নদী হারাচ্ছে বাংলাদেশ: নাব্যতা কমছে, দূষণে মরছে প্রাণ

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২০ পিএম

একসময় নদীই ছিল বাংলাদেশের যোগাযোগ, বাণিজ্য ও জনজীবনের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। কিন্তু কয়েক দশকে সেই নদীপথ ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে। নাব্যতা হারানোর পাশাপাশি শিল্পবর্জ্য, পয়োনিষ্কাশন ও নগর বর্জ্যে দূষিত হয়ে পড়ছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো। ফলে নদী হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক প্রবাহ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে থাকা দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।

১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট অথরিটির জন্য একটি ডাচ কোম্পানির করা জরিপে বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার নৌপথ নাব্য ছিল। এখন বর্ষার মৌসুমেও নাব্য নৌপথের পরিমাণ নেমে এসেছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কিলোমিটারে। শুষ্ক মৌসুমে তা আরও কমে দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটারে। অর্থাৎ ছয় দশকের ব্যবধানে নৌপথের নাব্যতা কমেছে ৬০ শতাংশেরও বেশি।

একসময় যেসব নদীপথে নিয়মিত লঞ্চ ও পণ্যবাহী নৌযান চলাচল করত, সেগুলোর কয়েকটি এখন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তালিকায় পরিত্যক্ত। নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় এসব পথে আগের মতো নৌযান চলাচল সম্ভব হচ্ছে না।

সংকট দুই দিক থেকে

বাংলাদেশের নদী সংকটকে মূলত দুটি দিক থেকে দেখা যায়—একদিকে নাব্যতা কমে যাওয়া, অন্যদিকে ভয়াবহ দূষণ। দুটি সমস্যা পরস্পরকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিআইডব্লিউটিএর চলতি বছরের একটি জরিপে ঢাকার চার নদী—বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার দূষণের উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ৪২৪টি নির্গমন পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার কেজি তরল ও কঠিন বর্জ্য এসব নদীতে পড়ছে।

এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ বর্জ্য আসছে শিল্পকারখানা থেকে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা থেকে আসছে প্রায় ৩০ শতাংশ এবং বাকি ১০ শতাংশ বর্জ্য আসছে বিভিন্ন বাসাবাড়ি থেকে।

ঢাকার চার নদীর তীরে থাকা প্রায় ৭ হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আনুমানিক ৯৯ শতাংশের কার্যকর বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা বা ইটিপি নেই। ফলে শিল্পবর্জ্যের বড় একটি অংশ সরাসরি নদীর পানিতে গিয়ে মিশছে।

খনন হচ্ছে, কিন্তু ফিরছে না নদীর প্রাণ

নদীর নাব্যতা ফেরাতে সরকারের উদ্যোগ একেবারে নেই—বিষয়টি এমন নয়। সমস্যা হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনার বদলে বিচ্ছিন্নভাবে খননকাজ করা হচ্ছে।

প্রায় ছয় বছর আগে সরকার ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে নদী খননের পরিকল্পনা নেয়। এর কিছু সুফলও পাওয়া গেছে। গত দুই থেকে তিন বছরে সুনামগঞ্জের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে কাটার সাকশন ড্রেজিংয়ের ফলে বরাছড়া, চরাগাঁও ও বাগলী শুল্ক স্টেশনে আবার বাণিজ্যিক কার্যক্রম কিছুটা সচল হয়েছে। তবে সামগ্রিক চিত্র খুব আশাব্যঞ্জক নয়।

২০১৯ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার কয়েকটি নদী খনন প্রকল্পে অনিয়মের কথা তুলে ধরে। কিছু নদীপথের একই অংশ একাধিকবার খনন করা হয়েছিল। কারণ, খনন করে তোলা পলি নদীর বাইরে সরিয়ে না নিয়ে নদীর তীরেই ফেলে রাখা হয়েছিল। বর্ষার পানিতে সেই পলি আবার নদীতে ফিরে যায়।

ফলে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে খনন করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে নাব্যতা স্থায়ীভাবে ফিরছে না। প্রশ্ন উঠছে—এটি কি প্রকৃত নদী ব্যবস্থাপনা, নাকি শুধু নিয়মিতভাবে নদীর তলদেশ থেকে বালু-পলি তোলার একটি চক্র?

দূষণের উৎস এখন অনেকটাই স্পষ্ট

নদী দূষণের উৎস কোথায়, সে বিষয়েও এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

বিআইডব্লিউটিএর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকার ওয়াসার ৬৬টি ড্রেন সরাসরি বুড়িগঙ্গা ও তুরাগে গিয়ে পড়ছে। এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১টি, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৬টি এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৩৭টি ড্রেন শীতলক্ষ্যা নদীতে সরাসরি বর্জ্য ফেলছে।

অর্থাৎ নদী দূষণের উৎস অনেকাংশেই অজানা নয়। কোথা থেকে বর্জ্য নদীতে যাচ্ছে, তার নির্দিষ্ট চিত্র এখন সামনে রয়েছে। মূল চ্যালেঞ্জ হলো—এসব উৎস বন্ধ করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাঠামো কার্যকর করা।

বুড়িগঙ্গায় শূন্যের কাছাকাছি অক্সিজেন

দূষণের প্রভাব নদীর জীববৈচিত্র্যের ওপরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। বুড়িগঙ্গা নদীতে কখনো কখনো দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে যায়। অথচ মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর টিকে থাকার জন্য সাধারণভাবে প্রতি লিটার পানিতে প্রায় ৫ মিলিগ্রাম দ্রবীভূত অক্সিজেন প্রয়োজন।

শুধু অক্সিজেনের ঘাটতিই নয়, নদীর পানিতে অ্যামোক্সিসিলিন ও সিপ্রোফ্লক্সাসিনসহ বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশও শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। এতে নদীর পানিতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

পরিবেশ স্থপতি ইকবাল হাবিবের মতে, ঢাকার পয়োনিষ্কাশনের পানি এখনো ড্রেনের মাধ্যমে নদীতে গিয়ে পড়ে। শুধু বর্জ্য পরিশোধনাগার নির্মাণ করলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না; খাল ও ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন এবং পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে এগুলোর কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

রাজধানীর বাইরে পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক

নদী দূষণের সংকট শুধু ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবেশ অধিদপ্তর দেশের ২৮টি নদীর বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করে। সেখানেও নদীর পানির মান নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।

রিভারস অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) ২০২২-২৩ সালের ৫৬টি নদীর ওপর করা এক জরিপে দেখা যায়, গাজীপুরের লাবানদাহা, নরসিংদীর হাড়িধোয়া এবং হবিগঞ্জের সুতাং নদীতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা প্রতি লিটারে ১ মিলিগ্রামের নিচে নেমে গেছে। এমন মাত্রার অক্সিজেন স্বাভাবিক জলজ পরিবেশের জন্য অত্যন্ত সংকটজনক।

নদী রক্ষায় দরকার সমন্বিত ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশের নদীগুলো রক্ষার প্রশ্নটি তাই শুধু ড্রেজিং বা দূষণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা, শিল্পবর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশন নিয়ন্ত্রণ, ড্রেনেজ ও খালব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং খননকাজের পলি যথাযথভাবে অপসারণ—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

নদী খননে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও যদি পলি আবার নদীতে ফিরে আসে, তাহলে সেই ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে নাব্যতা ফেরাতে পারবে না। একইভাবে ইটিপি স্থাপন করেও যদি শিল্পবর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনের সংযোগ নদীতে থেকেই যায়, তাহলে দূষণ কমবে না।

বাংলাদেশের নদীগুলো শুধু জলপথ নয়; এগুলো দেশের পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ছয় দশকে নাব্য নৌপথের বড় অংশ হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দূষণে নদীর পানি যখন প্রাণ ধারণের অনুপযোগী হয়ে উঠছে, তখন নদী রক্ষার উদ্যোগকে প্রকল্পভিত্তিক না রেখে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনায় নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন