বলিউডে অনেক অভিনেতা এসেছেন, জনপ্রিয় হয়েছেন, আবার সময়ের সঙ্গে হারিয়েও গেছেন। কিন্তু কিছু অভিনয়শিল্পী আছেন, যাঁদের পর্দায় উপস্থিতি শুধু একটি চরিত্রকে প্রাণ দেয় না, পুরো সিনেমার আবহ বদলে দেয়। নানা পাটেকার তাঁদেরই একজন। শক্তিশালী সংলাপ, চোখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠের ওঠানামা এবং চরিত্রের ভেতরের দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তোলার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে হিন্দি সিনেমার অন্যতম স্বতন্ত্র অভিনেতায় পরিণত করেছে।
নানা পাটেকারের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি চরিত্রকে শুধু অভিনয় করেন না, বরং চরিত্রটির মানসিক জগতে ঢুকে যান। কখনো তিনি ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ, কখনো ভয়ংকর অপরাধী, কখনো কঠোর পুলিশ কর্মকর্তা, আবার কখনো ক্ষমতা ও অপরাধের অন্ধকার জগতের একজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তাঁর অভিনয়ে সংলাপ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ তাঁর নীরবতা। অনেক সময় একটি দৃশ্যে তাঁর কয়েক সেকেন্ডের নীরবতাই দীর্ঘ সংলাপের চেয়ে বেশি অর্থ বহন করে।
তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য সিনেমা দর্শকদের উপহার দিয়েছেন। তবে তাঁর অভিনয় প্রতিভার বিশেষ দৃষ্টান্ত হিসেবে পাঁচটি সিনেমাকে আলাদাভাবে উল্লেখ করা যায়—‘ক্রান্তিবীর’, ‘পরিন্দা’, ‘অব তক ছাপ্পান’, ‘অগ্নিসাক্ষী’ এবং ‘অ্যাপহরণ’।
ক্রান্তিবীর: প্রতিবাদের আগুনে এক অসাধারণ চরিত্র
নানা পাটেকারের অন্যতম স্মরণীয় সিনেমা ‘ক্রান্তিবীর’। ১৯৯৪ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি পরিচালনা করেন মেহুল কুমার। এতে নানা পাটেকার অভিনয় করেন প্রতাপ নারায়ণ তিলক চরিত্রে।
সামাজিক অন্যায়, দুর্নীতি, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে নির্মিত সিনেমাটিতে নানা পাটেকারের চরিত্রটি ধীরে ধীরে প্রতিবাদী এক কণ্ঠে পরিণত হয়। তাঁর অভিনয়ের মধ্যে ছিল ক্ষোভ, হতাশা, বেদনা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।
প্রতাপ নারায়ণ তিলকের চরিত্রে নানা পাটেকারের সংলাপ বলার ধরন দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া তৈরি করে। তাঁর কণ্ঠের দৃঢ়তা এবং চোখেমুখে আবেগ চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
‘ক্রান্তিবীর’-এর জন্য নানা পাটেকার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। সিনেমাটি তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরিন্দা: অপরাধজগতের অন্ধকারে তীব্র অভিনয়
১৯৮৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘পরিন্দা’ হিন্দি সিনেমার অপরাধভিত্তিক গল্পের অন্যতম আলোচিত চলচ্চিত্র। বিধু বিনোদ চোপড়া পরিচালিত সিনেমাটির গল্প মুম্বাইয়ের অপরাধজগতকে কেন্দ্র করে।
এই সিনেমায় নানা পাটেকারের অভিনয় ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। অপরাধজগতের নির্মমতা, ক্ষমতার লড়াই এবং মানুষের মানসিক পরিবর্তনকে তিনি যে তীব্রতায় তুলে ধরেছেন, তা সিনেমাটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
‘পরিন্দা’-তে নানা পাটেকারের অভিনয়ের একটি বিশেষ দিক হলো তাঁর চরিত্রের ভয়ংকর উপস্থিতি। তিনি অতিরিক্ত অভিনয়ের আশ্রয় না নিয়ে চোখের দৃষ্টি, কণ্ঠস্বর এবং শরীরী ভাষার মাধ্যমে চরিত্রের নিষ্ঠুরতা প্রকাশ করেছেন।
সিনেমাটির আবহ, গল্প বলার ধরন এবং চরিত্রগুলোর জটিলতার সঙ্গে নানা পাটেকারের অভিনয় মিলে তৈরি করে এক অন্ধকার ও বাস্তবধর্মী জগত। তাঁর অভিনয় পরবর্তী সময়ে হিন্দি সিনেমায় অপরাধজগতের চরিত্র উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে ওঠে।
অব তক ছাপ্পান: পুলিশের ইউনিফর্মে বাস্তবতার কঠিন মুখ
নানা পাটেকারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সিনেমা ‘অব তক ছাপ্পান’। ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি পরিচালনা করেন শিমিত আমিন। এতে তিনি অভিনয় করেন পুলিশ কর্মকর্তা সাধু আগাশে চরিত্রে।
এটি একজন এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট পুলিশ কর্মকর্তার গল্প। অপরাধ দমন করতে গিয়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তা কীভাবে নৈতিকতা, ব্যক্তিগত জীবন এবং দায়িত্বের মধ্যে দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হন—সিনেমাটিতে তারই একটি কঠিন চিত্র ফুটে ওঠে।
সাধু আগাশে চরিত্রে নানা পাটেকারের অভিনয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তাঁর সংযম। তিনি চরিত্রটিকে অতিরঞ্জিত করেননি। বরং একজন অভিজ্ঞ ও কঠোর পুলিশ কর্মকর্তার মতো স্বাভাবিক আচরণ, সংলাপ এবং শরীরী ভাষার মাধ্যমে চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন।
বিশেষ করে তাঁর ঠান্ডা ও হিসাবি সংলাপ বলার ধরন দর্শকের মনে চরিত্রটির প্রভাব তৈরি করে। সিনেমাটির বাস্তবধর্মী নির্মাণশৈলীর সঙ্গে তাঁর অভিনয়ও ছিল অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অগ্নিসাক্ষী: ভয় ও মানসিক আতঙ্কের অন্য নাম
১৯৯৬ সালের ‘অগ্নিসাক্ষী’ নানা পাটেকারের অভিনয়জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পার্থ ঘোষ পরিচালিত এই সিনেমায় তিনি এমন এক স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করেন, যার আচরণে রয়েছে ভয়, নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা এবং মানসিক অস্থিরতার ছাপ।
সিনেমাটিতে নানা পাটেকারের চরিত্র দর্শকের মধ্যে একই সঙ্গে ভয় ও কৌতূহল তৈরি করে। তিনি যে ধরনের চরিত্রে সাধারণত দেখা যান, ‘অগ্নিসাক্ষী’-তে তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানসিক জগৎ তুলে ধরেন।
এই চরিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর অনিশ্চয়তা। দর্শক কখনো বুঝতে পারেন না, চরিত্রটি পরবর্তী মুহূর্তে কী করতে পারে। নানা পাটেকারের চোখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠের পরিবর্তন এবং আচরণের সূক্ষ্ম ওঠানামা চরিত্রটিকে আরও ভীতিকর করে তোলে।
এ কারণেই ‘অগ্নিসাক্ষী’ নানা পাটেকারের অভিনয়জীবনে একটি স্মরণীয় সিনেমা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
অ্যাপহরণ: অপরাধ, রাজনীতি ও ক্ষমতার জটিল সমীকরণ
২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অ্যাপহরণ’ পরিচালনা করেন প্রকাশ ঝা। বিহারের অপরাধ, অপহরণ এবং রাজনীতির জটিল সম্পর্ককে কেন্দ্র করে নির্মিত এই সিনেমায় নানা পাটেকারের অভিনয় ছিল অত্যন্ত পরিণত।
সিনেমাটিতে অপরাধ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে, তার একটি বাস্তবধর্মী চিত্র পাওয়া যায়। নানা পাটেকারের চরিত্র এই জগতের ক্ষমতা, কৌশল এবং দ্বন্দ্বকে আরও গভীর করে তোলে।
তাঁর সংলাপ বলার ধরন এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সংলাপের প্রতিটি শব্দকে তিনি চরিত্রের মানসিক অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করেছেন। ফলে তাঁর উপস্থিতি অনেক দৃশ্যেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
প্রকাশ ঝার রাজনৈতিক-সামাজিক সিনেমার বাস্তবধর্মী আবহ এবং নানা পাটেকারের অভিনয় একে অপরকে শক্তিশালী করেছে। ফলে ‘অ্যাপহরণ’ শুধু একটি অপরাধের গল্প হয়ে থাকেনি; এটি ক্ষমতা ও সমাজের সম্পর্কের একটি জটিল চিত্রও হয়ে উঠেছে।
কেন নানা পাটেকার আলাদা?
নানা পাটেকারের অভিনয়কে আলাদা করে দেখার অন্যতম কারণ তাঁর স্বাভাবিকতা। তিনি চরিত্রকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করেন না; বরং চরিত্রের ভেতরের শক্তিকে সামনে আনেন। তাঁর অভিনয়ে সংলাপের পাশাপাশি বিরতি, নীরবতা, চোখের ভাষা এবং শরীরী অভিব্যক্তিরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
‘ক্রান্তিবীর’-এর প্রতিবাদী মানুষ, ‘পরিন্দা’র অপরাধী জগতের চরিত্র, ‘অব তক ছাপ্পান’-এর কঠোর পুলিশ কর্মকর্তা, ‘অগ্নিসাক্ষী’র ভয়ংকর স্বামী কিংবা ‘অ্যাপহরণ’-এর ক্ষমতার জটিল খেলায় থাকা চরিত্র—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজেকে আলাদা করে উপস্থাপন করেছেন।
নানা পাটেকারের অভিনয়ের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য তাঁর কণ্ঠ। তাঁর সংলাপ উচ্চারণে এমন একটি স্বতন্ত্র ছন্দ রয়েছে, যা সাধারণ একটি বাক্যকেও স্মরণীয় করে তুলতে পারে। এ কারণেই তাঁর অনেক সংলাপ সিনেমার গণ্ডি পেরিয়ে দর্শকের দৈনন্দিন কথাবার্তার অংশ হয়ে গেছে।
বলিউডে জনপ্রিয়তার তালিকা দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু অভিনয়ের গভীরতা ও চরিত্রের বৈচিত্র্যের বিচারে নানা পাটেকার নিঃসন্দেহে আলাদা একটি অবস্থান তৈরি করেছেন। ‘ক্রান্তিবীর’, ‘পরিন্দা’, ‘অব তক ছাপ্পান’, ‘অগ্নিসাক্ষী’ ও ‘অ্যাপহরণ’—এই পাঁচটি সিনেমা তাঁর অভিনয় প্রতিভার পাঁচটি ভিন্ন দিক তুলে ধরে।
কখনো তিনি প্রতিবাদের কণ্ঠ, কখনো অপরাধের অন্ধকার মুখ, কখনো কঠোর আইনরক্ষক, আবার কখনো ভয়ংকর মানসিকতার মানুষ। চরিত্র যতই বদলেছে, তাঁর অভিনয়ের তীব্রতা ততই দর্শককে নতুন করে মুগ্ধ করেছে। আর এ কারণেই নানা পাটেকার শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতা নন; ভারতীয় সিনেমায় তিনি এমন একজন শিল্পী, যার অভিনয় চরিত্র শেষ হওয়ার পরও দর্শকের মনে দীর্ঘ সময় ধরে থেকে যায়।
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ক্ষয়ক্ষতি ৮১-এর চেয়েও বেশি: আরাঘচি
নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত বৈঠক শুরু, আলোচনায় যা থাকছে
হুথিদের এক হাজার ৮৬০ যোদ্ধা নিহত
রূপগঞ্জে রোলিং মিলে চুল্লি বিস্ফোরণ, দগ্ধ ৪
ভারতীয় বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকার আর নেই
‘ভারতে আর শান্তি নেই’ মন্তব্যে তুমুল বিতর্ক, এবার মুখ খুললেন সঞ্জয় দত্ত
হলিউডের আইকনিক সিনেমার শুটিং থেকে আফ্রিকার চলচ্চিত্রশিল্পের উত্থান