যুক্তরাষ্ট্রে ৩৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হামের সংক্রমণ

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১১:০০ এএম

যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছর হামের সংক্রমণ গত ৩৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত ৫ হাজার ১৮২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। ১৯৯১ সালের পর দেশটিতে এক বছরে এত বেশি হামের রোগী শনাক্তের ঘটনা আর ঘটেনি।

হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও টিকার মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। সিডিসির তথ্য বলছে, আক্রান্তদের মধ্যে ১৮ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম। আর পাঁচ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশু-কিশোরের হার ৪১ শতাংশ। অর্থাৎ, নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হওয়া মোট রোগীর প্রায় ৫৯ শতাংশই শিশু ও কিশোর।

আক্রান্তদের মধ্যে ৪ হাজার ৯৯৩ জনই বিভিন্ন প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ২০২৫ সালে সারা বছরে শনাক্ত হওয়া ২ হাজার ২৮৯ জনের দ্বিগুণেরও বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের টিকাদানের হার কমে যাওয়াকে সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির কিন্ডারগার্টেন পর্যায়ের শিশুদের মধ্যে হাম, মাম্পস ও রুবেলা প্রতিরোধী টিকার আওতা ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে ছিল ৯৫ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯২ দশমিক ৪ শতাংশে।

মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক

সিডিসির হিসাবে, ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হামে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে অঙ্গরাজ্যগুলোর স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সংস্থাটির মৃত্যুর হিসাবের পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে চলতি প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পেনসিলভানিয়ায় এ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

পেনসিলভানিয়ার স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, চলতি বছরে অঙ্গরাজ্যটিতে হামে আক্রান্ত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৮৭ জন।

হামে মৃত্যুর হিসাব কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, তা নিয়ে পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জশ শাপিরো এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।

পেনসিলভানিয়ার নিয়ম অনুযায়ী, কারও শরীরে হাম নিশ্চিত হওয়ার পর উপসর্গ দেখা দেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তাঁর মৃত্যু হলে সেটিকে ‘হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যু’ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে মৃত্যুর কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো ঘটনা হলে তা এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।

গত আগস্টে পেনসিলভানিয়া জানায়, টিকা না নেওয়া দুজনের মৃত্যু হয়েছে হামে। সিডিসি প্রথমে এই দুটি মৃত্যুকে জাতীয় হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করলেও পরে তা বাদ দেয়। টিকাবিষয়ক সংশয় প্রকাশের জন্য পরিচিত স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেনেডি ওই মৃত্যুর পেছনে হাম সরাসরি দায়ী ছিল কি না, কিংবা রোগটি মৃত্যুর ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রেখেছিল কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সিডিসি জানিয়েছে, হামে মৃত্যুর হিসাব নির্ধারণে একটি অভিন্ন সংজ্ঞা তৈরির জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য ও আঞ্চলিক মহামারিবিদদের সংগঠন ‘ইউএস কাউন্সিল অব স্টেট অ্যান্ড টেরিটোরিয়াল এপিডেমিওলজিস্টস’-এর সঙ্গে কাজ করছে।

তবে সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃত্যুর শ্রেণিবিভাগ নিয়ে এই বিরোধ হামের প্রভাব পর্যবেক্ষণে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতির সঙ্গে সিডিসির অবস্থানের দূরত্ব তৈরি করছে। মহামারিবিদেরা আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও সিডিসি দীর্ঘদিন ধরেই হামে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর হিসাব রাখার পদ্ধতি অনুসরণ করে আসছে।

টিকাদানের ঘাটতিতে বাড়ছে বৈশ্বিক ঝুঁকি

দুই দশকেরও বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্র হাম নির্মূলের ঘোষণা দিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে আবারও রোগটির সংক্রমণ বাড়ছে। বিশ্বজুড়েও হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে যেসব জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকা নিয়ে সংশয় রয়েছে অথবা স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত, সেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কোনো একটি অঞ্চলে টিকাদানের হার কমে গেলে শুধু সেখানকার মানুষই ঝুঁকিতে পড়ে না। হাজার হাজার মাইল দূরের মানুষও সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। কারণ, হাম অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায় এবং মানুষের চলাচলের মাধ্যমে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পৌঁছাতে পারে।

তাঁদের মতে, হামের সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকাদানের হার বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা শুধু কোনো একটি দেশ বা অঞ্চলের দায়িত্ব নয়; এটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত