ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অবশিষ্ট স্থাপনাগুলোতে মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে হামলা চালানোর সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বলার কয়েক ঘণ্টা পর রোববার (১ নভেম্ভর) এ মন্তব্য করেন তিনি। ট্রাম্পের দাবি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক বা দুটি স্থাপনা এখনো হামলার লক্ষ্য হিসেবে রয়ে গেছে। এর মধ্যে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনও রয়েছে। এসব স্থাপনায় হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়েও কথা বলেছেন ট্রাম্প। তার ভাষ্য, তেহরান একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী। তবে ইরানের ওপর আস্থার ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, ইরান চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা বললেও শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে সরে আসে। এবার তারা সত্যিই কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করে কি না, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি। আলোচনার অগ্রগতি আপাতত সন্তোষজনক বলেও উল্লেখ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এর আগে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা শুরুর প্রস্তুতির মধ্যেই দুই নেতার এই যোগাযোগ হয়। এর কয়েক ঘণ্টা আগে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইরানে সম্ভাব্য অভিযান পুনরায় শুরুর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন ট্রাম্প। ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অঞ্চলটিতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম বাড়িয়েছে পেন্টাগন। একই সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে থাকা কয়েকটি ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর সময় নিয়ে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও রয়েছে ওয়াশিংটনে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের আগে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং দেশটিতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচনের আগে সামরিক অভিযান শুরু না করার প্রবণতা রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের। তবে ইরান আকস্মিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে বলে মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ধারণা।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সেন্টকম ও ইসরায়েলি বাহিনী হামলার প্রস্তুতি নিলেও মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে হোয়াইট হাউস ইরানে অভিযান শুরুর নির্দেশ দেবে না। একই সময়ে ইরানকে আলোচনায় ফেরার আরেকটি সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছে মার্কিন প্রশাসন। তবে অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ইরান নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি পরিত্যাগ করতে রাজি হবে না বলে মনে করছেন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বন্ধের বিষয়েও তেহরান সম্মত হবে না বলে তাদের ধারণা।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর ১০টি পরিবহন বিমান দক্ষিণ ইসরায়েলের বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম কেএএন। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের বৃহত্তর বিমান বহরের অংশ হিসেবে এসব বিমান সেখানে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফোর্ট ব্লিস ঘাঁটি থেকে আসা বিমানগুলোতে আঞ্চলিক সামরিক স্থাপনা সুরক্ষার জন্য আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ওই বহরের অন্য বিমানগুলো জর্ডান, কাতার ও সৌদি আরবেও অবতরণ করেছে। এর আগে সম্ভাব্য উত্তেজনা মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠানোর খবরও প্রকাশিত হয়েছিল।
এদিকে, ইরানও নতুন করে সামরিক সংঘাতের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সম্প্রতি সামরিক কমান্ডারদের যেকোনো নতুন হামলার জবাবে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে তেহরান জানিয়েছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল আলী আবদুল্লাহিও জানিয়েছেন, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তার হুঁশিয়ারি, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে ব্যাপক পরিসরে জবাব দেওয়া হবে এবং নতুন যুদ্ধের সমাপ্তি কখন ঘটবে, তা ইরানই নির্ধারণ করবে।
তবে সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপ নিতে চাইলে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস আগেই তা নিতে পারতেন। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, সফল সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সব সক্ষমতা রয়েছে।
সব মিলিয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা ও সামরিক প্রস্তুতি, দুই পথেই এগোচ্ছে ওয়াশিংটন। নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের ফোনালাপ দুই দেশের সামরিক সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে এনেছে। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা শুরু করবে, নাকি আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সূত্র: দ্য জেরুজালেম পোস্ট
সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশনা ‘যুদ্ধের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা: আইআরজিসি
আফগানিস্তানের ভূখণ্ড থেকে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা আমলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলার শঙ্কা, কাতারে ইরানি প্রতিনিধিদের বৈঠক
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু ইস্যুতে আলোচনায় বসার কোনো ইচ্ছা নেই ইরানের: নিকজাদ