আজমুলকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় নতুন করে যেসব তথ্য সামনে আসছে

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম

খুলনায় নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. আজমুল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় নতুন করে নানা তথ্য সামনে আসছে। মেসে খাবার চুরির অভিযোগ থেকে ঘটনার সূত্রপাত হলেও একপর্যায়ে আজমুলকে মারধর, ছাদে নিয়ে যাওয়া এবং তাঁর পরিবারের কাছে এক লাখ টাকা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে। তবে চারতলার ছাদ থেকে আজমুল কীভাবে নিচে পড়ে গেলেন—তিনি নিজে লাফ দিয়েছিলেন, নাকি তাঁকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দিনের করা মামলায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখ করে আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনার পরপর কাউকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভও দেখা দিয়েছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীরের পাশে মসজিদ গলির ওই চারতলা ভবনটি পুরোপুরি ছাত্রদের মেস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নিহত আজমুল থাকতেন চতুর্থ তলার ‘ডি-৮’ কক্ষে।

মেসে তৃতীয় তলার নয়জন শিক্ষার্থী নিয়মিত ‘মিল সিস্টেমে’ খাবার খেতেন। রান্নার দায়িত্বে থাকা ফাতেমার ভাষ্য, শুক্রবার রাতে নয়জনের জন্য খাবার রান্না করা হয়েছিল। খাবার কম পড়ার পর শিক্ষার্থীরা খাবার খুঁজতে শুরু করেন।

এরপর মেসের বিভিন্ন কক্ষে তল্লাশি চালানোর সময় আজমুলের কক্ষে একটি প্লেটে অর্ধেক খাওয়া ভাত ও মাছ পাওয়া যায় বলে কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন। সেখান থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে খাবার চুরির অভিযোগ ওঠে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর কয়েকজন আজমুলকে চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করেন। তাঁরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। পরে খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের মেস থেকেও অনেকে সেখানে আসেন।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁদের ডেকে নিয়ে মেসের বিভিন্ন কক্ষে খোঁজাখুঁজি করেন। প্রথমে কোথাও কিছু পাওয়া যায়নি।

পরে আজমুলের কক্ষের খাটের নিচে অর্ধেক খাওয়া ভাত ও মাছ পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়। এরপরই তাঁর ওপর মারধর শুরু হয়।

একপর্যায়ে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, মেসে চোর ধরা পড়েছে। এতে আশপাশের লোকজনও সেখানে জড়ো হন। পরে আজমুলকে ভবনের ছাদে নেওয়া হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য। তবে ছাদে নেওয়ার পর ঠিক কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে আজমুলের পরিবারের কাছ থেকে। তাঁর বাবা কুতুব উদ্দিন জানিয়েছেন, শুক্রবার গভীর রাতে কয়েকজন তাঁকে ফোন করে বলেন, তাঁর ছেলে মেসে জিনিসপত্র চুরি করেছে এবং এখনই এক লাখ টাকা দিতে হবে।

একই ধরনের তথ্য মামলার এজাহার ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরিবারের দাবি, টাকা চাওয়ার পরপরই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পরে সংশ্লিষ্ট ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

মেসের নিচতলার কয়েকজন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাঁরা দৌড়াদৌড়ি ও চিৎকারের শব্দ শুনে বাইরে বের হন। তখন আজমুলকে ভবনের নিচে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

তবে তিনি কীভাবে ছাদ থেকে নিচে পড়ে গেলেন, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউই ছাদে কী ঘটেছিল তা সরাসরি দেখেছেন বলে জানাননি। ফলে আজমুল নিজে পড়ে গিয়েছিলেন, নাকি তাঁকে ধাক্কা দিয়ে বা অন্য কোনোভাবে নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছিল—এ প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে।

ঘটনার পর মেসটির অধিকাংশ কক্ষ তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে। তৃতীয় ও চতুর্থ তলার সব কক্ষই বন্ধ ছিল। করিডরে শিক্ষার্থীদের পোশাক, জুতা ও স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখা যায়।

ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে অনেক শিক্ষার্থী কথা বলতে চাননি। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও অনেকে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।

মেসের মালিকের জামাতা জানিয়েছেন, প্রায় এক বছর আগে আজমুল সেখানে ওঠেন। মেসটি দেখাশোনা করতেন মেহেদী নামের এক সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। ঘটনার পর তাঁর কক্ষও তালাবদ্ধ পাওয়া যায় এবং তাঁর ফোন বন্ধ ছিল বলে স্থানীয় প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

স্থানীয় শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় আগে থেকেই ছোটখাটো চুরির ঘটনা ঘটত। বিভিন্ন মেস থেকে কাপড়, জুতা-স্যান্ডেল, মোবাইল ফোন কিংবা ল্যাপটপ চুরির অভিযোগও ছিল।

এ কারণে শিক্ষার্থীরা মেস ভবনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের অনুরোধ করেছিলেন বলে জানা গেছে। তবে ভবনমালিকের পক্ষ থেকে তা করা হয়নি বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ।

এই বিষয়টিও এখন তদন্তের আলোচনায় আসছে, ঘটনার সময় মেসে কে কে ছিলেন, বাইরে থেকে কারা এসেছিলেন এবং ছাদে আজমুলকে নেওয়ার পর সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন।

আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দিন শনিবার রাতে হরিণটানা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।

হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল হোসেন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে।

এদিকে আজমুল হত্যার বিচার দাবিতে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছেন। নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কানাই লাল সরকার বলেছেন, তাঁর কাছে ঘটনাটি একজনের কাজ বলে মনে হয়নি; একাধিক শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তিনি তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।

এদিকে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাত ২টার দিকে পিরোজপুরের নেছারাবাদ থানার কুড়িয়ানা আদাবাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার রিফাত সিরাজগঞ্জ সদর থানার গুনেরগাতি এলাকার মনোয়ার হোসেনের ছেলে।

এসআরবি ফোর্সেস জানায়, নিয়মিত মামলার আসামি, সাজাপ্রাপ্ত ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি এবং চাঞ্চল্যকর হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

আজমুলের মৃত্যুর ঘটনায় এখন কয়েকটি প্রশ্ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, খাবার বা টাকা চুরির অভিযোগের সত্যতা কী ছিল? কে বা কারা তাঁকে প্রথম মারধর শুরু করেছিল? ছাদে তাঁকে কেন নেওয়া হয়েছিল? সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন? তাঁর পরিবারের কাছে এক লাখ টাকা কেন দাবি করা হয়েছিল? এবং শেষ পর্যন্ত তিনি কীভাবে চারতলা থেকে নিচে পড়ে গেলেন?

এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি, মেসের উপস্থিত ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ, ফোনকল ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ এবং ময়নাতদন্তসহ তদন্তের ফলাফলের ওপর।

তবে একটি বিষয় ইতোমধ্যেই স্পষ্ট, একটি খাবার বা চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে কোনো ব্যক্তিকে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগ সত্য হলেও বিচার করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালতের। আজমুলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং কারা এর জন্য দায়ী, তা এখন তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার অপেক্ষায়।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন