সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন কোনো বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতাল স্থাপনের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে থাকা বেসরকারি ক্লিনিকে সংশ্লিষ্ট সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্র্যাকটিস করার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ বিষয়ে নির্দেশনা জারি করে। অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ বিভাগের পরিচালক ডা. মো. নূরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, গত ১৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন-বিষয়ক সভার কার্যবিবরণীর ৬ নম্বর সিদ্ধান্তের আলোকে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো ওই কার্যবিবরণীর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছে। তবে নতুন এই নির্দেশনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে ইতোমধ্যে যেসব বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল গড়ে উঠেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত কী? দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আশপাশে দীর্ঘদিন ধরে অসংখ্য বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। অনেক এলাকায় সরকারি হাসপাতালের কাছাকাছি একাধিক বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নতুন করে সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে বেসরকারি ক্লিনিক স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হবে না। কিন্তু ইতোমধ্যে অনুমোদন নিয়ে চালু থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে চিঠিতে সরাসরি কোনো উচ্ছেদ, বন্ধ বা স্থানান্তরের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কি না, তা পরিষ্কার নয়।
তাহলে এক কিলোমিটারের মধ্যে থাকা পুরোনো ক্লিনিকগুলো কি আগের অনুমোদন অনুযায়ী ব্যবসা চালিয়ে যাবে, নাকি ভবিষ্যতে তাদের জন্যও নতুন কোনো বিধান করা হবে? বিশেষ করে যেসব বেসরকারি ক্লিনিক সরকারি হাসপাতালের একেবারে কাছাকাছি অবস্থান করছে, তাদের কার্যক্রম কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে?
বাংলাদেশের অনেক এলাকায় দেখা যায়, সরকারি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে আশপাশে বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মেসি ও বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের একটি অংশ হাসপাতালের সেবা নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে চলে যান। এ পরিস্থিতিতে সরকারি হাসপাতালের আশপাশে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ঘনত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করেন, সরকারি হাসপাতালের কাছাকাছি বেসরকারি ক্লিনিক থাকার কারণে রোগীদের কাছে দ্রুত বেসরকারি সেবা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। আবার একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালচক্রের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সরকারি হাসপাতালের বিভিন্ন প্রবেশপথ ও আশপাশের এলাকায় দালালদের ঘোরাফেরার অভিযোগ নতুন নয়। রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে তাদের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ প্রায়ই ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব মধ্যস্বত্বভোগীর একটি অংশ নির্দিষ্ট বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে আর্থিক চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা, অস্ত্রোপচার বা চিকিৎসার কথা বলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় এমন অভিযোগও রয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ক্লিনিক বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও প্রমাণ প্রয়োজন।
নতুন এক কিলোমিটার নীতির বাস্তবায়নে তাই শুধু নতুন ক্লিনিকের অনুমোদন বন্ধ করাই নয়, সরকারি হাসপাতালকেন্দ্রিক রোগী ব্যবস্থাপনা এবং দালালচক্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নতুন নির্দেশনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে থাকা বিদ্যমান বেসরকারি ক্লিনিকে সংশ্লিষ্ট সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। এর ফলে সরকারি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকদের বেসরকারি প্র্যাকটিসের ক্ষেত্রেও নতুন সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হিসেবে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত কমানোর বিষয়টি সামনে আসতে পারে।
বিশেষ করে কোনো সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক যদি একই হাসপাতালের কাছাকাছি কোনো বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী দেখেন, তাহলে সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কা স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।
এর আগে মঙ্গলবার মুন্সীগঞ্জে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সরকারি হাসপাতালের আশপাশে নতুন করে কোনো বেসরকারি ক্লিনিকের অনুমোদন দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে চালু থাকা বেসরকারি ক্লিনিকগুলোকে নিয়ম-কানুন মেনে পরিচালনা করতে হবে। লাইসেন্স না থাকা বা নবায়ন না করা, দক্ষ টেকনিশিয়ান ও ফার্মাসিস্ট না থাকা, নিজস্ব চিকিৎসক ও লেবার রুম না থাকাসহ বিভিন্ন অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সরকারের নজর শুধু নতুন ক্লিনিকের অনুমোদন সীমিত করার মধ্যে থাকছে না; ইতোমধ্যে চালু থাকা বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন ও পরিচালনব্যবস্থাও যাচাইয়ের আওতায় আসতে পারে। তবে এক কিলোমিটারের মধ্যে থাকা বিদ্যমান ক্লিনিকগুলোর জন্য আলাদা কোনো স্থানান্তর বা বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
নতুন নিয়ম কার্যকর করতে হলে প্রথমেই দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর চারপাশে এক কিলোমিটারের মধ্যে থাকা বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে হবে। এরপর দেখতে হবে- কোন প্রতিষ্ঠান কবে অনুমোদন পেয়েছে, তাদের লাইসেন্সের বর্তমান অবস্থা কী, ভবন ও সেবার মানদণ্ড পূরণ করছে কি না এবং সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা সেখানে প্র্যাকটিস করছেন কি না।
একই সঙ্গে রোগী ভাগিয়ে নেওয়া, দালালচক্র এবং সরকারি হাসপাতালের ভেতর থেকে রোগী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর অভিযোগ থাকলে সেগুলোও আলাদাভাবে তদন্তের প্রয়োজন হতে পারে। কারণ শুধু নতুন ক্লিনিকের অনুমোদন বন্ধ করলেই সরকারি হাসপাতালের আশপাশের দীর্ঘদিনের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো বদলে যাবে না।
সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন বেসরকারি ক্লিনিক না দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ভবিষ্যতে নতুন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে অবস্থানগত সীমাবদ্ধতা তৈরি হবে। একই সঙ্গে ওই এলাকার বেসরকারি ক্লিনিকে সরকারি চিকিৎসকদের প্র্যাকটিস বন্ধের নির্দেশনাও সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসাসেবার সম্পর্ককে নতুন কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে পারে।
তবে এর পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে, ইতোমধ্যে এক কিলোমিটারের মধ্যে থাকা ক্লিনিকগুলোর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবে সরকার? সেগুলো আগের অনুমোদন অনুযায়ী চলবে, নাকি নতুন কোনো নিয়মের আওতায় আসবে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এ প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। ফলে এখন নজর থাকবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরবর্তী নির্দেশনা এবং মাঠপর্যায়ে এ সিদ্ধান্ত কীভাবে বাস্তবায়ন করা হয়, তার ওপর।
গাজীপুরে ট্রাক-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ৪
এবার বাড়লো লঞ্চের ভাড়া
ভোটের অধিকার ও গণতন্ত্র নষ্টের ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় বিএনপি প্রস্তুত: তথ্য প্রতিমন্ত্রী
নড়াইলে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, গুলিবিদ্ধ ১১
আজ সিঙ্গেল দিবস