ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। জবাবে আরও কঠোর প্রতিরোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। তবে সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা শুরুর প্রস্তাব বহাল রেখেছে ইরান।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেন, ইরান দ্রুত নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন না করলে যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই সামরিক অভিযান শেষ করে দিতে পারে। তাঁর দাবি, ইরানের সামরিক ও আর্থিক সক্ষমতা পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে।
ইসরায়েলের আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর প্রতি পূর্ণ সমর্থনও জানিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইসরায়েলে নেতৃত্বের পরিবর্তন হলে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেরাই অভিযান পরিচালনা করতে হতে পারে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটানো ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ উদ্দেশ্যে দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। নেতানিয়াহুর দাবি, ইসরায়েলের শত্রুদের পরাজিত করার কাজের ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ইরানের অর্থনৈতিক সংকট ও বিক্ষোভকে দেশটির সরকারের দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।
ওয়াশিংটনের সহায়তা থাকুক বা না থাকুক, প্রয়োজনে ইসরায়েল এককভাবে পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত বলেও জানান নেতানিয়াহু। ট্রাম্পের সমর্থনের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, দুই দেশ একসঙ্গে মিশন সম্পন্ন করবে।
পাল্টা হামলার কঠোর হুঁশিয়ারি ইরানের
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বক্তব্যের পর ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা সম্ভাব্য নতুন মার্কিন বা ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ট্রাম্পের ‘কাজ শেষ করে দেওয়ার’ বক্তব্যের জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, আবার ভাগ্য পরীক্ষা করতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্র তা করতে পারে। তবে ইরানেরও কিছু অসমাপ্ত কাজ রয়েছে বলে সতর্ক করেন তিনি।
আরাগচি অভিযোগ করেন, নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি যুদ্ধে জড়াতে চাইছেন নেতানিয়াহু।
এদিকে, রোববার ইরানের পার্লামেন্ট মেহেরদাদ আখলাঘি কেতাবচিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও মহাকাশ প্রযুক্তি খাতে অভিজ্ঞ এই কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নতুন নেতৃত্ব এসেছে।
কেতাবচি ট্রাম্পকে নতুন করে হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বরং এ অঞ্চলে থাকা নিজেদের সেনাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আলী আবদোল্লাহি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, নতুন কোনো হামলা হলে তার জবাব আগের চেয়ে ভিন্ন ও আরও কঠোর হবে। ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালানো হলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ভয়াবহ প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী—আইআরজিসিও।
সামরিক হুমকি ও পাল্টা হুঁশিয়ারির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি তেহরান। হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং পরবর্তী আলোচনা শুরুর বিষয়ে ইরানের সাত দিনের একটি প্রস্তাব এখনো বহাল রয়েছে বলে জানিয়েছেন আরাগচি।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ওয়াশিংটন তেহরানের শর্ত মেনে নিলে ষষ্ঠ দিনে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং সপ্তম দিনে আলোচনা শুরু হবে।
ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশটির বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়া, তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন রণাঙ্গনে শত্রুতা বন্ধ করা।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটন ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর বিষয়ে সম্মতি চায়। তেহরান শুরুতেই হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তেল পরিবহন স্বাভাবিক করার বিষয়গুলোকে আলোচনার অগ্রাধিকার দিতে চায়।
এদিকে, রোববার বাহরাইনে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সদস্য দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে এসব হামলা বন্ধের দাবি জানিয়েছে জোটটি।
একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা ও অবাধ যাতায়াত পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছে জিসিসি। তবে তেহরানের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতায় ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, ড্রোন এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে তারা। নিজেদের নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট আলোচনায় উপসাগরীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণও চেয়েছে জোটটি।
হরমুজে ট্যাংকারে বিস্ফোরণ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে জাহাজে হামলা
কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি সমুদ্রপথেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌবিভাগের দাবি, রোববার হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে একটি তেলবাহী ট্যাংকার নৌমাইনে আঘাত হানে। এতে জাহাজটির ইঞ্জিনকক্ষে বিস্ফোরণ ও আগুনের ঘটনা ঘটে। তবে ট্যাংকারটির পরিচয় ও ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সময় যেসব জাহাজ তাদের নেভিগেশন ব্যবস্থা বন্ধ রাখবে, সেগুলোকে ‘শত্রু জাহাজ’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলেও সতর্ক করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোর ফাক্কানের উত্তর-পূর্বে দক্ষিণমুখী একটি টাগবোটে অজ্ঞাত দুটি বস্তু আঘাত হানে। এতে জাহাজটির ক্ষতি হয় এবং একজন সামান্য আহত হন। ঘটনার পরও জাহাজটি তার যাত্রা অব্যাহত রাখে।
সৌদি আরবের পাশে থাকার ঘোষণা মিসরের
আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরবকে সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছে জিসিসি। ইয়েমেনের হুতিদের হামলা বৃদ্ধির নিন্দা জানিয়ে রিয়াদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে জোটটি।
মিসরও সৌদি আরবকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সম্ভাব্য সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় প্রয়োজনে দেশটির সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করার অনুমোদন চেয়ে পার্লামেন্টের দ্বারস্থ হন।
সব মিলিয়ে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন সামরিক হুমকি, তেহরানের পাল্টা প্রতিরোধের ঘোষণা এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা সংকট মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। আলোচনার প্রস্তাব বহাল থাকলেও সামরিক তৎপরতা ও সমুদ্রপথে সংঘাতের ঝুঁকি কমার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যায়নি।
ইসরায়েল থেকে ছেড়ে যাওয়া বিমানের বুলগেরিয়ায় জরুরি অবতরণ
জ্বালানি নিরাপত্তায় ঐতিহাসিক মাইলফলক রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
পাক-আফগান সীমান্তে সংঘর্ষ, তালেবান ঘাঁটি ধ্বংস