পাকিস্তানের চীনা সামুদ্রিক 'গুপ্তঘাতক', ভারতের জন্য কতটা চিন্তার?

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪১ পিএম

সমুদ্রের ওপর তখন প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু পানির কয়েকশো মিটার নিচে নিঃশব্দে এগিয়ে যেতে পারে একটি ডুবোজাহাজ। তার অবস্থান জানার আগেই ছুটে আসতে পারে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। আবার প্রয়োজন হলে দীর্ঘ সময় পানির নিচে থেকেই অপেক্ষা করতে পারে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর জন্য।

আরব সাগরে পাকিস্তানের নতুন পিএনএস/এম হ্যাঙ্গর ডুবোজাহাজের সাম্প্রতিক অস্ত্র পরীক্ষা এই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। ২৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান নৌবাহিনী জানিয়েছে, উত্তর আরব সাগরে হ্যাঙ্গর থেকে একটি জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে নির্ধারিত দূরপাল্লার লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হানা হয়েছে। পাকিস্তান নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল নাভিদ আশরাফ পরীক্ষাটি প্রত্যক্ষ করেন।

প্রশ্ন উঠেছে—চীনের সহায়তায় তৈরি এই নতুন ডুবোজাহাজ পাকিস্তানের হাতে আসায় ভারতের জন্য সমুদ্রপথে কী ধরনের নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হলো?

হ্যাঙ্গর শ্রেণির ডুবোজাহাজ পাকিস্তান-চীন প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। মোট আটটি ডুবোজাহাজ পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথমটি চীনে নির্মিত এবং বাকি কয়েকটি পাকিস্তানের করাচি শিপইয়ার্ডে নির্মাণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই প্রকল্পে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও স্থানীয় নির্মাণের বিষয়টিও রয়েছে।

প্রথম হ্যাঙ্গর ৩০ এপ্রিল পাকিস্তান নৌবাহিনীতে কমিশন করা হয় এবং জুনে করাচিতে পৌঁছায়। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সেটি সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষায় অংশ নিল। অর্থাৎ ডুবোজাহাজটি এখন শুধু প্রতীকীভাবে পাকিস্তানের বহরে যুক্ত হয়নি; এর অস্ত্র ও যুদ্ধব্যবস্থার কার্যকারিতাও পরীক্ষা করা শুরু হয়েছে।

হ্যাঙ্গর শ্রেণির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এয়ার-ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রপালশন বা এআইপি প্রযুক্তি। সাধারণ ডিজেল-ইলেকট্রিক ডুবোজাহাজকে ব্যাটারি চার্জ করতে নির্দিষ্ট সময় পর পর পানির কাছাকাছি উঠে স্নরকেল করতে হয়। এআইপি সেই প্রয়োজন অনেকটাই কমিয়ে দেয়।

ফলে একটি ডুবোজাহাজ দীর্ঘ সময় পানির নিচে অপেক্ষাকৃত গোপনে অবস্থান করতে পারে। সাবমেরিন যুদ্ধের ক্ষেত্রে এই সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—কারণ শত্রু তাকে খুঁজে পাওয়ার আগেই সে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি অবস্থান নিতে পারে।

হ্যাঙ্গর শ্রেণিকে চীনের এস২৬ রপ্তানি সাবমেরিন নকশার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। আধুনিক সেন্সর, স্টেলথ বৈশিষ্ট্য এবং এআইপি ব্যবস্থার কারণে এর মূল ভূমিকা মূলত ‘সি-ডিনায়াল’—অর্থাৎ প্রতিপক্ষের জন্য নির্দিষ্ট সমুদ্র এলাকায় নিরাপদে চলাচল ও অভিযান পরিচালনা কঠিন করে তোলা।

২৭ সেপ্টেম্বরের পরীক্ষাটিই সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তান জানিয়েছে, হ্যাঙ্গর থেকে একটি অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল ছোড়া হয় এবং সেটি নির্ধারিত দূরপাল্লার লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত করে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। এই পরীক্ষায় যে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, পাকিস্তান প্রকাশ্যে সেটিকে অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল হিসেবেই বর্ণনা করেছে। এটিকে বাবর-৩ পরমাণু সক্ষম ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করার মতো সরকারি তথ্য প্রকাশিত হয়নি। ফলে সাম্প্রতিক পরীক্ষাটিকে সরাসরি পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি প্রচলিত জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা এবং পরমাণু সক্ষম সাবমেরিন-লঞ্চড ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষার কৌশলগত তাৎপর্য এক নয়।

উত্তর আরব সাগর ভারতের পশ্চিম উপকূলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। মুম্বই, জওহরলাল নেহরু বন্দর, গুজরাটের উপকূল এবং ভারতের গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটিগুলোর দিকে যাওয়া সমুদ্রপথ এই বৃহত্তর সামুদ্রিক অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এ কারণে পাকিস্তানি সাবমেরিন বহরের সক্ষমতা বাড়লে ভারতের নৌবাহিনীর সামনে একটি অতিরিক্ত অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার বা এএসডব্লিউ চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে এআইপি-সজ্জিত ডুবোজাহাজ দীর্ঘ সময় পানির নিচে অবস্থান করতে পারলে সেটিকে শনাক্ত ও অনুসরণ করার জন্য আরও বেশি নজরদারি প্রয়োজন হতে পারে। বিমান, হেলিকপ্টার, যুদ্ধজাহাজ, সোনার এবং অন্যান্য সামুদ্রিক সেন্সরের সমন্বিত ব্যবহার তখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সাম্প্রতিক পরীক্ষাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে ছবিটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

হ্যাঙ্গর শ্রেণির ডুবোজাহাজ পাকিস্তানের পানির নিচের যুদ্ধক্ষমতা বাড়াচ্ছে—এটি স্পষ্ট। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে পাকিস্তান সামগ্রিকভাবে ভারতের সঙ্গে নৌক্ষমতার সমতা অর্জন করছে।

ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে বিমানবাহী রণতরী, ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেট, সাবমেরিন, দীর্ঘপাল্লার সামুদ্রিক নজরদারি বিমান এবং অ্যান্টি-সাবমেরিন হেলিকপ্টারসহ অনেক বিস্তৃত সক্ষমতা রয়েছে। বিশেষ করে পি-৮আই সামুদ্রিক টহল বিমান ও এমএইচ-৬০আর হেলিকপ্টার ভারতের সাবমেরিন শনাক্ত ও মোকাবিলার ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অর্থাৎ হ্যাঙ্গর পাকিস্তানের জন্য একটি নতুন সামুদ্রিক সক্ষমতা তৈরি করছে, কিন্তু এটি ভারতীয় নৌবাহিনীর সামগ্রিক আকার ও বহুমাত্রিক সক্ষমতার চিত্রকে একাই বদলে দিচ্ছে না।

সাবমেরিন যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সবসময় কে বেশি বড় বা কে বেশি ক্ষেপণাস্ত্র বহন করে—তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কে আগে কাকে শনাক্ত করতে পারছে।

সমুদ্রের নিচে শব্দের আচরণ পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, গভীরতা ও অন্যান্য পরিবেশগত কারণে পরিবর্তিত হয়। ফলে একটি নীরবে চলা সাবমেরিন খুঁজে বের করা অত্যন্ত জটিল কাজ।

এআইপি প্রযুক্তি সেই সমস্যাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। কারণ সাবমেরিনকে দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকতে দিলে তার অবস্থান শনাক্ত করার সুযোগ কমে যেতে পারে। তাই হ্যাঙ্গরের প্রকৃত মূল্য শুধু এর ক্ষেপণাস্ত্রে নয়—এর অদৃশ্য থাকার সক্ষমতায়।

‘হ্যাঙ্গর’ নামটিও পাকিস্তানের নৌ-ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে তৎকালীন পাকিস্তানি ডুবোজাহাজ পিএনএস হ্যাঙ্গর ভারতীয় নৌবাহিনীর ফ্রিগেট আইএনএস খুকরি ডুবিয়ে দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনো ডুবোজাহাজের আক্রমণে একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়ার অন্যতম আলোচিত ঘটনা সেটি।

অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পর একই নামের নতুন প্রজন্মের ডুবোজাহাজ যখন আরব সাগরে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে, তখন প্রতীকী গুরুত্বও কম নয়।

সাম্প্রতিক এই পরীক্ষার সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। ১৫ সেপ্টেম্বর উত্তর আরব সাগরে ভারতীয় ও পাকিস্তানি নৌযানের মধ্যে সংঘর্ষের পর দুই দেশই পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। দুই পক্ষই ঘটনার জন্য ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে।

এর মাত্র কয়েক দিন পর পাকিস্তানের নতুন সাবমেরিনের সরাসরি অস্ত্র পরীক্ষা আরব সাগরের সামরিক পরিবেশকে আরও নজরকাড়া করে তুলেছে।

তবে দুটি ঘটনাকে সরাসরি একই সামরিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখার মতো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই।

হ্যাঙ্গরকে ‘গুপ্তঘাতক’ বলা মূলত এর গোপন অবস্থান, দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার সক্ষমতা এবং দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা বোঝাতে একটি সাংবাদিকতামূলক উপমা। সামরিক বাস্তবতায় এটি কোনো অপ্রতিরোধ্য অস্ত্র নয়।

এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য, লক্ষ্য শনাক্তকরণ, যোগাযোগব্যবস্থা, সমুদ্রের পরিবেশ এবং প্রতিপক্ষের অ্যান্টি-সাবমেরিন সক্ষমতার ওপর।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—পাকিস্তানের সাবমেরিন বাহিনী এখন এমন এক পর্যায়ে যাচ্ছে, যেখানে শুধু উপকূল রক্ষার কথা নয়, বরং আরব সাগরে ভারতের নৌ-চলাচল ও যুদ্ধজাহাজের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরির সক্ষমতাও তৈরি হচ্ছে।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত