ব্যাংকিং কেলেঙ্কারির জেরে প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়া অভিশংসিত হয়ে ক্ষমতা হারানোর পর প্যারাগুয়ের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন পেদ্রো আলিয়ানা। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির ৫৩তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন ৫২ বছর বয়সী আলিয়ানা।
এর আগে ২০২৩ সালে পেনিয়ার মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। শুক্রবার সিনেটের ৪৫ সদস্যের মধ্যে ৪৪ জন পেনিয়াকে ক্ষমতাচ্যুত করার পক্ষে ভোট দেন। একজন সদস্য ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। এর পরপরই প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন আলিয়ানা।
শুক্রবার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় পেনিয়া লেখেন, ‘আমি কৃতজ্ঞতা নিয়ে বিদায় নিচ্ছি। একই সঙ্গে স্বীকার করছি, যারা এখনো উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন, তাঁদের উদ্বেগ ও কষ্টের বিষয়টি আমি বুঝতে পারছি।’
দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা কলোরাডো পার্টির নেতা পেনিয়ার ক্ষমতাচ্যুতি ছিল দ্রুত রাজনৈতিক পতনের ঘটনা। দেশটির প্রভাবশালী ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান উয়েনো ব্যাংকের আকস্মিক পতনের সঙ্গে এই ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ব্যাংকটির কার্যক্রম যথাযথভাবে সরকারি সংস্থাগুলো তদারকি করেছিল কি না এবং প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে পেনিয়ার স্বার্থের সংঘাত ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিশংসনের পর আস্থাভঙ্গসহ বিভিন্ন অপরাধের সন্দেহে পেনিয়াকে গৃহবন্দি রাখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রসিকিউটররা। একই সঙ্গে প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান কার্লোস কারভালহোর বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ব্যাংকটির কার্যক্রম তদারকিতে ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে তিনি পদত্যাগ করেন।
যেভাবে শুরু উয়েনো ব্যাংক কেলেঙ্কারি
গত মঙ্গলবার প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, উয়েনো ব্যাংক আইন অনুযায়ী নির্ধারিত আর্থিক সক্ষমতার মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। অর্থাৎ, ঋণ ও অন্যান্য বিনিয়োগের দায় মেটানোর মতো পর্যাপ্ত জামানত বা সম্পদ প্রতিষ্ঠানটির হাতে ছিল না।
এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার কথা বলে ব্যাংকটির অবশিষ্ট সম্পদ অন্য ব্যাংকগুলোর কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে এ সংকটের কারণে উয়েনোর লাখ লাখ গ্রাহক তাঁদের ব্যাংক হিসাব ও পেনশনের অর্থ ব্যবহারের সুযোগ হারান।
প্রায় ৩০ লাখ গ্রাহক নিয়ে উয়েনো প্যারাগুয়ের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের ব্যাংকিং সেবা দিত। ২০২৩ সালে ‘উয়েনো’ ব্র্যান্ডে একীভূত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত বড় হয়ে ওঠে। আমানতের হিসাবে এটি প্যারাগুয়ের পঞ্চম বৃহত্তম ব্যাংকে পরিণত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির সম্প্রসারণে সরকারি তহবিলের প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার ভূমিকা রেখেছিল।
ব্যাংকটির দাবি ছিল, এক মিলিয়নের বেশি প্যারাগুয়ের নাগরিক এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জীবনে প্রথম ব্যাংক হিসাব খুলেছেন।
২০২৩ সালে উয়েনোর মূল মালিকানা প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে পেনিয়ার নাম উঠে আসে। তবে তিনি দাবি করেন, ২০২৫ সালের শুরুর দিকেই নিজের শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন।
ব্যাংকটির পতনের পর পেনিয়া পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এ সময় তিনি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার প্যারাগুয়ের কংগ্রেস তাঁর পদত্যাগ গ্রহণ না করে অভিশংসন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
পেনিয়ার দলও অভিশংসনের পক্ষে
পেনিয়ার নিজস্ব রাজনৈতিক দল রক্ষণশীল কলোরাডো পার্টিও তাঁকে অভিশংসনের পক্ষে অবস্থান নেয়। ১৯৪৮ সাল থেকে দলটি প্যারাগুয়ের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ধরে রেখেছে।
দলটির নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হোরাসিও কার্তেস এক বিবৃতিতে বলেন, প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুদ্ধারের জন্য প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়ার অভিশংসনকে তাঁরা সমর্থন করছেন।
পেনিয়াকে পদত্যাগের সুযোগ দেওয়া হলে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে সিনেট সদস্য হওয়ার অধিকার ধরে রাখতে পারতেন। একই সঙ্গে বিচারের ক্ষেত্রে কিছু আইনি সুরক্ষাও পেতেন। কিন্তু অভিশংসনের মাধ্যমে তিনি সেই সুযোগ হারিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার প্রতিনিধি পরিষদে পেনিয়াকে অভিশংসনের প্রস্তাব ৭৮-০ ভোটে পাস হয়। এর ফলে পরদিন সিনেটে তাঁকে অপসারণের পথ তৈরি হয়। তবে একই দিনে ভাইস প্রেসিডেন্ট আলিয়ানার বিরুদ্ধে অভিশংসন শুনানি শুরুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয়।
সংকটের মধ্যেই নতুন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ
প্যারাগুয়ের দক্ষিণাঞ্চলীয় নিমবুকু বিভাগের গভর্নর হিসেবে আলিয়ানার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। পরে তিনি প্রায় ১০ বছর প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ছিলেন। এর মধ্যে তিন বছর তিনি পরিষদটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির মধ্যে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিলেন আলিয়ানা। উয়েনো ব্যাংককে সরকারি সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে জবাবদিহি থেকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। ব্যাংকটিতে রাষ্ট্রীয় পেনশন তহবিলের প্রায় ৩৫৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছিল।
এ ঘটনায় অন্তত ২৭ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ব্যাংকটির প্রধান শেয়ারহোল্ডার মিগেল ভাজকেজও রয়েছেন। তদন্তে প্রতারণার চেষ্টা, আস্থাভঙ্গ, অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রভাব খাটানোর মতো অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পেনিয়া তদন্তে সহযোগিতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে শুক্রবারের অভিশংসন শুনানিতে তিনি নিজে উপস্থিত হননি; তাঁর আইনজীবীরা প্রতিনিধিত্ব করেন।
এক বিবৃতিতে পেনিয়া বলেন, ‘আমার উপস্থিতি যেন আরও বিভক্তি বা অস্থিতিশীলতার কারণ না হয়, তা আমি চাই না। নিজের ব্যক্তিগত পরিণতির চেয়ে দেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া আমার দায়িত্ব।’
তবে সিনেটে দ্রুতগতিতে অভিশংসন শুনানি শেষ করার উদ্যোগে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। আত্মপক্ষ সমর্থনের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের জন্য সময় বাড়ানোর আবেদন জানিয়ে পেনিয়া বলেন, তাঁকে দেওয়া সময় যথেষ্ট নয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যা করতে ওয়াশিংটনে রনি!
ইরানের হুমকি এড়িয়ে যাননি ট্রাম্প, যা আগের প্রেসিডেন্টরা করতো: রুবিও
হোয়াইট হাউসের নতুন 'চিফ অব স্টাফ' কে এই স্টিফেন মিলার
প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্ট পেনিয়াকে অভিশংসন, গৃহবন্দি