোটা এবং রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট (আরএফসিডি) হিসাবের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম পে-পাল ও স্ট্রাইপ-এর মতো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বাজারে কার্যক্রম সম্প্রসারণে আরও আগ্রহী হতে পারে। এর ফলে ফ্রিল্যান্সার, স্টার্টআপ উদ্যোক্তা এবং আইটি খাতের ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক লেনদেনে আরও বেশি সুবিধা পাবেন।

নতুন এই ব্যবস্থা শুধু আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ করবে না, বরং দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকেও আরও বিস্তৃত করবে। বর্তমানে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা বিপুল জনগোষ্ঠী মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

ডিভিএ চালুর ফলে সেই সুবিধা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। বিদেশে শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের প্রক্রিয়াও আরও সহজ ও স্বচ্ছ হবে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার প্রতারণা, ফিশিং, ভুয়া ফোনকল এবং ওটিপি জালিয়াতির ঘটনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রযুক্তি সম্পর্কে কম ধারণা থাকা মানুষ, বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রবীণ ব্যবহারকারীরা এসব প্রতারণার শিকার হচ্ছেন বেশি। তাই নতুন ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়নে সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি গ্রাহক সচেতনতা বাড়ানো অপরিহার্য।

এ ছাড়া মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় লেনদেনের চার্জ নিয়েও অনেক গ্রাহকের অসন্তোষ রয়েছে। ছোট অঙ্কের অর্থ লেনদেনেও তুলনামূলক বেশি ফি গুনতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর ও আর্থিক তথ্য সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর উন্নয়নও নতুন ব্যবস্থার সফলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সার্ভার জটিলতা, ইন্টারনেট সমস্যা বা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে লেনদেন ব্যাহত হলে গ্রাহকের ভোগান্তি বাড়ে এবং সেবার প্রতি আস্থা কমে যেতে পারে। তাই নিরবচ্ছিন্ন প্রযুক্তিগত সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ডিজিটাল ভ্যালু অ্যাকাউন্ট চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এ উদ্যোগের পূর্ণ সুফল পেতে হলে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা, কার্যকর নিয়ন্ত্রক তদারকি, গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সেবার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখার বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল লেনদেন আরও সহজ হবে, ই-কমার্স ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের প্রসার ঘটবে, বৈদেশিক সেবা বাণিজ্য শক্তিশালী হবে এবং দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি আরও গতিশীল হয়ে উঠবে।

 

Maz
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত