একসঙ্গে হাম-ডেঙ্গুর চাপে বাড়ছে উদ্বেগ

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর একই সঙ্গে হাম ও ডেঙ্গুর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলাতেও সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে। অন্যদিকে বছরের শুরু থেকে চলমান হাম পরিস্থিতি শিশুস্বাস্থ্যকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। ফলে একই সময়ে দুটি সংক্রামক রোগের চিকিৎসা সামলাতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চাপ বাড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৫ অক্টোবরের সর্বশেষ ডেঙ্গু পরিস্থিতি প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ১ হাজার ৯০২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে মারা গেছেন ৯ জন। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭১ এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৮৮ হাজার ৩৬০। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন ৫ হাজার ৭৫৪ জন।

পরিস্থিতির অবনতিতে বিশেষ করে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে শয্যার ওপর চাপ বেড়েছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে হাসপাতালগুলোকে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছে। প্রয়োজনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের কিছু রোগী অন্যত্র স্থানান্তর করে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য জায়গা তৈরির কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে।

সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর ভয়াবহ চিত্র
চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক সময়গুলোর মধ্যে ছিল সেপ্টেম্বর মাস। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ওই মাসে ডেঙ্গুতে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। অর্থাৎ বছরের অন্য সময়ের তুলনায় সেপ্টেম্বরেই সংক্রমণ ও মৃত্যুর বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে। অক্টোবরেও পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষণ স্পষ্ট নয়। ৫ অক্টোবর পর্যন্ত অক্টোবরে ডেঙ্গুতে ২৬ জনের মৃত্যু এবং ৮ হাজার ৭৪০ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ফলে বর্ষা-পরবর্তী সময়েও ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন- বৃষ্টিপাত, জমে থাকা পানি এবং এডিস মশার বিস্তারের সঙ্গে ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে এবার উদ্বেগের বড় কারণ হলো সংক্রমণ রাজধানীকেন্দ্রিক না থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

ঢাকার বাইরেও বাড়ছে ডেঙ্গুর চাপ
৬ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে- ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও বরিশালে ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু এই পাঁচ অঞ্চলে ডেঙ্গুতে ১২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে খুলনায় ৪৪, ময়মনসিংহে ২২, চট্টগ্রামে ২০, বরিশালে ১৯ এবং রাজশাহীতে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ইউনিটে ৪০টি শয্যা থাকলেও এক পর্যায়ে সেখানে ১১৪ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৫০ শয্যার ডেঙ্গু ওয়ার্ডেও রোগীর সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যায়। কিছু রোগীকে মেঝে ও বারান্দায় চিকিৎসা নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে ডেঙ্গু চিকিৎসার সক্ষমতা শুধু রাজধানীতে বাড়ানো নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বাইরে চিকিৎসা সক্ষমতা পর্যাপ্ত না হলে গুরুতর রোগীদের রাজধানীতে স্থানান্তর করতে হবে। এতে ঢাকার হাসপাতালগুলোর ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমও আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে।

একই সময়ে হামেও উদ্বেগ
ডেঙ্গুর সঙ্গে একই সময়ে হাম পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ ২০২৬ থেকে বাংলাদেশে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাব চলছে। সরকারি হিসাবে ২১ হাজারের বেশি হাম আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে; সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। হামে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু। গুরুতর আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপও বেড়েছে।

হাম পরিস্থিতির পেছনে টিকাদানের ঘাটতিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৬ সালের হাম প্রাদুর্ভাব দেশের টিকাদান কর্মসূচিতে বিদ্যমান রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি ও ব্যবস্থাগত দুর্বলতাকে সামনে এনেছে।

টিকাদান কর্মসূচিতে জোর
হাম মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৩৪ লাখ টিকাবঞ্চিত বা আগে বাদ পড়ে যাওয়া শিশুকে লক্ষ্য করে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। এ কর্মসূচিতে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় সরকার দেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি ও টিকা-নির্ভর রোগের নজরদারি ব্যবস্থা নিয়ে একটি স্বাধীন পর্যালোচনাও শুরু করেছে। ৪ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই পর্যালোচনায় দেশের আটটি বিভাগেই বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে। এর লক্ষ্য হলো টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নির্ধারণ করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এই পর্যালোচনায় টিকা সরবরাহ, সংরক্ষণ, স্বাস্থ্যকর্মী, টিকাদানের আওতা, রোগ নজরদারি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

একই সময়ে দুই রোগের চাপ কেন উদ্বেগজনক?
হাম ও ডেঙ্গু সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের রোগ। হাম ভাইরাসজনিত এবং অত্যন্ত সংক্রামক; অন্যদিকে ডেঙ্গু এডিস মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ। কিন্তু জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর এদের প্রভাব একই সময়ে পড়লে সমস্যা জটিল হয়ে উঠতে পারে।

একদিকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, স্যালাইন ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রয়োজন বাড়ছে। অন্যদিকে হাম আক্রান্ত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। ফলে হাসপাতালের সাধারণ শয্যা, শিশু ওয়ার্ড এবং জরুরি বিভাগ সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই সময়ে ডেঙ্গু ও হাম মোকাবিলা করতে গিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর কারণে চিকিৎসা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

শুধু হাসপাতাল বাড়ালেই হবে না
ডেঙ্গু মোকাবিলায় অতিরিক্ত শয্যা ও চিকিৎসা সুবিধা জরুরি হলেও বিশেষজ্ঞরা মশা নিয়ন্ত্রণকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন। কারণ আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা পেলেও এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সংক্রমণের চক্র ভাঙা কঠিন। ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। আগে রাজধানীকেন্দ্রিক মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের পাশাপাশি এখন জেলা, উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে আরও সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে হাম নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র টিকাদান। যেসব শিশু টিকা পায়নি বা নির্ধারিত সময়ে টিকার আওতায় আসেনি, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকাদানের আওতায় আনা এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি পূরণ করা জরুরি।

অক্টোবরে ডেঙ্গুর উদ্বেগ বাড়ছে
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে অক্টোবর গুরুত্বপূর্ণ সময়। সেপ্টেম্বরেই সংক্রমণ ও মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং অক্টোবরের প্রথম কয়েক দিনেও উচ্চসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে এক দিনেই ১ হাজার ৯০২ জন হাসপাতালে ভর্তি এবং ৯ জনের মৃত্যু পরিস্থিতির তীব্রতা স্পষ্ট করছে।

অন্যদিকে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চললেও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাধীন পর্যালোচনাও দেখাচ্ছে, শুধু জরুরি পদক্ষেপ নয়, দীর্ঘমেয়াদে দেশের টিকাদান ও রোগ নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।

সমন্বিত উদ্যোগই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
হাম ও ডেঙ্গু- দুই রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কৌশল আলাদা হলেও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিক থেকে এখন প্রয়োজন সমন্বিত প্রস্তুতি। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা ও জনবল, জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধি, ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ, শিশুদের টিকাদানের ঘাটতি পূরণ এবং রোগ শনাক্তকরণ ও নজরদারি জোরদার সবগুলো উদ্যোগ একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।

কারণ একদিকে ডেঙ্গুর দ্রুত বিস্তার এবং অন্যদিকে হাম প্রাদুর্ভাব দুটি সংকট একই সময়ে চলতে থাকলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে হাসপাতাল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর। বাংলাদেশের সামনে তাই এখন শুধু রোগীর চিকিৎসা নয়, সংক্রমণের উৎস ও ঝুঁকি কমানোর বড় চ্যালেঞ্জ। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে মশা নিয়ন্ত্রণ এবং হামের ক্ষেত্রে টিকাদানের আওতা বাড়ানো এই দুই জায়গায় কার্যকর ব্যবস্থা জোরদার করা না গেলে হাসপাতালের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

জেএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত