পাঁচ বছরের মধ্যে মহাকাশে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা!

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৬ পিএম

আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মহাকাশে যুদ্ধ শুরু হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। স্যাটেলাইট লক্ষ্য করে হামলার উপযোগী অস্ত্র তৈরি করছে বিভিন্ন দেশ। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য ও তার মিত্ররাও সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাণিজ্যিক মহাকাশ প্রকল্পে কাজ করা কিছু প্রতিষ্ঠান এখন সামরিক প্রযুক্তি তৈরিতে যুক্ত হয়েছে। মহাকাশের আবর্জনা অপসারণের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত যুক্তরাজ্যের অ্যাস্ট্রোস্কেল গোপন সামরিক কর্মসূচিতে কাজ করছে। অন্যদিকে, স্যাটেলাইটে জ্বালানি সরবরাহের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা অরবিট ফ্যাব যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মহাকাশে প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক সক্ষমতা তৈরিতে কাজ করছে।

লন্ডনের কিংস কলেজের ফ্রিম্যান এয়ার অ্যান্ড স্পেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. জুলিয়া বালম বলেন, প্রতিপক্ষের দেশগুলো প্রতিদিনই মহাকাশে মিত্রদেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে।

লন্ডনে অ্যাস্ট্রোস্কেলের আয়োজিত এক সভায় তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু মহাকাশে সংঘাতের উদ্ভব দেখছি না, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই এমন সংঘাত শুরু হতে পারে।’

স্যাটেলাইটে বড় ধরনের হামলা হলে বৈশ্বিক অবস্থান নির্ণয়ব্যবস্থা (জিপিএস), ইন্টারনেট, টেলিভিশন সম্প্রচার, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও আকাশপথে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে। ব্যাংকিংসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে আধুনিক জীবনের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

মহাকাশে রাশিয়া ও চীনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা, ২০২২ সালে উৎক্ষেপণ করা রাশিয়ার কসমস-২৫৫৩ নামের একটি স্যাটেলাইটে পারমাণবিক যন্ত্রের উপাদান থাকতে পারে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি।

মহাকাশে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটলে বিকিরণ ও উচ্চশক্তির কণার কারণে হাজার হাজার স্যাটেলাইট ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে পৃথিবীর কক্ষপথের কিছু অংশ দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া রাশিয়ার কিছু স্যাটেলাইটকে অন্য মহাকাশযানের কাছাকাছি সন্দেহজনকভাবে চলাচল করতে দেখা গেছে। চলতি সপ্তাহে রাশিয়ার একটি সামরিক স্যাটেলাইট ইউক্রেনকে সহায়তা দিয়ে আসা আইসিআইই এক্স৩৬ নামের একটি স্যাটেলাইটের কাছাকাছি চলে যায়।

অন্যদিকে, কক্ষপথে থাকা বস্তু ধরে ফেলার সক্ষমতাসম্পন্ন মহাকাশযান পরীক্ষা করেছে চীন। দেশটির স্যাটেলাইটগুলো জ্বালানি সরবরাহ এবং খুব কাছাকাছি দূরত্বে অবস্থান পরিবর্তনের সক্ষমতাও দেখিয়েছে।

অ্যাস্ট্রোস্কেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিক শেভ বলেন, শুরুতে তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রতিরক্ষা খাতে কাজ করার পরিকল্পনা ছিল না। তবে ২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যের কৌশলগত প্রতিরক্ষা পর্যালোচনায় মহাকাশকে সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করার পর প্রতিষ্ঠানটি কাজের ধরন পরিবর্তন করে।

তিনি বলেন, ‘গত ২০ থেকে ৩০ বছর ধরে আমরা কক্ষপথে বস্তু পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পেরেছি যে সেগুলোতে হামলা হবে না। কিন্তু পরিস্থিতি এখন বদলে যাচ্ছে।’

শেভ জানান, শত্রুপক্ষের মহাকাশযান যাতে কাছে আসতে না পারে কিংবা স্যাটেলাইটে হস্তক্ষেপ করতে না পারে, সে জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে তাদের প্রতিষ্ঠান।

অরবিট ফ্যাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জ্যাকব গিয়ারের মতে, স্যাটেলাইটের অবস্থান পরিবর্তনের প্রযুক্তি প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ দুই ক্ষেত্রেই কাজে লাগতে পারে। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের পরিস্থিতি বদলে গেছে, আর সেই কারণেই প্রতিরক্ষা খাতে এই পরিবর্তন এসেছে। কাছাকাছি অবস্থানে থাকা মহাকাশযান পরিচালনার প্রযুক্তি মহাকাশে প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক উভয় ধরনের সক্ষমতা দিতে পারে।’

মহাকাশে সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করছে যুক্তরাজ্য। গত সেপ্টেম্বরে দেশটির রাজকীয় বিমানবাহিনী ব্রিটিশ স্যাটেলাইটের সুরক্ষায় প্রথমবারের মতো একটি বিশেষ মহাকাশ স্কোয়াড্রন গঠনের ঘোষণা দেয়।

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং সতর্ক করে বলেছেন, মহাকাশে হুমকির গতি, পরিসর ও জটিলতা বাড়ছে।

বিভিন্ন দেশ মহাকাশে ব্যবহারের জন্য লেজার, তড়িৎচুম্বকীয় স্পন্দন, স্যাটেলাইটের সেন্সর অকার্যকর করে দেওয়ার যন্ত্র এবং মহাকাশযান ধরে ফেলার বিশেষ যন্ত্র তৈরি করছে। এ ছাড়া স্যাটেলাইট ধ্বংসে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রও পরীক্ষা করা হয়েছে।

মহাকাশের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থাও নিজেদের প্রকল্পে সামরিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পৃথিবীর কক্ষপথ ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের নতুন মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র : দ্য টেলিগ্রাফ

এমএজেড
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত