রুশ সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেই ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের কাছে গোপন সামরিক তথ্য সরবরাহ করতেন লেফটেন্যান্ট লেভ স্তুপনিকভ। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইউক্রেনীয় বাহিনীর হামলায় ৩০০ জনের বেশি রুশ সেনা নিহত হন বলে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পরে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সম্মুখসারির যুদ্ধক্ষেত্র পেরিয়ে ইউক্রেনে পালিয়ে যান ২৬ বছর বয়সী এই কর্মকর্তা।
রুশ সেনাবাহিনীতে স্তুপনিকভের দায়িত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সেনাদের অবস্থান, বাহিনীর চলাচল, যুদ্ধপরিকল্পনা এবং নজরদারি ড্রোন ও ক্যামেরার তথ্য পাওয়ার সুযোগ পেতেন। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের কাছে রুশ সেনাদের অবস্থান ও সম্ভাব্য অভিযানের তথ্য পাঠাতেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে তাঁর কর্মকাণ্ডের ব্যক্তিগত মূল্যও ছিল। ইউক্রেনে যাওয়ার পর তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যোগ দেন। এদিকে তাঁর স্ত্রী লিজা তাঁকে রাশিয়া ও দাম্পত্য জীবনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার অভিযোগ করেন। একপর্যায়ে স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
বুদিওনি মিলিটারি একাডেমি অব দ্য সিগন্যাল কর্পসের স্নাতক স্তুপনিকভকে ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবস্থান উগলেদার দখলের দায়িত্বে থাকা একটি ব্যাটালিয়নের প্রধান যোগাযোগ কর্মকর্তা করা হয়েছিল।
তাঁর কাজ ছিল সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে বিভিন্ন ইউনিটের যোগাযোগ সচল রাখা এবং নজরদারি ব্যবস্থার তথ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু গোপনে তিনি ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দাদের কাছে রুশ সেনাদের অবস্থান ও চলাচলের নির্দিষ্ট তথ্য পাঠাতেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পূর্ব ইউক্রেনের এক হিমশীতল সকালে পেটব্যথার ভান করে সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে সরে যান স্তুপনিকভ। এর কিছুক্ষণ পরই তাঁর সরবরাহ করা স্থানাঙ্ক লক্ষ্য করে ইউক্রেনীয় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়।
ওই হামলায় ৬৮ জন রুশ সেনা নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন কর্নেল গুসেইন মুসায়েভ। হামলায় আরও ৬০ জন আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামলার পর ইউক্রেনীয় এক যোগাযোগকারী স্তুপনিকভকে বার্তা পাঠিয়ে বিস্ফোরণের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চান এবং ছবি পাঠাতে বলেন। জবাবে স্তুপনিকভের বক্তব্য ছিল, সেখানে শুধু লাশ পড়ে আছে।
এই ঘটনা ইউক্রেনের এমন একটি গোয়েন্দা তৎপরতার অংশ ছিল, যেখানে রাশিয়ার ভেতরে থাকা সেনাসদস্যসহ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে সামরিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনক্রিপ্ট করা যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে হাজারো ব্যক্তি ইউক্রেনীয় এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
স্তুপনিকভের রুশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পেছনে ছিল ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান নিয়ে তাঁর বিরোধিতা।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ বাহিনীর অভিযান শুরুর সময় ইউক্রেনের শহরগুলোর ওপর দিয়ে রুশ হেলিকপ্টার উড়ে যাওয়া এবং বোমা বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বলে জানান।
তাঁর ভাষায়, নিরপরাধ বেসামরিক মানুষের ওপর বোমা ফেলা হচ্ছিল, যা ছিল অশুভ কাজ।
যুদ্ধ চলতে থাকলেও সহযোদ্ধাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল। বাড়িতে স্ত্রী লিজার সঙ্গে তিনি রুশ বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ভিডিও এবং ইউক্রেনের হাতে বন্দি রুশ সেনাদের সাক্ষাৎকার দেখতেন।
সামরিক একাডেমিতেও তাঁর মতো চিন্তাভাবনার কিছু ক্যাডেট ছিলেন। তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া থাকলেও প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থান জানানো কঠিন ছিল। কয়েকজন একাডেমি ছাড়ার চেষ্টা করলেও তাঁদের আবেদন মাসের পর মাস ঝুলে ছিল।
স্তুপনিকভ বলেন, বাইরে থেকে নিজের আবেগ প্রকাশ করতে পারতেন না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্ষোভে জ্বলছিলেন।
স্তুপনিকভের মা তাতিয়ানা ইয়ানৎসেনও পুতিনের বিরোধী ছিলেন। ৪৯ বছর বয়সী এই নারী রুশ প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও অংশ নিয়েছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছেলে সম্মুখসারিতে দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় তিন মাস পর তিনি দিমিত্রো কারপেঙ্কোর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কারপেঙ্কো একজন কম্পিউটার প্রোগ্রামার, যিনি ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতেন।
এনক্রিপ্ট করা যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে রুশ তথ্যদাতাদের একটি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন কারপেঙ্কো। ইউক্রেনের হাতে বন্দি রুশ সেনাদের ভিডিও সাক্ষাৎকার প্রকাশের মাধ্যমেও তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু রুশ সেনা দেশে ফিরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থের বিনিময়ে সামরিক তথ্য দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
২০২৩ সালের অক্টোবরে কারপেঙ্কো রুশ সেনাদের কাছ থেকে ইউক্রেনের সামরিক অভিযানে সহায়ক তথ্য পাওয়ার বিনিময়ে আড়াই লাখ রুবল—তৎকালীন হিসাবে প্রায় ২ হাজার ৭০০ ডলার—পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই নেটওয়ার্কের সহায়তাতেই শেষ পর্যন্ত স্তুপনিকভের ইউক্রেনে পালানোর পরিকল্পনা করা হয়। বিপজ্জনক সম্মুখসারির মধ্য দিয়ে যাওয়ার পথ নির্ধারণে তিনি, কারপেঙ্কো এবং ইউক্রেনীয় স্কাউটরা এনক্রিপ্ট করা অ্যাপ ব্যবহার করেন।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাতে নিজের রুশ ইউনিট থেকে পালিয়ে ইউক্রেনীয় অবস্থানের দিকে রওনা হন স্তুপনিকভ। একটি ভূগর্ভস্থ বাংকার থেকে সরাসরি ভিডিওর মাধ্যমে ইউক্রেনীয় সদস্যরা তাঁর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রায় ৪০ মিনিট পর তিনি একটি গাছপালাঘেরা এলাকায় পৌঁছান। সেখানে ইউক্রেনের ৭২তম ব্রিগেডের সেনারা অবস্থান করছিলেন।
রুশ সামরিক পোশাক পরা একজন ব্যক্তিকে নিজেদের অবস্থানের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে ইউক্রেনীয় সেনারা অস্ত্র তাক করেন এবং সংকেত-শব্দ জানতে চান। আগে থেকে ঠিক করা সংকেত হিসেবে স্তুপনিকভ ‘পিনাট শপ’ শব্দ দুটি বলেন। এরপর তাঁকে ইউক্রেনীয় বাহিনীর হেফাজতে নেওয়া হয়।
পরে তিনি রুশ ভলান্টিয়ার কর্পসে (আরভিসি) যোগ দেন। রাশিয়ার জাতিগত রুশদের নিয়ে গঠিত এই ইউনিটটি পুতিন সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। বর্তমানে স্তুপনিকভ সেখানে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্তুপনিকভের মা ও বোন একটি করে ব্যাকপ্যাক ও স্যুটকেস নিয়ে মলদোভা যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে ইউক্রেনে প্রবেশ করে কারপেঙ্কোর সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের।
এর আগে কয়েক মাস ধরে রুশ সামরিক কর্মকর্তারা তাতিয়ানাকে ফোন করে ছেলেকে আত্মসমর্পণে রাজি করানোর অনুরোধ জানাচ্ছিলেন। ছেলে বেঁচে থাকলে তাকে ফিরে আসতে বোঝানোর চেষ্টা করতে বলা হতো। তাতিয়ানা নিজেকে উদ্বিগ্ন মা হিসেবে উপস্থাপন করে বলতেন, ছেলেকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের।
এক বছর পর কারপেঙ্কোর সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টার একটি ভিডিও সাক্ষাৎকারে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন স্তুপনিকভ। এতে তাঁর পক্ষত্যাগ এবং ইউক্রেনকে দেওয়া গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
তবে নিজের কর্মকাণ্ডকে সামরিক শপথের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে করেন না তিনি। তাঁর বক্তব্য, সামরিক একাডেমিতে তিনি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক ব্যবস্থা রক্ষার শপথ নিয়েছিলেন। পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণ সেই নীতিগুলোই ধ্বংস করেছে বলে তাঁর দাবি।
হুথিদের হামলায় ইরানকে দায়ী করলো সৌদি আরব
মুসলিম বিশ্বে ‘মোহাম্মদ’ নাম নিয়ে ট্রাম্পের কটাক্ষ
দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ দিনের মাথায় ট্রাম্পের প্রেস সচিব বরখাস্ত