আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ইরানের হাতে বাণিজ্যের জন্য আর কোনো পণ্য অবশিষ্ট থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তাঁর দাবি, চীনে পাঠানোর জন্য ইরানের যে পরিমাণ তেল এখনো সমুদ্রপথে রয়েছে, সেগুলোর শেষ চালান পৌঁছে গেলেই তেহরানের হাতে আর উল্লেখযোগ্য কোনো তেল বিক্রির সুযোগ থাকবে না।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের ‘সানডে মর্নিং ফিউচার্স’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট এসব কথা বলেন। তিনি জানান, বর্তমানে ইরানের প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেল চীনে সরবরাহের অপেক্ষায় রয়েছে।
বেসেন্ট বলেন, এসব তেলের শেষ চালান চীনে পৌঁছে গেলে ইরানের হাতে ‘কোনো কিছুর বিনিময়ে বেচার মতো কিছুই থাকবে না’—এমনটাই তাঁর ধারণা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ ও বন্দর অবরোধের কারণে ইরানের তেল রপ্তানির সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে।
বেসেন্টের ভাষ্য, ইরানের অবশিষ্ট তেল মূলত চীনের উদ্দেশেই যাচ্ছে। তাঁর মতে, এসব চালান আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে।
এর ফলে ইরানের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক আয়ের উৎস তেল রপ্তানিতে আরও বড় চাপ তৈরি হবে বলে তিনি মনে করছেন।
এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতেও বেসেন্ট দাবি করেছিলেন, চীনের কাছে বিক্রির জন্য ইরানের প্রায় ৩ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল অবশিষ্ট রয়েছে। তখনও তিনি বলেছিলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের কারণে তেহরানের সেই তেল সরবরাহের সক্ষমতা দ্রুত সীমিত হয়ে আসছে।
তবে সর্বশেষ বক্তব্যে তিনি অবশিষ্ট তেলের পরিমাণ আরও কমে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।
বেসেন্টের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হচ্ছে।
সংঘাত শুরুর আগে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ২ কোটি ব্যারেল। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংঘাত ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও হরমুজ দিয়ে বৈশ্বিক তেল পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
এই হিসাবের ভিত্তিতে বেসেন্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের পরিমাণগত সাফল্যকে তিনি এভাবে দেখছেন—যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে এক বিলিয়নের বেশি ব্যারেল তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছেছে, বিপরীতে ইরানের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হয়েছে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চলমান অর্থনৈতিক চাপের কর্মসূচিকে ওয়াশিংটন ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে অভিহিত করছে।
বেসেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, এই অভিযানের উদ্দেশ্য শুধু ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলা নয়। ভবিষ্যতে তেহরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলে ইরান যেন সেটির শর্ত মেনে চলে, সেটিও নিশ্চিত করা এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।
বেসেন্ট অভিযোগ করেন, এর আগে ইরান একটি সমঝোতার শর্ত মেনে চলেনি। তাই ভবিষ্যতে কোনো চুক্তি হলে সেটি বাস্তবায়নে তেহরানের ওপর চাপ বজায় রাখার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
ট্রাম্পের সঙ্গে নতুন আলোচনা কি হবে?
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনার মধ্যেই কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও বলেছেন, চলতি সপ্তাহে তেহরানের সঙ্গে আরও আলোচনা হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, ইরান চুক্তি করতে চায়, কিন্তু তেহরানের প্রস্তাবটি তাঁর প্রত্যাশিত চুক্তি নয়।
ইরান এর আগে সাত দিনের একটি পরিকল্পনা সামনে এনেছিল। এতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং অবরোধসহ কিছু ব্যবস্থা প্রত্যাহার করলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা শুরুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে ট্রাম্প ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বেসেন্টের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ওয়াশিংটন ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করাকে আলোচনার ক্ষেত্রে চাপ তৈরির অন্যতম প্রধান উপায় হিসেবে দেখছে।
তাঁর দাবি, ইরানের তেল বিক্রির সুযোগ যত সংকুচিত হবে, তেহরানের অর্থনৈতিক চাপ তত বাড়বে এবং ভবিষ্যৎ কোনো চুক্তিতে যেতে তাদের আগ্রহও বাড়তে পারে।
তবে ‘দুই সপ্তাহের মধ্যে ইরানের হাতে কিছুই থাকবে না’—এটি বেসেন্টের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন। এটি ইরানের অর্থনীতির স্বাধীনভাবে যাচাই করা পূর্বাভাস নয়। ইরানের অভ্যন্তরীণ তেল মজুত, স্থলভিত্তিক বাণিজ্য, অন্যান্য ক্রেতা এবং বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার ওপর এই চাপের প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করতে পারে।
অন্যদিকে চীন এখনো ইরানের তেলের গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা। ফলে তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিবর্তে রপ্তানির পরিমাণ, পরিবহন ব্যবস্থা এবং অর্থ পরিশোধের পদ্ধতিতে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে—সেটিও পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়ে যায়।
ফলে ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করার পাশাপাশি হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন সচল রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বেসেন্টের বক্তব্যে তাই দুটি বিষয় পাশাপাশি এসেছে—একদিকে ইরানের তেল রপ্তানিতে চাপ সৃষ্টি, অন্যদিকে হরমুজ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর দাবি।
এই পরিস্থিতিতে তেল সরবরাহ, নিষেধাজ্ঞা, নৌ অবরোধ এবং কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়গুলো পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে।
শেষ পর্যন্ত ইরানের হাতে সত্যিই কতটা তেল ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা অবশিষ্ট থাকবে, তা নির্ভর করবে চলমান সামরিক পরিস্থিতি, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, হরমুজ দিয়ে নৌ চলাচল এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনৈতিক আলোচনার গতিপথের ওপর।
স্থলবাণিজ্যে ঝুঁকছে ইরান, তুরস্ক সীমান্তে ট্রাকের দীর্ঘ সারি
গাজাজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ৪, আহত ১২
ভারত-আফগানিস্তানের ‘মদতপুষ্ট’ ৭১ সন্ত্রাসী নিহত