লম্বা হতে ক্যানসারের ওষুধ খাচ্ছে কিশোরেরা, চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৪৮ এএম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উচ্চতা বাড়ানোর নতুন প্রবণতা ‘হাইটম্যাক্সিং’ ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই প্রবণতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কিছু কিশোর ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ এরডাফিটিনিব (Erdafitinib) সেবন করছে। তবে চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ ওষুধ গ্রহণ বিপজ্জনক হতে পারে। শিশু-কিশোরদের উচ্চতা বাড়ানোর জন্য ওষুধটির নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

মার্কিন সাময়িকী রোলিং স্টোন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিশোরেরা ‘এরডা’ নামে পরিচিত এ ওষুধ সেবনের অভিজ্ঞতা, কত দিন ধরে ওষুধ খাচ্ছে, উচ্চতার পরিবর্তন এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে পোস্ট করছে।

তাদের আগ্রহের পেছনে রয়েছে ক্যানসারের চিকিৎসা নিতে গিয়ে কয়েকটি শিশুর অপ্রত্যাশিতভাবে উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার ঘটনা। তবে ওই শিশুদের ক্ষেত্রে ওষুধটি ব্যবহার করা হয়েছিল জীবনসংকটাপন্ন ক্যানসারের চিকিৎসায়, উচ্চতা বাড়ানোর জন্য নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ওষুধ সেবন

প্রতিবেদনে নিউইয়র্কের ১৭ বছর বয়সী টিকটক ব্যবহারকারী জ্যাকের (ছদ্মনাম) অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। তার দাবি, ১৫ বছর বয়স থেকে বিরতি দিয়ে দিয়ে সে এরডাফিটিনিব সেবন করছে। বিদেশি অনলাইন বিক্রেতাদের কাছ থেকে ওষুধটি কিনেছিল সে। শুরুতে এক মাসের ওষুধের জন্য প্রায় ৩০০ ডলার খরচ হয়েছিল।

ওষুধের সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে ধারণা থাকায় চিকিৎসার প্রয়োজনে হাসপাতালে যেতে হতে পারে—এমন আশঙ্কায় সে অর্থও জমাতে শুরু করেছিল।

জ্যাকের ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরুষের উচ্চতা নিয়ে নানা আলোচনা তাকে নিজের উচ্চতা সম্পর্কে ক্রমেই বেশি উদ্বিগ্ন করে তোলে। সমবয়সীদের তুলনায় খাটো হওয়ায় স্কুলে উপহাসের শিকার হওয়া এবং উচ্চতা নিয়ে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নানা ধারণা তার এই অনিরাপত্তা বাড়িয়ে দেয়।

ওষুধ সেবনের পর নাক দিয়ে রক্ত পড়া, ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে যাওয়া এবং জয়েন্টে তীব্র ব্যথার মতো সমস্যার কথা জানিয়েছে সে। এমনকি হাত প্রসারিত করতেও ব্যথা হতো বলে দাবি করেছে জ্যাক। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর স্বাভাবিক বোধ করতে কখনো কখনো এক ঘণ্টা ধরে স্ট্রেচিং করতে হতো বলেও জানিয়েছে সে।

জ্যাক এখন ওষুধটি সেবন বন্ধ রেখেছে। তবে নিজের মাপ অনুযায়ী ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে উচ্চতা কয়েক ইঞ্চি বেড়েছে বলে দাবি করে সে আবার ওষুধটি শুরু করার কথা ভাবছে। যদিও তার উচ্চতা বৃদ্ধির কারণ ওষুধ, নাকি স্বাভাবিক বয়ঃসন্ধিকালীন বৃদ্ধি—তা নিশ্চিত হওয়ার কোনো তথ্য প্রতিবেদনে নেই।

কীভাবে কাজ করে এরডাফিটিনিব?

এরডাফিটিনিব একটি ক্যানসারবিরোধী ওষুধ। এটি নির্দিষ্ট কিছু প্রোটিনের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করে, যেগুলো শরীরে কোষের বৃদ্ধি ও হাড়ের বিকাশ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

ভিয়েনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু হরমোন বিশেষজ্ঞ আদালবার্ট রাইমানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বয়ঃসন্ধিকালে হাড়ের দুই প্রান্তের কাছাকাছি তরুণাস্থির বিশেষ অংশ—যাকে গ্রোথ প্লেট বলা হয়—থেকে হাড়ের দৈর্ঘ্য বাড়ে। পূর্ণ উচ্চতা অর্জনের পর সাধারণত এসব গ্রোথ প্লেট বন্ধ হয়ে যায়।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায় কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের বিরল টিউমারে আক্রান্ত দুই শিশুর ক্ষেত্রে এরডাফিটিনিব ব্যবহারের পর অপ্রত্যাশিত উচ্চতা বৃদ্ধির কথা উঠে আসে। তবে অন্য চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ার পর জীবনসংকটাপন্ন ক্যানসারের চিকিৎসার অংশ হিসেবে তাদের ওষুধটি দেওয়া হয়েছিল।

রাইমান সতর্ক করে বলেছেন, শরীরের স্বাভাবিক বিকাশে ভূমিকা রাখা প্রোটিনগুলোর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করলে দীর্ঘ মেয়াদে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা চিকিৎসকদের জানা নেই। বিশেষ করে যেসব শিশু-কিশোরের শরীর এখনো বিকাশের পর্যায়ে রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও উদ্বেগজনক।

যুক্তরাষ্ট্রের চিলড্রেনস ন্যাশনাল হাসপাতালের শিশু হরমোন বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু ডবারও শিশুদের উচ্চতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এরডাফিটিনিব ব্যবহারের বিপক্ষে। তাঁর মতে, এভাবে ওষুধটি ব্যবহার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও ওষুধ প্রস্তুতকারকের সতর্কতা

এরডাফিটিনিবের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে ডায়রিয়া, বমিভাব, হাত-পায়ে ব্যথা এবং নখের গোড়া থেকে নখ আলাদা হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা।

‘বালভারসা’ (Balversa) ব্র্যান্ড নামে বাজারজাত এই ওষুধটি ২০১৯ সালে প্রাপ্তবয়স্কদের নির্দিষ্ট ধরনের অগ্রসর মূত্রথলির ক্যানসারের চিকিৎসায় অনুমোদন পায়। শিশুদের কিছু বিরল ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়েও ওষুধটির ক্লিনিক্যাল গবেষণা হয়েছে।

ওষুধটির বাজারজাতকারী জনসন অ্যান্ড জনসন জানিয়েছে, উচ্চতা বাড়ানোর জন্য এরডাফিটিনিব অনুমোদিত নয়। শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এ উদ্দেশ্যে ওষুধটির নিরাপত্তা ও কার্যকারিতাও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

উচ্চতা নিয়ে সামাজিক চাপ, ঝুঁকিতে কিশোরেরা

‘লুকসম্যাক্সিং’ প্রবণতার অংশ হিসেবে শারীরিক সৌন্দর্য ও চেহারা উন্নত করার নানা কৌশল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এরই একটি নতুন ধারা ‘হাইটম্যাক্সিং’, যেখানে নির্দিষ্ট উচ্চতাকে আদর্শ ধরে তা অর্জনের নানা পদ্ধতি প্রচার করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা কারও উচ্চতা বৃদ্ধির দাবি চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রমাণ নয়। বয়ঃসন্ধিকালে স্বাভাবিকভাবেই উচ্চতা বাড়তে পারে। তাই কোনো ওষুধ সেবনের সঙ্গে উচ্চতা বৃদ্ধির সময়কাল মিলে গেলেই ওষুধটিকে এর কারণ বলা যায় না।

ক্যানসারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ কেবল উচ্চতা বাড়ানোর আশায় গ্রহণ করলে শরীরের স্বাভাবিক বিকাশে অজানা ক্ষতি হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এরডাফিটিনিব বা এ ধরনের কোনো ওষুধ সেবন না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সূত্র: রোলিং স্টোন, চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও জনসন অ্যান্ড জনসনের ওষুধসংক্রান্ত তথ্য

এমএজেড
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত