সিরিয়ায় তুরস্ক ও ইসরায়েলের সামরিক প্রভাববলয় ভাগাভাগি করে নেওয়ার একটি প্রস্তাব আঙ্কারা প্রত্যাখ্যান করেছে বলে দাবি করেছে তুরস্কের সংবাদপত্র Türkiye Gazetesi। পত্রিকাটির সাংবাদিক ইলমাজ বিলগেনের পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, একটি মধ্যস্থতাকারী দেশের মাধ্যমে ইসরায়েল তুরস্কের কাছে এ প্রস্তাব পাঠিয়েছিল।
তবে প্রস্তাবটি সত্যিই ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে দিয়েছিল কি না, কিংবা মধ্যস্থতাকারী দেশটি কোনটি—এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত স্বাধীন কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টিকে আপাতত তুর্কি সংবাদমাধ্যমের একটি প্রতিবেদন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
কী ছিল কথিত প্রস্তাবে?
Türkiye Gazetesi-এর প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, ইসরায়েল সিরিয়ার আকাশসীমা ও সামরিক তৎপরতার অঞ্চলকে কার্যত দুই দেশের প্রভাববলয়ে ভাগ করার প্রস্তাব দিয়েছিল।
প্রস্তাবের কথিত কাঠামো অনুযায়ী, সিরিয়ার হোমস, কুনেইত্রা, তারতুস, দামেস্ক ও দারা অঞ্চলে ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতায় তুরস্ক আপত্তি করবে না। বিপরীতে আলেপ্পো, হামা, হাসাকা, দেইর আজ-জোর ও রাক্কা এলাকায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি বা তৎপরতায় ইসরায়েল হস্তক্ষেপ করবে না।
অর্থাৎ, প্রস্তাবটির মূল ধারণা ছিল সিরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে তুরস্ক ও ইসরায়েলের জন্য আলাদা সামরিক প্রভাববলয় তৈরি করা।
আরও ছিল সামরিক করিডরের প্রস্তাব
প্রতিবেদনটিতে আরও দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকে গোলান মালভূমি থেকে সুয়াইদা পর্যন্ত একটি সামরিক করিডর প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তুরস্কের আপত্তি না করার অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
একই সঙ্গে ইসরায়েল সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে যে ধরনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে চায়, তাতেও তুরস্ক যেন বাধা না দেয়—এমন প্রস্তাব ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব দাবির পক্ষে ইসরায়েল সরকারের কোনো প্রকাশ্য বক্তব্য বা স্বাধীন সূত্রের নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
আঙ্কারার জবাব কী?
তুর্কি সংবাদপত্রটির দাবি অনুযায়ী, আঙ্কারা পুরো প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছে। তুরস্কের অবস্থান হিসেবে সেখানে তুলে ধরা হয়েছে—সিরিয়ার ভূখণ্ডকে কোনো বিদেশি শক্তির মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার প্রশ্নই আসে না; সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার সিরীয় জনগণের।
এই অবস্থানকে সংক্ষেপে বলা যায়—‘সিরিয়া শুধু সিরীয়দের।’
অর্থাৎ তুরস্কও সিরিয়াকে নিজের ভূখণ্ড বা স্থায়ী প্রভাববলয় হিসেবে দেখতে চায় না এবং ইসরায়েলকেও সিরিয়ার ভূখণ্ডে একই ধরনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিতে আগ্রহী নয়—এমন বার্তাই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
সিরিয়া নিয়ে তুরস্ক-ইসরায়েল উত্তেজনা বাড়ছে
তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে সিরিয়াকে ঘিরে উত্তেজনা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। আগস্টে উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলার পর দুই দেশের মধ্যে প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ শুরু হয়।
ইসরায়েল দাবি করেছিল, ওই ঘাঁটিতে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছিল এবং তা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। তুরস্ক অবশ্য এ ধরনের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়া-বিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাকও পরে বলেন, ইসরায়েল, তুরস্ক ও সিরিয়ার মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি থেকে সামরিক সংঘাত এড়াতে একটি যোগাযোগ বা ‘ডি-এস্কেলেশন’ ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।
সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় শক্তির প্রতিযোগিতা
সিরিয়ায় দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তুরস্ক দেশটির সামরিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনে সহযোগিতা করছে। অন্যদিকে ইসরায়েল সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চল ও গোলান মালভূমিকে ঘিরে নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানিও সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা আলোচনা পুনরায় শুরুর সম্ভাবনার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ এবং সিরিয়ার সার্বভৌমত্বকে সম্মান করার ওপর জোর দেন।
ফলে সিরিয়াকে ঘিরে তুরস্ক ও ইসরায়েলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; দেশটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো, সামরিক উপস্থিতি এবং আঞ্চলিক প্রভাব নিয়েও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হচ্ছে।
নেতানিয়াহুর সামনে নতুন কৌশলের প্রশ্ন
Türkiye Gazetesi-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কথিত এই সমঝোতা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ইসরায়েল সিরিয়ার ভেতরে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিকল্প পথ খুঁজছে। এর মধ্যে সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতাকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে সামরিক হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই অংশের দাবিরও স্বাধীন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে ইসরায়েলের নিশ্চিত পরিকল্পনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে, প্রস্তাবটির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত না হলেও প্রতিবেদনটি সিরিয়াকে ঘিরে তুরস্ক ও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহও দেখাচ্ছে, সিরিয়ার সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে আঙ্কারা ও তেল আবিবের অবস্থান ক্রমেই পরস্পরবিরোধী হয়ে উঠছে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোনালাপ
৬০ লাখ ডলারের গয়না লুট, মাত্র ১ ইউরো ক্ষতিপূরণ পেলেন কিম কার্দাশিয়ান
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত অন্তত ১২