কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের জয় হলে নির্বাহী ক্ষমতায় দেশ চালাবে ট্রাম্প

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:১২ পিএম

মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে গেলে আইনসভাকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে হোয়াইট হাউস। অভিবাসন, শুল্ক, আবাসন ও সরকারি ব্যয় নিয়ে নির্বাহী আদেশের সম্ভাব্য খসড়া তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রশাসনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য কংগ্রেসীয় তদন্ত মোকাবিলার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন ট্রাম্পের সহযোগীরা।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস কয়েক মাস ধরে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রশাসনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য তদন্ত মোকাবিলার প্রস্তুতিও চলছে।

হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা এবং পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত আরও দুই ব্যক্তির বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।

সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল থেকে হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার, বাজেট পরিচালক রাসেল ভট এবং হোয়াইট হাউস কাউন্সেলস অফিসের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কাজ করছেন। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই অভিবাসন, শুল্ক, আবাসন ব্যয় ও কেন্দ্রীয় সরকারের খরচের ক্ষেত্রে কী কী নির্বাহী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব, তা চিহ্নিত করছেন তাঁরা।

হোয়াইট হাউসের আইনবিষয়ক উপদেষ্টা উইল শার্ফ ও তাঁর দল প্রেসিডেন্ট এককভাবে আইনগতভাবে কী করতে পারেন, কোথায় তাঁর ক্ষমতার সীমা অতিক্রমের ঝুঁকি রয়েছে এবং আদালতে এসব সিদ্ধান্ত কীভাবে defend করা যায়, তা পর্যালোচনা করছেন বলে জানিয়েছেন হোয়াইট হাউসের ওই কর্মকর্তা।

পরিকল্পনাটি আসন্ন মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে, আইন প্রণয়ন আটকে দিতে এবং সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকারে বাধা সৃষ্টি করতে পারবেন। তবে বাণিজ্য, পররাষ্ট্রনীতি ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের ওপর ট্রাম্পের বিস্তৃত নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকবে।

প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদে নেট চারটি আসন এবং সিনেটে প্রয়োজনীয় আসন অর্জন করতে হবে। বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ২১৮-২১৪ এবং সিনেটে ৫৩-৪৭। জনমত জরিপে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে সিনেটের লড়াই এখনো অনিশ্চিত।

গত এক মাসে ট্রাম্প দেশজুড়ে বিভিন্ন নির্বাচনী সমাবেশ করেছেন। এসব সমাবেশে তিনি কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তাঁর সহযোগীরা ব্যক্তিগতভাবে ২০২৭ সালে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য পরাজয়ের আশঙ্কা নাকচ করে হোয়াইট হাউস বলেছে, গণমাধ্যম একটি ভুল রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র লরেন বিস বলেন, “এই প্রশাসন এবং নীতিবোধসম্পন্ন রিপাবলিকানরা সীমান্ত সুরক্ষিত করা, আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পরিশ্রমী মার্কিন নাগরিকদের হাতে আরও অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া এবং জনগণের জন্য সাফল্য অর্জনের কাজ অব্যাহত রাখবে।”

নতুন শুল্ক ও ভিসানীতিতে পরিবর্তনের পরিকল্পনা

বিবেচনাধীন নির্বাহী পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন আমদানিতে নতুন শুল্ক আরোপ, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী বিদেশি কর্মীদের ভিসার নিয়ম কঠোর করা এবং আবাসন ও নির্মাণ ব্যয় কমানোর উদ্যোগ।

পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এমন কিছু প্রস্তাব জমা দিয়েছে, যেগুলো কংগ্রেসের নতুন অনুমোদন ছাড়াই বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে আইনি পর্যালোচনা চলছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বাজেটের পরিচালক রাসেল ভট ইতোমধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদিত বরাদ্দের মধ্য থেকে কোন কোন অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব, তা পরীক্ষা করছেন। এ ছাড়া সরকারি অনুদান দেওয়ার নিয়ম পরিবর্তন করে কোন কর্মসূচি সরকারি অর্থ পাবে, সে বিষয়ে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রভাব বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

সূত্রগুলোর দাবি, এতে কংগ্রেসের নতুন অনুমোদন ছাড়াই কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয়ের ওপর হোয়াইট হাউসের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে।

হোয়াইট হাউসের ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এসব প্রস্তুতি সম্পর্কে ট্রাম্পকে অবহিত করা হয়েছে এবং তিনি নিজেও আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণাধীন কংগ্রেসের অধীনে নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে দেশ পরিচালনায় ট্রাম্প কতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন—এমন প্রশ্নে পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত একজন বলেন, ‘খুবই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন।’

কংগ্রেস ছাড়াই দেশ পরিচালনার চেষ্টা

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার সীমা পরীক্ষা করে আসছেন ট্রাম্প। কংগ্রেসের অনুমোদন বা নতুন আইন ছাড়াই তিনি ব্যাপক শুল্ক আরোপ, অভিবাসনবিরোধী অভিযান জোরদার, কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মীসংখ্যা কমানো এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধসহ বিভিন্ন পররাষ্ট্রনীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছেন।

তবে এর একটি বড় ব্যতিক্রম ছিল ট্রাম্পের বিশাল কর ও সরকারি ব্যয় কমানোর প্যাকেজ। রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসে অনুমোদনের পর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এতে স্বাক্ষর করেন তিনি।

নির্বাচনবিষয়ক নির্দলীয় বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ইনসাইড ইলেকশনের সম্পাদক নাথান গঞ্জালেস বলেন, “গত দুই বছরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মূলত কংগ্রেসকে উপেক্ষা করে নির্বাহী আদেশ ও নির্বাহী ক্ষমতার মাধ্যমে যতটা সম্ভব কাজ করার চেষ্টা করেছেন। আমার ধারণা, ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও তিনি এ ধারা অব্যাহত রাখবেন।”

ট্রাম্প নতুন আইন ছাড়াই পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা বাড়াতে বারবার জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। কংগ্রেস ভোটের মাধ্যমে এসব জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিতে পারে। তবে ট্রাম্প তাতে ভেটো দিতে পারবেন। সেই ভেটো অকার্যকর করতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে।

তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনকে বেশ কিছু বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেলে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের বিভিন্ন পদে মনোনয়ন আটকে দিতে পারবেন। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টিও রয়েছে।

টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের নক্সভিল ক্যাম্পাসের জননীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনবিষয়ক ইতিহাসের লেখক অ্যান্ড্রু বুশ বলেন, “প্রেসিডেন্টের মনোনীত ব্যক্তিদের অনুমোদন দিতে ডেমোক্র্যাটরা অত্যন্ত অনিচ্ছুক থাকবেন বলে আমি মনে করি।”

এ ছাড়া ট্রাম্পের সমর্থিত আইন পাসে বাধা দিতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। তবে ট্রাম্পও তাঁদের পছন্দ নয়—এমন কোনো বিলে ভেটো দিতে পারবেন। আর সেই ভেটো অকার্যকর করার মতো পর্যাপ্ত ভোট প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

অন্যদিকে, প্রেসিডেন্টের আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে নেওয়া নির্বাহী পদক্ষেপ আদালত বাতিল করতে পারেন। পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত একজনের ভাষ্য অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ট্রাম্প কী কী করতে পারবেন এবং আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে কীভাবে সেসব সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হবে, তা নির্ধারণে বিচার বিভাগের আইনি মতামত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ডেমোক্র্যাটদের তদন্ত মোকাবিলায় প্রস্তুতি

তবে নির্বাহী আদেশ দিয়ে এড়ানো সম্ভব নয়—এমন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো কংগ্রেসের তদন্ত।

রয়টার্স এর আগে জানিয়েছিল, প্রতিনিধি পরিষদের জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট নেতা ও বিভিন্ন কমিটির কর্মকর্তারা শুনানি, সমন এবং নথিপত্র তলবের মাধ্যমে তদন্তের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁদের লক্ষ্য, ট্রাম্প তাঁর প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজে, তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী কিংবা অনুদানদাতাদের সুবিধা দিয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা।

রয়টার্সের তিনটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্পের সহযোগীরা কয়েক মাস ধরেই এ ধরনের তদন্তের সম্ভাবনা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

একটি সূত্র জানায়, হোয়াইট হাউসের আইনজীবীরা রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রধানদের কংগ্রেসের প্রশ্ন, নথি তলব এবং সমনের জবাব কীভাবে দিতে হবে, সে বিষয়ে ব্রিফ করেছেন। কর্মকর্তাদের লিখিত যোগাযোগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ব্যক্তিগত উপদেষ্টাদের সঙ্গে ট্রাম্পের যোগাযোগ ও কথোপকথনকে কংগ্রেসের তদন্তের বাইরে রাখতে প্রেসিডেন্টের ‘এক্সিকিউটিভ প্রিভিলেজ’ প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিচার বিভাগের মতামত চাওয়া হয়েছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স

এএইচএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত