যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার শর্ত তুলে ধরার পাশাপাশি বৃহত্তর সামরিক সংঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, আলোচনার পরিবেশ তৈরির আগে হুমকি ও নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে প্রত্যাহার করতে হবে। অন্যদিকে, ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, নতুন করে হামলা হলে আক্রান্ত দেশকে ছাড় না দিয়ে পাল্টা আক্রমণ চালানো হবে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) তেহরান থেকে আসা এসব বক্তব্যের মধ্যেই কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও বলেছেন, ইরান সংকট সমাধানে কূটনীতির সুযোগ এখনো রয়েছে। ফলে তেহরান কি আলোচনার মাধ্যমে সাময়িক যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি করছে, না-কি সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেছেন, কোনো দেশ ইরানে হামলা চালালে তার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনা করবে তেহরান। তার বক্তব্যে অসম যুদ্ধকৌশলের দিকে অগ্রসর হওয়ার কথাও উঠে এসেছে। এ ছাড়া ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভিকে দেওয়া বক্তব্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ইরান সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। নতুন করে হামলা বা গুপ্তহত্যার ঘটনা ঘটলে কোনো সংযম ছাড়াই জবাব দেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
এগুলো ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও হুঁশিয়ারি। এগুলো থেকে নতুন কোনো সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, সামাজিক সংহতি বজায় রাখা, অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলা এবং কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়গুলো আলোচনায় আসে।
বৈঠকটি এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন ইরান একদিকে সামরিক প্রস্তুতির কথা বলছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার সম্ভাবনাও পুরোপুরি বন্ধ করছে না। ইরানের রক্ষণশীল দৈনিক জোমহুরি-ই ইসলামি ‘সংশ্লিষ্ট সূত্রের’ বরাতে জানিয়েছে, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলতি সপ্তাহে সামরিক সংঘাত বন্ধের কাঠামো নিয়ে আলোচনা হতে পারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য কাঠামোর লক্ষ্য হবে সামরিক সংঘর্ষ থামানো, অমীমাংসিত বিরোধগুলো নিয়ে কাজ করা এবং উভয় পক্ষের ছাড় দেওয়ার বিষয়গুলো এমনভাবে সাজানো, যাতে আবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি কমে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের তেহরান সফরের পর এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একই সময়ে রাশিয়া ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে খবর প্রকাশিত হলেও কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার গালিবাফের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে এমন একটি সংবাদপত্র সোবহে নো জানিয়েছে, পাকিস্তানের কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের তেহরান সফরের প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা সামনে এসেছে। পত্রিকাটি হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান, রাশিয়া ও চীনের যৌথ উদ্যোগের একটি রুশ প্রস্তাবের কথাও জানিয়েছে। তবে তেহরান প্রণালিটির ওপর নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখার অবস্থানে অনড় রয়েছে।
ইরানের সরকারি সংবাদপত্র ইরান যুক্তি দিয়েছে, দেশের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রয়োগের বিকল্প নেই। এখানেই সম্ভাব্য সমঝোতার একটি বড় চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে। ইরান চায়, সংঘাতের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার বিষয়টিও আলোচনায় আসুক। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি।
সংঘাতের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক নীতি নিয়েও দেশটির রাজনৈতিক মহলে বিতর্কের খবর পাওয়া যাচ্ছে। কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা হাসান নাতাজ সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকারী ধর্মীয় নির্দেশ বা ফতোয়া পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। দিদবান ইরান ওয়েবসাইটকে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে এ নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করা উচিত। তার এই বক্তব্য ইরানের পারমাণবিক নীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের একটি দিক তুলে ধরে। তবে একজন আইনপ্রণেতার আহ্বানকে ইরানের রাষ্ট্রীয় নীতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাবে না।
ক্রেমলিনের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে আলোচনায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, ইরান সংকট নিয়ে কূটনীতির সুযোগ এখনো রয়েছে এবং তেহরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা প্রয়োজন। রাশিয়ার এই অবস্থান দেখায়, সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক পথ খোলা রাখার চেষ্টা চলছে। তবে সমঝোতার শর্ত, আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের অবস্থান এবং সম্ভাব্য চুক্তির পরিধি নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ইরানের সাম্প্রতিক বক্তব্যে দুটি প্রবণতা পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে- আলোচনার জন্য কঠোর শর্ত আরোপ এবং নতুন হামলার বিরুদ্ধে বৃহত্তর সামরিক জবাবের হুমকি। তেহরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও হরমুজ প্রণালির ওপর কর্তৃত্বের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক উদ্বেগ এবং দুই পক্ষের পারস্পরিক অবিশ্বাস সমঝোতার পথে বাধা হয়ে রয়েছে।
এ মুহূর্তে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও তা থেকে দ্রুত যুদ্ধবিরতি হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত তথ্য নেই। একইভাবে, ইরানের কঠোর বক্তব্যই নতুন যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রমাণ নয়। মূল প্রশ্ন হলো- দুই পক্ষ কি সামরিক চাপকে আলোচনায় ছাড় আদায়ের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করবে, না-কি পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বিরোধ আরও বড় সংঘাতের দিকে নিয়ে যাবে? এর উত্তর নির্ভর করছে পরবর্তী কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং উভয় পক্ষের বাস্তব পদক্ষেপের ওপর।
ইরানে নতুন হামলার তারিখ ঘোষণা করলো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল
সোমালিয়ায় বন্যায় ৮ লাখ ৭৪ হাজার মানুষের বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে গালিবাফের যা আলোচনা হলো
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলা ও বিস্ফোরণ
মাত্র ৫৬ ডলারের ক্ষতির অপরাধে ইরানে বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড
বাংলা হেদায়েতে যাত্রীবাহী বাস উল্টে নিহত ১০, আহত ৪৪