ড্রোন ভূপাতিত করার ক্ষমতা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও দিতে চায় ইউরোপ

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম

ড্রোন হামলা ও গোপন নাশকতামূলক তৎপরতার ঝুঁকি বাড়তে থাকায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, রেলসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ড্রোন শনাক্ত, ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে অকার্যকর এবং প্রয়োজনে ভূপাতিত করার ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে ইউরোপের কয়েকটি দেশ। এত দিন এ ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা মূলত সামরিক বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার নিয়ন্ত্রণে ছিল।

রয়টার্সের ২১ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও পোল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় বেসরকারি ও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো পরিচালনাকারীদের ভূমিকা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে ড্রোন প্রতিরোধের প্রযুক্তি যত দ্রুত উন্নত হচ্ছে, সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের আইনগত কাঠামো তত দ্রুত তৈরি হচ্ছে না।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউরোপে ড্রোনের মাধ্যমে হামলা এবং তথাকথিত ‘হাইব্রিড আক্রমণ’ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এ ধরনের আক্রমণে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।

ইউরোপীয় জ্বালানি সংস্থা ইউরিইলেকট্রিকের মহাসচিব ক্রিস্টিয়ান রুবি রয়টার্সকে বলেছেন, হাইব্রিড আক্রমণের কারণে শীতকালে কোনো কোনো এলাকায় তাপ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এখন আর নিছক তাত্ত্বিক বিষয় নয়।

বিদ্যুৎকেন্দ্র, সাবস্টেশন, রেললাইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ড্রোন হামলা হলে লাখ লাখ মানুষের সেবা ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে বড় ট্রান্সফরমারের মতো যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। ফলে তুলনামূলক কম খরচে তৈরি ড্রোনও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

ড্রোন প্রতিরোধে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে ফ্রান্স এগিয়ে রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির পার্লামেন্ট আগস্টে এমন একটি আইন পাস করেছে, যার আওতায় অনুমোদিত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পরিচালনাকারী ও তাদের ঠিকাদাররা নির্ধারিত স্থাপনার আশপাশে ড্রোন শনাক্ত, জ্যামিং প্রযুক্তির মাধ্যমে অকার্যকর এবং ভূপাতিত করতে পারবেন।

ফ্রান্সের পরিকল্পনায় রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠান ইডিএফ এবং রেল পরিচালনাকারী এসএনসিএফের মতো সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও রয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে আরও বেশি স্পর্শকাতর স্থাপনায় ড্রোন প্রতিরোধব্যবস্থা স্থাপনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

জার্মানিতে ড্রোনবিরোধী কার্যক্রম এখনো মূলত পুলিশের দায়িত্ব। তবে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও তৃতীয় পক্ষকে কীভাবে আইনগতভাবে এই কাজে যুক্ত করা যায়, তা পর্যালোচনা করছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

অস্ট্রিয়াও বড় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পরিচালনাকারীদের অনুরূপ ক্ষমতা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্লাউডিয়া ট্যানার বলেছেন, প্রতিটি স্থাপনা এককভাবে রাষ্ট্রের পক্ষে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়।

পোল্যান্ড এ ক্ষেত্রে আরও এক ধাপ এগিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর আশপাশে ড্রোন চলাচল সীমিত করার এলাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ইউনিটকে অনুপ্রবেশকারী ড্রোন ধ্বংস, অকার্যকর কিংবা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

অবকাঠামো পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সামরিক ও পুলিশের সঙ্গে প্রশিক্ষণও নিচ্ছে। তবে ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সদস্যদেশগুলোর জ্বালানি খাতের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন, ড্রোন নামাতে গিয়ে অন্য কোনো স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা মানুষের প্রাণহানি ঘটলে দায় কার হবে, সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

আধুনিক ড্রোন প্রতিরোধব্যবস্থায় সেন্সর, নিয়ন্ত্রণ সফটওয়্যার এবং ড্রোন অকার্যকর করার প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করে। এসব ব্যবস্থা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করে প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য তৈরি করা হচ্ছে।

কিন্তু কোনো ড্রোনকে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করার পর সেটি ভূপাতিত করার অনুমতি কে দেবেন এই প্রশ্নের সমাধান এখনো সব দেশে স্পষ্ট নয়। প্রতিটি স্থাপনায় সামরিক প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞ রাখা ব্যয়বহুল ও বাস্তবায়ন-দুরূহ হওয়ায় স্বয়ংক্রিয় প্রতিরোধব্যবস্থার দিকেও নজর দিচ্ছে কিছু দেশ।

জার্মান প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান রাইনমেটাল জানিয়েছে, বেসামরিক অবকাঠামো পরিচালনাকারীদের জন্য বড় বাধা হলো ড্রোন শনাক্ত করা এবং পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমোদন পাওয়ার মধ্যবর্তী বিলম্ব। আইনি দায়িত্ব বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বিভক্ত থাকায় সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হতে পারে।

অবকাঠামো পরিচালনাকারীদের সবাই সরাসরি ড্রোন প্রতিরোধের দায়িত্ব নিতে চান না। ফিনল্যান্ডের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ফিঙ্গ্রিডের প্রধান নির্বাহী আস্তা সিহভোনেন-পুঙ্কা মনে করেন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশের নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলার দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ও সামরিক বাহিনীর হাতেই থাকা উচিত।

ফিনল্যান্ডের জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ফোর্টামের নিরাপত্তাপ্রধান জারি স্টেনিয়াসও বলেছেন, জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহে মনোযোগ দেওয়াই কোম্পানিগুলোর প্রধান কাজ হওয়া উচিত; নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলা করুক পুলিশ ও সামরিক কর্তৃপক্ষ।

গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করলে ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো সহজ হতে পারে। তবে ভুল শনাক্তকরণ, জনবসতির ওপর ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে হতাহতের ঘটনা, সম্পদের ক্ষতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকিও রয়েছে।

তাই শুধু ড্রোন ভূপাতিত করার প্রযুক্তি সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়। কোন পরিস্থিতিতে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, কে অনুমোদন দেবেন, কীভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে এবং অনিচ্ছাকৃত ক্ষতির দায় কে বহন করবেন এসব বিষয়ে পরিষ্কার আইন ও কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।

ইউরোপের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে দ্রুত ও কার্যকরভাবে সুরক্ষিত করা, কিন্তু একই সঙ্গে ড্রোন প্রতিরোধের ক্ষমতা ব্যবহারে আইনগত নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা বজায় রাখা।

সূত্র: রয়টার্স।

এএম
আরও পড়ুন