ইরানকে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপে দুর্বল করে দেশটির জনগণকে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর যে কৌশল নেওয়া হয়েছিল, তা উল্টো জাতীয় সংহতি জোরদার করেছে; এমন বিশ্লেষণ উঠে এসেছে ইরানের সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ এজেন্সির এক নিবন্ধে। নিবন্ধটির দাবি, বিদেশি সামরিক হামলার মুখে ইরানের জনগণ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অসন্তোষ ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নকে আলাদা করে দেখছে। এর ফলে ওয়াশিংটনের প্রত্যাশিত রাজনৈতিক ফল অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে।
নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এ প্রকাশিত ‘দ্য থিওরি অব ইরান’স ভিক্টরি’ শীর্ষক একটি বিশ্লেষণের উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সামরিক হামলা ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করলেই কোনো দেশের জনগণ বিদেশি শক্তির পক্ষে চলে যাবে, এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সব সময় মেলে না।
তবে ইরানে জাতীয় সংহতি কতটা বেড়েছে কিংবা যুদ্ধ দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে কতটা শক্তিশালী করেছে, তা নির্ধারণে স্বাধীন জনমত জরিপ ও অন্যান্য প্রমাণও প্রয়োজন। মেহেরের নিবন্ধটি ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরলেও এর সব মূল্যায়নকে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। ইরানে জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অধিকার ও সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে এমন বাস্তবতা নিবন্ধটিতেও অস্বীকার করা হয়নি। তবে এসব অসন্তোষ থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে বিদেশি সামরিক হামলার মুখে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।
নিবন্ধটির যুক্তি, দেশের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা হুমকির মুখে পড়েছে বলে মানুষ মনে করলে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সাময়িকভাবে আড়ালে চলে যেতে পারে। তখন রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা সত্ত্বেও দেশের প্রতিরক্ষাকে সাধারণ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে পারে বিভিন্ন গোষ্ঠী। এর অর্থ এই নয় যে সরকারের সমালোচনা বন্ধ হয়ে যায় কিংবা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। বরং বিদেশি আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় পরিচয় ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন সামনে চলে আসতে পারে।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ কোনো দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটাবে কি-না, তা নির্ভর করে নানা বিষয়ের ওপর। নিষেধাজ্ঞা মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াতে পারে, ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত করতে পারে এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু এসব চাপের ফল সব দেশে এক রকম হয় না। মেহেরের নিবন্ধে বলা হয়েছে, জনগণ যদি মনে করে বিদেশি শক্তি তাদের জীবনমান উন্নত করার বদলে দেশের ওপর নিজেদের রাজনৈতিক ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে চায়, তাহলে সেই চাপের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী মনোভাব জোরদার হতে পারে। সামরিক হামলার সঙ্গে জাতীয় অবকাঠামো ও সক্ষমতা ধ্বংসের হুমকি যুক্ত হলে এ ধারণা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
এ বিষয়ে ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এ ড্যানি সিত্রিনোভিচের ২৯ এপ্রিল প্রকাশিত ‘হাউ দ্য ওয়ার সেভড দ্য ইরানিয়ান রেজিম’ শীর্ষক বিশ্লেষণেও যুদ্ধের রাজনৈতিক পরিণতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। নিবন্ধটির মূল প্রশ্ন হলো, সামরিকভাবে আঘাত হানতে পারা আর কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিবর্তন অর্জন করা কি একই বিষয়? ইরানের জনগণের মধ্যে জাতীয় ঐক্য জোরদার হলেও তাতে দেশটির সব অভ্যন্তরীণ সমস্যা মিটে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। অর্থনৈতিক সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয়, রাজনৈতিক অধিকার ও সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তোষ থেকে যেতে পারে। বাইরের সামরিক হুমকি কমে গেলে এসব বিষয় আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসতে পারে।
একইভাবে, যুদ্ধের সময় জনগণের প্রতিক্রিয়া থেকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমর্থনের মাত্রা নির্ধারণ করাও কঠিন। জাতীয় সংহতি, সরকারের প্রতি সমর্থন এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা তিনটি বিষয় এক নয়। ইরানের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হলো- বিদেশি হামলার বিরুদ্ধে জাতীয় পরিচয় ও সার্বভৌমত্বের অনুভূতি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং তা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে। এ প্রশ্নের উত্তর পেতে যুদ্ধকালীন বক্তব্যের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপ, রাজনৈতিক আচরণ ও যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
মেহেরের নিবন্ধের উপসংহার, ইরানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল নির্ধারণে দেশটির ইতিহাস, জাতীয় পরিচয় এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ সম্পর্কে জনগণের সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। শুধু হামলার সংখ্যা, অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি কিংবা নিষেধাজ্ঞার কঠোরতা দিয়ে কোনো কৌশলের সাফল্য নির্ধারণ করা যায় না। একটি দেশ সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও রাজনৈতিকভাবে ভেঙে না পড়তে পারে। আবার সাময়িক জাতীয় সংহতি দীর্ঘমেয়াদে সরকারের প্রতি সমর্থনে রূপ নেবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই।
অতএব, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল আনতে পেরেছে কি-না, তা নির্ধারণের জন্য শুধু সামরিক ক্ষয়ক্ষতি নয়, দেশটির সমাজ ও রাজনীতিতে সৃষ্ট বাস্তব পরিবর্তনও বিবেচনায় নিতে হবে। মেহেরের নিবন্ধটি যে বিষয়টির ওপর জোর দিয়েছে, তা হলো- বিদেশি চাপ সব সময় অভ্যন্তরীণ বিভাজন বাড়ায় না; নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তা জাতীয় ঐক্যও জোরদার করতে পারে।
সৌদি আরবে হুথিদের হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে দিচ্ছে ইরান
ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যও প্রতিরক্ষার শক্তি: ইরানের প্রেসিডেন্ট
নুডুলস খেয়ে একই পরিবারের ৫ জনের মৃত্যুর চাঞ্চল্যকর তথ্য
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আতঙ্ক এখন ক্ষুদ্র পিঁপড়া!
পাঁচ বছরের মধ্যে মহাকাশে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা!