যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতির অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী স্টিফেন মিলারকে হোয়াইট হাউসের নতুন চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। চলতি সপ্তাহের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর শুক্রবার (৬ নভেম্বর) এ সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প। অভিবাসনসহ অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয়ে ট্রাম্পের কঠোর নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ৪১ বছর বয়সী মিলারের।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত সহযোগী
ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা মনিকায় রাজনৈতিকভাবে উদারপন্থি পরিবেশে বেড়ে ওঠেন স্টিফেন মিলার। তবে ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্র পত্রিকায় কলাম লেখার মধ্য দিয়ে তিনি রক্ষণশীল ও আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য পরিচিতি পান।
২০১০-এর দশকে কংগ্রেসের একজন সহযোগী হিসেবে কাজ করার সময় থেকেই তিনি অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নেন। সে সময় রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেও এ ধরনের কঠোর অবস্থান খুব একটা প্রচলিত ছিল না।
২০১৬ সালে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারে যোগ দেন মিলার। পরে ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে উপদেষ্টা ও বক্তৃতা লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০২০ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প পরাজিত হওয়ার পর মিলার ‘আমেরিকা ফার্স্ট লিগ্যাল’ নামে একটি রক্ষণশীল অধিকারবিষয়ক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটি নাইকির মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শ্বেতাঙ্গদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ তুলে আবেদন করেছিল।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মিলার উপপ্রধান স্টাফ এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর স্ত্রী কেটি মিলার একজন রক্ষণশীল পডকাস্টার। তিনি ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনেও যোগাযোগবিষয়ক সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন।
অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতির প্রধান পরিকল্পনাকারী
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অভিবাসনবিরোধী অভিযান জোরদারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ব্যক্তিদের একজন স্টিফেন মিলার। প্রতিদিন ৩ হাজার অভিবাসীকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে তিনি ভূমিকা রাখেন, যা আগের প্রশাসনগুলোর সময়কার গ্রেপ্তারের তুলনায় অনেক বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে অবস্থান করছেন—এমন সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে তিনি। শুধু অপরাধের রেকর্ড থাকা ব্যক্তিদের লক্ষ্য না করে দেশটিতে অবৈধভাবে অবস্থানকারী যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের জন্য ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) সংস্থার ওপর চাপ দিয়েছেন তিনি।
দিনমজুরদের জড়ো হওয়ার স্থান হিসেবে পরিচিত হোম ডিপোর বিভিন্ন শাখায় আইসিইর অভিযানও জোরদার হয়। মিলার এসব দোকানকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানোর কথা বলার পর সেখানে গ্রেপ্তারের ঘটনা বাড়ে।
গত জানুয়ারিতে মিনিয়াপোলিসে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এক সদস্যের গুলিতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অ্যালেক্স প্রেটি নিহত হন। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেটিকে ‘অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী’ ও ‘হত্যাচেষ্টাকারী’ বলে আখ্যা দেন মিলার। তবে রয়টার্সের যাচাই করা ভিডিওতে দেখা যায়, প্রেটির হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নয়, একটি মুঠোফোন ছিল। পরে মিলার বলেন, অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা হয়তো নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করেননি।
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার বাতিলেরও পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন মিলার। এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায়কে তিনি আদালতের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ও আপত্তিকর সিদ্ধান্তগুলোর একটি’ বলে মন্তব্য করেন।
ওই রায়ের পর যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিদেশিদের দেশটিতে প্রবেশ ঠেকাতে ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা সন্তান জন্মদানের উদ্দেশ্যে পর্যটন নিষিদ্ধের ঘোষণা দেন তিনি।
বৈচিত্র্যনীতি ও ট্রান্সজেন্ডার অধিকার নিয়েও কঠোর অবস্থান
ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিতেও মিলারের প্রভাব রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তি (ডিইআই) উদ্যোগের বিরোধিতা এবং ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের অধিকার সীমিত করার পক্ষে তিনি সোচ্চার।
হোয়াইট হাউসের নির্বাহী আদেশ অনুমোদনের দায়িত্বে থাকা অল্প কয়েকজন কর্মকর্তার একজনও তিনি। গত বছর এ বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তি এ তথ্য জানিয়েছিলেন।
ইরান যুদ্ধ ও পররাষ্ট্রনীতিতে আগ্রাসী অবস্থান
ইরান যুদ্ধ নিয়েও ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে মিলারের অবস্থানের মিল রয়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে তিনি দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তেহরানের নেতৃত্ব এবং সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে। পরে যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান তুলে ধরে জুলাইয়ে ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, ইরানের কয়েকজন কর্মকর্তা শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে ‘মরিয়া’ হয়ে আছেন।
অন্যান্য আন্তর্জাতিক ইস্যুতেও কঠোর পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন মিলার। গত জানুয়ারিতে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করেননি তিনি। একই মাসে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর যুক্তরাষ্ট্র দেশটি পরিচালনা করছে বলেও মন্তব্য করেন।
মাদক পাচারের সন্দেহে থাকা ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হামলাকেও সমর্থন করেছেন মিলার। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তিনি বলেছিলেন, ‘এরা সন্ত্রাসী এবং তাদের হত্যা করা হবে।’
এ ছাড়া পুয়ের্তো রিকোয় ভোট গণনার যন্ত্র হ্যাক হওয়ার একটি ভিত্তিহীন তত্ত্ব প্রমাণের উদ্দেশ্যে তদন্তের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন মিলার। তবে ওই তদন্তে এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে জানা গেছে।
কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই পদক্ষেপের পরিকল্পনা
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কয়েক মাস ধরে হোয়াইট হাউসের বাজেট পরিচালক রাসেল ভটের সঙ্গে কাজ করেছেন মিলার। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেন নিজের নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা তৈরি করা।
ট্রাম্পের নতুন চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পেলে হোয়াইট হাউসের নীতিনির্ধারণে মিলারের প্রভাব আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অভিবাসন, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিতে তাঁর কঠোর অবস্থান আগামী দিনগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
ইরান থেকে ১ হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরে সরে গেছে মার্কিন বাহিনী: ফাদাভি
হুথি শাসনে বেড়ে উঠছে ইয়েমেনের একটি প্রজন্ম, শিশুদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে যুদ্ধে
মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ বদলেছে কি না, দেখতে চায় ইরান