পুলিশ নেই এমন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কি পৃথিবীতে আছে?

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৪ এএম

পুলিশ ছাড়া একটি দেশ—কল্পনায় বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। অপরাধ দমন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের ভূমিকা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কিছু দেশ ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্র রয়েছে, যেখানে প্রচলিত অর্থে বড় কোনো জাতীয় পুলিশ বাহিনী নেই, অথবা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করা হয় প্রচলিত পুলিশব্যবস্থার চেয়ে ভিন্ন কাঠামোয়।

তবে এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার: কোনো দেশে সেনাবাহিনী নেই, আর কোনো দেশে পুলিশ নেই—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। আবার ছোট কোনো দেশে আলাদা জাতীয় পুলিশ বাহিনী না থাকলেও সেখানে আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা, জেন্ডারমেরি, স্থানীয় নিরাপত্তাকর্মী কিংবা অন্য দেশের সহায়তাপ্রাপ্ত ব্যবস্থা থাকতে পারে।

তাহলে সত্যিই কি এমন কোনো দেশ আছে, যেখানে একেবারেই পুলিশ নেই? উত্তর খুঁজতে দেখতে হবে কয়েকটি দেশের আইন, প্রশাসনিক কাঠামো ও নিরাপত্তাব্যবস্থা।

১. ভ্যাটিকান সিটি: ছোট রাষ্ট্র, কিন্তু পুলিশ আছে

ইতালির রোম শহরের ভেতরে অবস্থিত ভ্যাটিকান সিটি আয়তন ও জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট রাষ্ট্র। দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে অনেকের কৌতূহল রয়েছে। কিন্তু ভ্যাটিকান সিটিতে পুলিশ নেই—এমন ধারণা সঠিক নয়।

ভ্যাটিকান সরকারের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটির জেন্ডারমেরি কর্পস (Gendarmerie Corps) পুলিশি দায়িত্ব পালন করে। অপরাধ প্রতিরোধ, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং মানুষ ও স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের কাজ। পাশাপাশি পোপের নিরাপত্তায় কাজ করে পন্টিফিক্যাল সুইস গার্ড। অর্থাৎ, ভ্যাটিকান সিটিতে প্রচলিত পুলিশ বাহিনীর ধরন কিছুটা আলাদা হলেও নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা রয়েছে।

২. কোস্টারিকা: সেনাবাহিনী নেই, পুলিশ আছে

মধ্য আমেরিকার দেশ কোস্টারিকা প্রায়ই আলোচনায় আসে সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করার কারণে। ১৯৪৮ সালের গৃহযুদ্ধের পর দেশটি সেনাবাহিনীর পরিবর্তে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়ার পথ বেছে নেয়। ১৯৪৯ সালের সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে স্থায়ী সেনাবাহিনী বিলুপ্তির বিধান রাখা হয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে দেশটিতে পুলিশ নেই। কোস্টারিকায় পুলিশ বাহিনী রয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তারা দায়িত্ব পালন করে। দেশটির উদাহরণ দেখায়, সেনাবাহিনী ছাড়াও একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব পুলিশব্যবস্থা থাকতে পারে।

৩. আইসল্যান্ড: সেনাবাহিনী ছাড়াই নিরাপত্তাব্যবস্থা

উত্তর আটলান্টিকের দ্বীপরাষ্ট্র আইসল্যান্ড-এর কোনো স্থায়ী নিয়মিত সেনাবাহিনী নেই। কিন্তু দেশটির জাতীয় পুলিশ রয়েছে। অপরাধ তদন্ত, জননিরাপত্তা এবং আইন প্রয়োগের কাজ করে পুলিশ। সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও উদ্ধারকাজেও বিভিন্ন সংস্থা ভূমিকা রাখে।

দেশটি ন্যাটোর সদস্য এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপরও নির্ভরশীল। ফলে আইসল্যান্ডকে পুলিশবিহীন দেশ বলা ভুল; বরং এটি সেনাবাহিনী ছাড়াই নিরাপত্তা পরিচালনার একটি উদাহরণ।


৪. লিশটেনস্টাইন: ছোট দেশ, নিজস্ব পুলিশ বাহিনী

ইউরোপের ছোট রাষ্ট্র লিশটেনস্টাইন ১৮৬৮ সালে সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে। কিন্তু দেশটির নিজস্ব জাতীয় পুলিশ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের তথ্য অনুযায়ী, লিশটেনস্টাইন ন্যাশনাল পুলিশ দেশটির একমাত্র পুলিশ বাহিনী। নিরাপত্তা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধ তদন্তসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে এ বাহিনী। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যমে সীমান্ত পেরিয়ে সংঘটিত অপরাধ মোকাবিলায়ও তারা সহযোগিতা করে। 

৫. নাউরু: সেনাবাহিনী নেই, পুলিশই অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে

প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট দ্বীপরাষ্ট্র নাউরু-এরও নিয়মিত সেনাবাহিনী নেই। তবে দেশটিতে নাউরু পুলিশ ফোর্স রয়েছে।

নাউরু সরকারের সরকারি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এই বাহিনী জনশান্তি রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ ও তদন্ত, অপরাধীকে আইনসম্মতভাবে আটক এবং জনসমাবেশে শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব পালন করে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পুলিশি সহযোগিতাও রয়েছে। তাই নাউরুও পুলিশবিহীন দেশ নয়। 

তাহলে কি পৃথিবীতে একেবারেই পুলিশবিহীন কোনো দেশ আছে?

উন্মুক্ত সরকারি ও আন্তর্জাতিক সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বর্তমানে কোনো স্বীকৃত স্বাধীন রাষ্ট্রে একেবারেই আইন প্রয়োগকারী বা পুলিশি ব্যবস্থা নেই—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।

কোনো কোনো দেশে আলাদা জাতীয় পুলিশ বাহিনী না থাকলেও অন্য রাষ্ট্রের সহায়তা, যৌথ নিরাপত্তাব্যবস্থা বা বিকল্প আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থাকতে পারে। আবার কিছু ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে পুলিশের সংখ্যা কম হওয়ায় বাইরে থেকে তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা চোখে পড়ে না।

তাই “পুলিশ নেই” কথাটি ব্যবহারের আগে দেখতে হবে—সেখানে আদৌ কোনো পুলিশি সংস্থা নেই, নাকি শুধু সেনাবাহিনী নেই কিংবা নিরাপত্তার দায়িত্ব অন্য কোনো সংস্থা পালন করছে।

কোনো দেশের পুলিশ বাহিনীর আকার দেখেই সেই দেশের অপরাধের মাত্রা বা নিরাপত্তা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। অপরাধের ধরন, জনসংখ্যা, সামাজিক বৈষম্য, আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা, বিচারব্যবস্থা, জনসাধারণের আস্থা এবং অপরাধের পরিসংখ্যান—সবকিছু বিবেচনা করতে হয়।

একইভাবে, পুলিশ বা সেনাবাহিনীর সংখ্যা কম হওয়া মানেই যে কোনো রাষ্ট্র বেশি শান্তিপূর্ণ, তা-ও নয়। একটি কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত জনবল, জবাবদিহি, নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর বিচারব্যবস্থা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা।

“কোন দেশে পুলিশ নেই?”—প্রশ্নটির আকর্ষণ থাকলেও এর সরল উত্তর হলো, পুলিশবিহীন দেশের চেয়ে সেনাবাহিনীহীন দেশই বাস্তবে বেশি পরিচিত। ভ্যাটিকান সিটি, কোস্টারিকা, আইসল্যান্ড, লিশটেনস্টাইন ও নাউরুর উদাহরণে দেখা যায়, দেশগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা ভিন্ন হলেও পুলিশি দায়িত্ব পালনের কোনো না কোনো ব্যবস্থা রয়েছে।

অতএব, কোনো দেশকে পুলিশবিহীন বলার আগে তার সরকারি নিরাপত্তা কাঠামো যাচাই করা জরুরি। প্রচলিত ধারণা নয়, নির্ভরযোগ্য তথ্যই এ ধরনের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারে।

এমইউ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত