সৌদি আরবে হুথির ধারাবাহিক হামলা, যুক্তরাষ্ট্র কেন নীরব দর্শক?

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৭ পিএম

ইয়েমেনে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড দখল করে ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দ্বীপ এবং লোহিত সাগরের বিস্তীর্ণ উপকূল এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের বদলে আপাতত কূটনৈতিক পথেই এগোতে চাইছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সপ্তাহান্তে ওমানের রাজধানী মাস্কাটে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে হুথি প্রতিনিধিদের সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়েছে।

বৈঠকে হুথিরা মার্কিন কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করেছে, লোহিত সাগরে তারা মার্কিন জাহাজে হামলা চালাবে না। তাদের বিধিনিষেধ কেবল সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

তবে হুথিদের এমন আশ্বাস কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর আগে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ইতিহাস রয়েছে তাদের।

এ ছাড়া ইরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানও ওয়াশিংটনের উদ্বেগের কারণ।

হুথিরা ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার পর সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছিল।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গত সপ্তাহে দু’বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করেন। হুথিদের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে তিনি ট্রাম্পকে আহ্বান জানান বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে ট্রাম্প তাতে রাজি হননি।

এরপর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জরুরি সমন্বয় বৈঠকের জন্য রিয়াদ সফর করেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, সৌদি আরবকে সমর্থন বাড়াতে চাইছে ওয়াশিংটন। তবে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে সতর্ক রয়েছে তারা।

ট্রাম্প সৌদি যুবরাজকে ‘ভালো বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করে পরিস্থিতি ভালোভাবে সামাল দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো বা নৌপথ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র সামরিক নিশ্চয়তা দেবে—এমন কোনো স্পষ্ট ঘোষণা দেয়নি হোয়াইট হাউজ।

হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে সহায়তা করতে ইসরায়েল আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগে হুথিদের হামলার লক্ষ্য হয়েছে ইসরায়েলি জাহাজ ও ইসরায়েলের কথিত ভূখণ্ড।

তবে ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাইমন ম্যাবনের মতে, ইয়েমেনে ইসরায়েলের সামরিক ভূমিকা সীমিতই থাকতে পারে।

তার মতে, গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের চলমান সামরিক তৎপরতার মধ্যে ইয়েমেনে নতুন করে বড় অভিযান চালানো অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।

সৌদি আরবও ইসরায়েলি সামরিক সহায়তা গ্রহণে সতর্ক থাকতে পারে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আরব ও মুসলিম বিশ্বে রিয়াদের অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ইয়েমেন সংকটে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ না নিলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

সাইমন ম্যাবনের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন না করার আরও একটি উদাহরণ তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কতটা নির্ভর করা যায়, তা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।

কয়েক বছর ধরেই সৌদি আরব নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্ক বহুমুখী করার চেষ্টা করছে। তেল অবকাঠামোয় হামলার পর দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় সৌদি আরব পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক এসব উদ্যোগকে রিয়াদের বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার খোঁজার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইয়েমেনে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাধা হলো ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ।

হুথিদের প্রধান আঞ্চলিক সমর্থক ইরান। ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে বিপুল সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ ব্যয় করেছে।

সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থেকেও কেন বিপাকে সৌদি আরব?

যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প প্রশাসন এটি কয়েকদিনের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু ছয় মাসের বেশি সময় পরও সংঘাতের স্থায়ী সমাধান হয়নি।

এ সময়ে তেলের দাম বেড়েছে। যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট পথনকশা প্রকাশ করা হয়নি।

এর মধ্যে ইয়েমেনে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্র আরও একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তাছাড়া, আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা। ফলে নতুন যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে উদ্বেগ থাকতে পারে।

রয়টার্স-ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে ছিলেন ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। গত মার্চে এই হার ছিল ৩৭ শতাংশ।

ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। জুলাইয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার খবর প্রকাশ করে একাধিক গণমাধ্যম। এর মধ্যে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার মজুত নিয়ে উদ্বেগ ছিল।

পেন্টাগনের এক নজরদারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম চার মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ৩৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ২২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছে।

যুদ্ধে বেশ কিছু মার্কিন সামরিক প্লেন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ইরানের হামলায় মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাতেও উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার সংকটে পড়েছে—এমন দাবি অস্বীকার করেছে। প্রশাসনের বক্তব্য, দেশটির হাতে এখনো বিপুল পরিমাণ অস্ত্র রয়েছে।

বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনে এ পথের বড় ভূমিকা রয়েছে।

ছয় মাস ধরে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল সীমিত রয়েছে। এখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে একসঙ্গে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেল ও পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।

কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, বাব আল-মান্দেবে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা চীনের ওপরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে। কারণ এশিয়াগামী বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে এই পথের গুরুত্ব রয়েছে।

তবে এর প্রভাব শুধু চীনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সৌদি আরবের অবকাঠামো ও জাহাজে হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভোক্তারাও এর চাপ অনুভব করতে পারেন।

বিশ্লেষক সাইমন ম্যাবনের মতে, চীনকে দুর্বল করার কোনো সুস্পষ্ট কৌশলের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেন পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করছে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই।

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধেই যখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে, তখন ইয়েমেনে নতুন করে যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকিও ওয়াশিংটনের জন্য বড় হয়ে উঠেছে।

সূত্র: আল-জাজিরা

এএম
আরও পড়ুন