নেপালে সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও একটি বাড়ি অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভয়াবহ পানির স্রোত, পলি ও ধ্বংসাবশেষের তোড়েও বাড়িটি কীভাবে টিকে গেল—এ নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যে।
সিভিল ও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে বাড়িটির টিকে থাকার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করছেন ইঞ্জিনিয়ার মাহমুদুল হাসান সুজন । তিনি বলেন, শুধু ছবি দেখে কোনো স্থাপনার নকশা বা প্রকৌশলগত সক্ষমতা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না। বিস্তারিত প্রকৌশলগত পরীক্ষা ও নকশা বিশ্লেষণ ছাড়া এসব কারণকে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে দেখতে হবে।

নিচতলা খোলা থাকায় কমেছে পানির চাপ
বাড়িটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নিচতলার খোলা বা স্টিল্ট-ধরনের কাঠামো। অর্থাৎ নিচের অংশে ভারী ইট-কংক্রিটের নিরেট দেয়ালের পরিবর্তে কলাম ও বিমের ওপর মূল ভবনটি দাঁড়িয়ে রয়েছে।
এ ধরনের নকশায় বন্যার পানি ও কাদামাটির স্রোত নিচতলায় বড় বাধার মুখে পড়ে না। ফলে পানির প্রবাহ তুলনামূলকভাবে সহজে কাঠামোর নিচ দিয়ে চলে যেতে পারে। নিরেট দেয়াল থাকলে পানির স্রোতের ধাক্কা সরাসরি দেয়ালে পড়ত এবং কাঠামোর ওপর পার্শ্বীয় চাপ আরও বেশি তৈরি হতে পারত।
প্রকৌশলগত ভাষায়, পানির প্রবাহের মুখে কাঠামোর কার্যকর ক্ষেত্রফল কম থাকলে হাইড্রোডাইনামিক ড্র্যাগ বা পানির গতিজনিত টানও তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
ডায়াগোনাল ব্রেসিং বাড়িয়েছে কাঠামোর দৃঢ়তা
ছবিতে কলাম ও বিমের মধ্যে তির্যক বা ডায়াগোনাল সদস্য দেখা গেলে সেটিও বাড়িটির স্থায়িত্বের অন্যতম কারণ হতে পারে। এ ধরনের ক্রস-ব্রেসিং কাঠামোর পার্শ্বীয় দৃঢ়তা বাড়াতে সাহায্য করে।
সাধারণ আয়তাকার ফ্রেমের তুলনায় ত্রিভুজাকৃতির ব্রেসিং কাঠামোকে পার্শ্বীয় বলের বিরুদ্ধে বেশি স্থিতিশীল করে। প্রবল পানির স্রোত, বাতাস বা অন্য কোনো পার্শ্বীয় চাপের ক্ষেত্রে এই ধরনের ব্যবস্থা কাঠামোর বিকৃতি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
তবে ছবিতে কোনো সদস্যকে ব্রেসিং মনে হলেও সেটি আসলে কী ধরনের স্ট্রাকচারাল মেম্বার, তা প্রকৌশলগত নকশা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

শক্ত ভিত্তি ও স্কাওরিং প্রতিরোধ
বন্যার সময় সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো স্কাওরিং—প্রবল পানির স্রোতে ভিত্তির চারপাশের মাটি ধুয়ে যাওয়া। এতে কলাম বা ভিত্তির নিচের মাটি দুর্বল হয়ে কাঠামোর স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে।
আলোচিত বাড়িটির কলামের নিচে তুলনামূলকভাবে শক্ত বেজ বা পেডেস্টালের মতো কাঠামো দেখা যাচ্ছে। সেখানে পাথর, কংক্রিট বা শক্ত ভিত্তি ব্যবহৃত হয়ে থাকলে তা পানির ক্ষয় থেকে ভিত্তিকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।
গভীর ও শক্ত ভিত্তি থাকলে ওপরের কাঠামোর ভার নিরাপদভাবে মাটিতে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে ভিত্তির চারপাশের মাটি আংশিক ক্ষয় হলেও কাঠামোর স্থিতিশীলতা ধরে রাখার সম্ভাবনা বাড়ে।
আরসিসি কাঠামোর নমনীয়তাও গুরুত্বপূর্ণ
বাড়িটির প্রধান কাঠামো যদি যথাযথভাবে নকশা করা আরসিসি ফ্রেম হয়ে থাকে, তাহলে এর আরেকটি সুবিধা হতে পারে ডাকটিলিটি বা নমনীয়তা।
রিইনফোর্সড কংক্রিটে ব্যবহৃত স্টিলের রড কাঠামোকে নির্দিষ্ট মাত্রায় বিকৃতি সহ্য করার সক্ষমতা দেয়। ফলে অতিরিক্ত চাপ বা সামান্য স্থানচ্যুতির ক্ষেত্রে কাঠামো হঠাৎ ভেঙে পড়ার পরিবর্তে কিছুটা বিকৃত হয়ে লোড বহন করতে পারে।
তবে এই সুবিধা পুরোপুরি নির্ভর করে রডের পরিমাণ, কলাম-বিমের নকশা, কংক্রিটের মান, সংযোগের ধরন এবং নির্মাণের গুণগত মানের ওপর।
কেন আশপাশের স্থাপনা ধসে পড়লেও বাড়িটি টিকে থাকতে পারে?
একটি ভবন বন্যায় টিকে থাকা কিংবা ধসে পড়ার পেছনে শুধু ভবনের ওপরের অংশ নয়, বরং ভিত্তি, মাটি, পানির গতিপথ, স্কাওরিং, কাঠামোর আকৃতি ও নির্মাণমান—সবকিছু একসঙ্গে ভূমিকা রাখে।
আলোচিত বাড়িটির নিচতলা খোলা থাকায় পানির প্রবাহের বাধা কমে থাকতে পারে। শক্ত ভিত্তি থাকলে মাটি ক্ষয়ের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। আবার আরসিসি ফ্রেম ও সম্ভাব্য ব্রেসিং কাঠামোটিকে পার্শ্বীয় চাপ মোকাবিলায় বাড়তি সক্ষমতা দিয়ে থাকতে পারে।
তবে ভবনটি ঠিক কোন ধরনের ভিত্তির ওপর নির্মিত, কত গভীর ফাউন্ডেশন ব্যবহার করা হয়েছে, রড ও কংক্রিটের মান কেমন ছিল কিংবা প্রকৃতপক্ষে ব্রেসিং ব্যবহৃত হয়েছে কি না—এসব তথ্য প্রকৌশলগত নথি ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।