'ইন্টারনেট শিশুদের মৌলিক অধিকার, কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়া যাবে না'

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৯ পিএম

শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে নয় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আদালত বলেছেন, বয়স যা-ই হোক, ইন্টারনেটে প্রবেশ ও তা ব্যবহারের অধিকার প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক অধিকার। অনলাইনে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে তাদের এই অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করা যায় না।

গত ১৫ অক্টোবর বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা ও বিচারপতি কে ভি চন্দ্রনের বেঞ্চ এ পর্যবেক্ষণ দেন। শিশু অধিকারবিষয়ক সংস্থা ‘জাস্ট রাইটস ফর চিলড্রেন অ্যালায়েন্স’ এবং আরেক আবেদনকারীর করা আবেদনের শুনানিতে আদালত এসব কথা বলেন।

ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ এবং ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সম্পর্কিত মৌলিক অধিকারের ভিত্তিতে ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকার স্বীকার করে আদালত বলেন, শিশুদের বয়সের কারণে তাদের এই অধিকার অস্বীকার করা যায় না।

বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, শিশুদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা পরস্পরবিরোধী নয়। শিশুদের দুটিই পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা নয়, ক্ষতিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে বয়সভিত্তিক সার্বিক নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে কঠোর সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিচারপতিরা।

আদালত বলেন, শিশুদের ইন্টারনেট থেকে দূরে রাখার বদলে ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরি, প্রচার ও ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের যৌন নিপীড়ন ও শোষণসংক্রান্ত কনটেন্ট শনাক্ত এবং অপসারণে ব্যর্থ হলে তার দায় শিশুদের ওপর চাপানো উচিত নয়।

আবেদনকারীদের অভিযোগ ছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিশুদের যৌন নিপীড়ন ও শোষণসংক্রান্ত উপাদান শনাক্ত করা এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে তা জানানোর আইনি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে না। কিছু ক্ষেত্রে পুনর্নির্দেশকারী লিংক ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এ ধরনের কনটেন্টের অর্থের বিনিময়ে প্রচারের অভিযোগও তোলা হয়।

এ ধরনের কনটেন্টের পুনঃপ্রচার এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্ল্যাটফর্মগুলোর উদ্যোগের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন আদালত।

শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থা

ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকার স্বীকার করলেও শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক পদক্ষেপের কথা বলেছেন সুপ্রিম কোর্ট। এর মধ্যে রয়েছে

শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে বিশেষ ‘চাইল্ড মোড’ চালু করা।

অভিভাবকের তত্ত্বাবধান ও প্রয়োজনীয় সম্মতির ব্যবস্থা জোরদার করা।

শিশুদের জন্য ক্ষতিকর যৌন কনটেন্ট শনাক্ত ও দ্রুত অপসারণ করা।

অনলাইনে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা সহজ করা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিশ্চিত করা।

শিশুদের যৌন নিপীড়ন ও শোষণসংক্রান্ত কনটেন্ট শনাক্তে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা এবং জাতীয় পর্যায়ে ডিজিটাল শনাক্তকারক ও ইউআরএলের ডেটাবেজ গড়ে তোলা।

আদালত কেন্দ্রীয় সরকারকে এ ধরনের কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণে প্রযুক্তিগত নির্দেশিকা এবং মানসম্মত পরিচালনপদ্ধতি তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। পারসেপচুয়াল হ্যাশ-ম্যাচিং ও ইউআরএল তালিকাভুক্তির মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

অনলাইন নিরাপত্তা শিক্ষায় গুরুত্ব

শিশুদের নিরাপত্তার জন্য শুধু প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা যথেষ্ট নয় এ বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন আদালত। শিশুদের অনলাইন ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়টি আদালতের নির্দেশনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইন্টারনেট ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিলেই শিশুরা অনলাইন জগৎ থেকে দূরে থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং তারা অনিয়ন্ত্রিত ও অধিক ঝুঁকিপূর্ণ অনলাইন পরিসরে চলে যেতে পারে। নিষেধাজ্ঞা ভাঙার ভয়ে কোনো শিশু অনলাইনে হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার হলেও তা অভিভাবক কিংবা বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে জানাতে দ্বিধা করতে পারে।

এই পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে আদালত শিশুদের ডিজিটাল অধিকার এবং অনলাইন নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। অর্থাৎ শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ বজায় রেখেই ক্ষতিকর কনটেন্ট, শোষণ ও নির্যাতন প্রতিরোধে রাষ্ট্র এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্ব আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।

সূত্র: এনডিটিভি, বার অ্যান্ড বেঞ্চ, ইন্ডিয়া টুডে।

এএম
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত