তেহরানে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ওয়াশিংটনের ‘হস্তক্ষেপবাদী ও বিভাজনমূলক নীতি’ অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। আঞ্চলিক দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতিকেও তিনি অস্থিতিশীলতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
সোমবারের (১৯ অক্টোবর ) এই বৈঠকে লাভরভ একটি কূটনৈতিক প্রতিনিধিদলের প্রধান হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনাই ছিল সফরের মূল এজেন্ডা।
পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আঞ্চলিক দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এ অঞ্চলের কোনো উপকারে আসেনি, আগামীতেও আসবে না। এসব ঘাঁটি শুধু উত্তেজনা ও বিভক্তি বাড়ায়, অস্থিতিশীলতা আর নিরাপত্তাহীনতাকে উসকে দেয়।’
সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ইসলামী বিপ্লবের নেতা, সামরিক কমান্ডার, বিজ্ঞানী ও স্কুলশিক্ষার্থীদের প্রাণহানি এবং দেশের অবকাঠামোয় আঘাত আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির লঙ্ঘন। ইরান তখন আলোচনা ও কূটনৈতিক পথে হাঁটছিল, অথচ ঠিক সেই সময়েই হামলা চালানো হয়েছে বলেও জোর দেন প্রেসিডেন্ট।
তিনি বলেন, ‘ক্ষমতা ও চাপ প্রয়োগের কৌশল কাজে লাগিয়ে অন্য দেশের ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান মেনে নেয় না। আমরা এমন একটি বিশ্ব চাই, যার ভিত্তি পারস্পরিক সম্মান, জাতিগুলোর অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা, গঠনমূলক সহযোগিতা ও বহুপাক্ষিকতা।’ এসব নীতিতে ইরান ও রাশিয়ার অবস্থান কাছাকাছি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি কোনো উসকানি ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে দেশটিতে হামলা শুরু করে। লক্ষ্যবস্তু ছিলেন শীর্ষ কর্মকর্তারা, আঘাত আসে সড়ক, সেতু ও রেললাইনের মতো বেসামরিক অবকাঠামোতেও। জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরায়েলি স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায়। তেহরানের দাবি, এতে আক্রমণকারী জোটের ভারী ক্ষতি হয়েছে।
৪০ দিন পর যুদ্ধবিরতিতে থামে সংঘাত। জুনের মাঝামাঝি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ সই করলে সেই যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিক রূপ পায়।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের কথাও বলেন পেজেশকিয়ান। ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বন্ধনের উল্লেখ করে তিনি ‘প্রতিবেশী কূটনীতি’ জোরদার করা এবং মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে গঠনমূলক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর তাগিদ দেন। তাঁর ভাষ্য, ‘আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ইরানের মৌলিক কোনো বিরোধ নেই। বিদ্যমান সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ আলোচনা, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আঞ্চলিক কাঠামোর মাধ্যমে সমাধানে তেহরান প্রস্তুত।’
তেহরান ও মস্কোর মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন দ্রুত করার আহ্বানও জানান তিনি। জ্বালানি, পরিবহন, বাণিজ্য ও বিদ্যুৎ উৎপাদন দুই দেশের সহযোগিতার অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। পেজেশকিয়ানের মতে, নিজেদের সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কাঠামো কাজে লাগিয়ে ইরান ও রাশিয়া শান্তি, টেকসই নিরাপত্তা ও বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়তে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সাম্প্রতিক যুদ্ধে সমর্থনের জন্য রুশ প্রেসিডেন্ট, সরকার ও জনগণকে ধন্যবাদও জানান ইরানের প্রেসিডেন্ট। তেহরান-মস্কোর অভিন্ন স্বার্থে পারস্পরিক সমর্থন এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা আরও দৃঢ় করার ওপর জোর দেন তিনি। শান্তি ও নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা এবং জনগণে জনগণে যোগাযোগ বাড়াতে আঞ্চলিক দেশগুলোর যেকোনো যৌথ উদ্যোগ ও কাঠামোকে স্বাগত জানাবে তেহরান।
পেজেশকিয়ানের বক্তব্য, টেকসই নিরাপত্তার ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক আস্থা, আঞ্চলিক দেশগুলোর অংশগ্রহণ এবং সব পক্ষের বৈধ স্বার্থের প্রতি সম্মান।
লাভরভ তেহরানের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদারে মস্কোর দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তাঁর মতে, তেল ও গ্যাস, যোগাযোগ ও গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান, পরিবহন, জ্বালানি, বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা এবং বিশ্ববিদ্যালয় খাতে দুই দেশ পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ইরান ও রাশিয়ার অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলে তিনি নিয়মিত কূটনৈতিক আলোচনা এবং বিদ্যমান সক্ষমতা কাজে লাগানোর গুরুত্বও তুলে ধরেন।
সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদের সচিবের সঙ্গে বৈঠক
সোমবার সন্ধ্যায় ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) সচিব মোহসেন রেজাই-ও লাভরভের সঙ্গে বৈঠক করেন। মস্কোর সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা জোরদারে তেহরানের সংকল্পের কথা তিনি জানান।
রেজাইয়ের ভাষ্য, দুই দেশের সহযোগিতার ‘কৌশলগত প্রভাব’ রয়েছে। এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ায় এবং এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেয়। দুই দেশের মধ্যে বহুমুখী সহযোগিতা বাড়াতে রাশিয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানান তিনি। কৌশলগত করিডর সম্পূর্ণ করার মতো যৌথ অর্থনৈতিক প্রকল্প পুরো অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনবে বলেও মন্তব্য করেন।
যুদ্ধ-পরবর্তী নতুন বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে এসএনএসসি সচিব বলেন, অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে এ অঞ্চলের দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর।
লাভরভ আন্তর্জাতিক ফোরামে ইরানের প্রতি রাশিয়ার সমর্থনের কথা আবারও জানান। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বোর্ড অব গভর্নরসে এই সমর্থন অব্যাহত থাকবে। আইএইএর তত্ত্বাবধানে থাকা পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলাসহ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘অবৈধ সামরিক হামলার’ কড়া নিন্দাও জানান তিনি। ইরান-রাশিয়া সহযোগিতার ভবিষ্যৎ সর্বব্যাপী বলে মত দেন রুশ এই শীর্ষ কূটনীতিক।
এর আগে দিনের শুরুতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে আলোচনায় বসেন লাভরভ। দুজন যৌথ সংবাদ সম্মেলনেও অংশ নেন। সেখানে আরাকচি তেহরান ও মস্কোর ‘ঘনিষ্ঠ’ সহযোগিতা ও পরামর্শের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, আঞ্চলিক সমস্যা সামরিক পথে সমাধান সম্ভব নয় বলে দুই পক্ষই মনে করে। সমাধান খুঁজতে হবে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পথে।
সূত্র: প্রেস টিভি
দক্ষিণ লেবাননে ৫৪০টির বেশি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিলো ইসরায়েল
ইরান যুদ্ধের ‘অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি’ স্বীকার করলেন মার্কিন বিশেষ দূত
হরমুজ প্রণালির দুই তেলবাহী জাহাজে আগুন
ওআইসিতে গৃহীত কাশ্মীর প্রস্তাবের নিন্দা ভারতের
তেহরান সফরে যাচ্ছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান