ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট দিতে চান ৪৮ শতাংশ মার্কিনি

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৩১ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ব্যয়, পারিবারিক আর্থিক পরিস্থিতি এবং নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও উদ্বিগ্ন মার্কিন ভোটাররা। রয়টার্স/ইপসোসের সর্বশেষ জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

জরিপ অনুযায়ী, ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন বা ইতোমধ্যে ভোট দিয়েছেন—এমন ৪৮ শতাংশ মার্কিনি বলেছেন, তাঁদের ভোট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। বিপরীতে ২৫ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দিচ্ছেন। আর ২৫ শতাংশ ভোটারের সিদ্ধান্তে ট্রাম্প কোনো প্রভাব ফেলছেন না।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ১ হাজার ৭৬৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর এ জরিপ পরিচালিত হয়। নিবন্ধিত ভোটারদের ক্ষেত্রে জরিপটির ত্রুটিসীমা ৩ শতাংশ। এটি কোনো এক্সিট পোল নয়; অর্থাৎ ভোটকেন্দ্র থেকে বের হওয়ার সময় ভোটারদের সাক্ষাৎকার নিয়ে জরিপটি করা হয়নি।

ভোটারদের ভাবনায় প্রধান নয়টি বিষয়

১. জীবনযাত্রার ব্যয়

নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে জীবনযাত্রার ব্যয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে জানিয়েছেন ৪৮ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও প্রতিষ্ঠান রক্ষাকে প্রধান ইস্যু বলেছেন ২৬ শতাংশ এবং অভিবাসনকে গুরুত্ব দিয়েছেন ১৩ শতাংশ। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর দেশটিতে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়াও ভোটারদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

২. ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা

ট্রাম্প তাঁর সমর্থকদের বলেছেন, এবারের নির্বাচনে তাঁকে যেন সরাসরি প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করে ভোট দেওয়া হয়। কিন্তু জরিপে তাঁর বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার মনোভাবই বেশি দেখা গেছে। ৪৮ শতাংশ ভোটার তাঁদের ভোটকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দেখছেন। তাঁর পক্ষে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন ২৫ শতাংশ।

৩. ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ

ট্রাম্পের দাবি, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সে জন্য সামরিক অভিযান প্রয়োজন ছিল। কিন্তু জরিপে মাত্র ২৫ শতাংশ ভোটার মনে করেন, এই সামরিক পদক্ষেপের মূল্য দেওয়া সার্থক হয়েছে। বিপরীতে ৫৫ শতাংশের মতে, যুদ্ধের ব্যয় ও ক্ষতির তুলনায় এর সুফল যথেষ্ট নয়। ১৮ শতাংশ এ বিষয়ে নিশ্চিত নন।

৪. নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর সামগ্রিকভাবে আস্থা রয়েছে ভোটারদের। ৭৭ শতাংশ বলেছেন, তাঁদের দেওয়া ভোট যথাযথভাবে গণনা হবে বলে তাঁরা আত্মবিশ্বাসী। তবে ৪৫ শতাংশ মনে করেন, ভোট জালিয়াতি দেশটিতে ব্যাপক সমস্যা। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে বিপুলসংখ্যক অনাগরিকের অবৈধ ভোট দেওয়ার অভিযোগও নির্বাচনী বিতর্কের অংশ হয়েছে। তবে এ ধরনের ব্যাপক অনিয়মের দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৫. পারিবারিক আর্থিক পরিস্থিতি

ট্রাম্প ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে নিজেদের পারিবারিক আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়েছে বলে মনে করেন ৪৯ শতাংশ মার্কিনি। ১৩ শতাংশ বলেছেন, তাঁদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। আর ৩৭ শতাংশের মতে, পরিস্থিতি আগের মতোই রয়েছে।

বিশেষ করে হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আর্থিক চাপের বিষয়টি স্পষ্ট। এ জনগোষ্ঠীর ৫৪ শতাংশ বলেছেন, তাঁদের পারিবারিক আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। মাত্র ১০ শতাংশ উন্নতির কথা জানিয়েছেন।

৬. নারীদের খেলাধুলায় ট্রান্সজেন্ডারদের অংশগ্রহণ

নারীদের খেলাধুলায় ট্রান্সজেন্ডার নারী ও মেয়েদের অংশগ্রহণ সীমিত করা ৩৮ শতাংশ ভোটারের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। অন্যদিকে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষাকে একই মাত্রায় গুরুত্ব দিয়েছেন ২৫ শতাংশ ভোটার।

৭. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা সেন্টার

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই পরিচালনার জন্য নির্মিত ডেটা সেন্টারের সংখ্যা সীমিত করার বিষয়টিও ভোটারদের আলোচনায় রয়েছে। জরিপে ৪২ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার বলেছেন, ডেটা সেন্টার নির্মাণ সীমিত করা তাঁদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

৮. নির্বাচনে ধনকুবেরদের অর্থের প্রভাব

মার্কিন নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের জন্য বিলিয়নিয়ারদের বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান রয়েছে দুই দলের ভোটারদের বড় অংশের। জরিপে ৯৩ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এবং ৭১ শতাংশ রিপাবলিকান ভোটার মনে করেন, নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে ধনকুবেরদের কোটি কোটি ডলার অনুদান দেওয়া অনুচিত।

৯. রাজনৈতিক দলগুলোর পরিকল্পনা ও প্রস্তাব

কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি ভোটারদের সামান্য বেশি সমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও কোন দলের কাছে ভালো রাজনৈতিক পরিকল্পনা রয়েছে, তা নিয়ে ভোটাররা বিভক্ত। জরিপে ৪৩ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার বলেছেন, ডেমোক্র্যাটদের অন্তত কিছু ভালো ধারণা রয়েছে। রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রে এ মত দিয়েছেন ৩৯ শতাংশ।

ট্রাম্পের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে জরিপ?

জরিপের ফলাফল বলছে, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের লড়াই নয়; এটি ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম দুই বছরের নীতি ও কর্মকাণ্ডের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন। জীবনযাত্রার ব্যয়, পারিবারিক আর্থিক চাপ এবং ইরান যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে ভোটারদের একটি বড় অংশ যখন নিজেদের ভোটকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দেখছেন, তখন প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের আসন ধরে রাখতে রিপাবলিকানদের কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়তে হতে পারে।

তবে জরিপের ফলাফলই নির্বাচনের চূড়ান্ত রায় নয়। ভোটার উপস্থিতি, অঙ্গরাজ্যভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং স্থানীয় প্রার্থীদের জনপ্রিয়তার ওপরও ফল নির্ভর করবে। শেষ পর্যন্ত ভোটের বাক্সে মার্কিন জনগণ ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি কতটা সমর্থন বা অসন্তোষ প্রকাশ করেন, সেটিই নির্ধারণ করবে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছরের রাজনৈতিক বাস্তবতা।

সূত্র: রয়টার্স/ইপসোস জরিপ

এমইউ
আরও পড়ুন