ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা, কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে প্রেসিডেন্ট

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৪৯ পিএম

ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কোনো পক্ষই পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট—দুজনের সামনেই সরকার গঠনের কঠিন সমীকরণ। এ পরিস্থিতিতে কাকে প্রথমে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ।

রোববার একজন প্রার্থীকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। পার্লামেন্ট সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সমর্থন পেয়েছেন আইজেনকট। তবে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সমর্থনেই তাঁর এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা এসেছে। অক্টোবরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এসব দল রেকর্ড ১৯টি আসন পেয়েছে। কিন্তু তাদের নিয়ে সরকার গঠন করতে রাজি নন আইজেনকট।

বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রধানদের পরামর্শ বৈঠক শেষ হয়। এতে ১২০ সদস্যের নেসেটের (ইসরায়েলি পার্লামেন্ট) ৬৭ জন সদস্য আইজেনকটের পক্ষে মত দেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর পক্ষে সমর্থন জানান ৪৬ জন।

নেতানিয়াহুর পক্ষে তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক জোটের ৫৩টি আসনের সব সদস্যের সমর্থনও পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিনের মিত্র দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম তাঁর পক্ষে সমর্থন জানায়নি। অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান থেকে অব্যাহতি দিতে নেতানিয়াহুর জোট ব্যর্থ হওয়ায় দলটি এই অবস্থান নিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট হারজগ এখনো কোনো পক্ষের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানাননি। তাঁর মতে, সংখ্যার হিসাবে পরিস্থিতি স্পষ্ট মনে হলেও দুই রাজনৈতিক জোটের মধ্যে এবং একই জোটের শরিকদের মধ্যেও পারস্পরিক আপত্তি রয়েছে। ফলে কার পক্ষে কার্যকর জোট গঠন করা সম্ভব হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল, আরেকটি নির্বাচন এড়াতে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের সমর্থক দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের উদ্যোগ নিতে পারেন প্রেসিডেন্ট।

সরকার গঠনের সমীকরণ কতটা কঠিন?

ইসরায়েলের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। কিন্তু নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক জোটই সেই সংখ্যা অর্জন করতে পারেনি।

নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। আইজেনকটকে সমর্থন দেওয়া ইহুদিপ্রধান চারটি দলের আসনসংখ্যা ৪৮। অন্যদিকে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর আসন ১৯টি।

আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে সরকারে না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আইজেনকট। যদিও তাদের সমর্থন পেলে তাঁর পক্ষে ৬৭ সদস্যের জোট গঠন করা সম্ভব। তবে অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের দুটি দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও শাসকে পাশে পেলে আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়াই তাঁর আসনসংখ্যা ৬১-তে পৌঁছাতে পারে।

ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ইঙ্গিত দিয়েছে, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে তারা আইজেনকটকে সমর্থন দিতে পারে। তবে শাস পার্টি বুধবার নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

অন্যদিকে সরকার গঠন করতে হলে নেতানিয়াহুকে বিরোধী শিবিরের অন্তত একটি দলকে নিজের পক্ষে আনতে হবে। দুই নেতার মধ্যে পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সমঝোতায় জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনও একটি সম্ভাবনা। এ ক্ষেত্রে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে সরকারে রাখা হবে না। তবে নেতানিয়াহুর অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

সরকারে জায়গা পাবে কি আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো?

বর্তমান পরিস্থিতিতে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর নতুন সরকারে সরাসরি অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে হচ্ছে।

ইসরায়েলের আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর মধ্যে রয়েছে তিনটি দলের জোট জয়েন্ট লিস্ট এবং ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রা'আম। তাদের আসনসংখ্যা যথাক্রমে ১১ ও ৮।

রা'আম জানিয়েছে, আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দিতে তারা প্রস্তুত। অন্যদিকে জয়েন্ট লিস্ট সরকারে সরাসরি অংশ নিতে চায় না। তবে সরকার গঠনের বাইরে থেকে আইজেনকটকে সমর্থন দিতে রাজি।

প্রেসিডেন্ট হারজগের সঙ্গে পরামর্শ বৈঠকে উভয় দলই আইজেনকটের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু আইজেনকট তাদের সরকারে নিতে রাজি নন। তাঁর শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে হামাসকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।

রা'আমের নেতা মানসুর আব্বাস ২০২১ সালে নেতানিয়াহুবিরোধী জোট সরকারে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর দলই ছিল ইসরায়েলের সরকারে অংশ নেওয়া ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রথম দল। আব্বাস হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে অবস্থান জানালেও সংগঠনটিকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দিতে রাজি হননি।

তবে ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীর প্রস্তাবিত সরকার পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে জয়ী হলে ৬১ আসনের সমর্থন ছাড়াও তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আরব নেতৃত্বাধীন দল দুটি বাইরে থেকে আইজেনকটকে সমর্থন দিয়ে সরকার গঠনে সহায়তা করতে পারে।

আইজেনকট শুরুতে সংখ্যালঘু সরকার গঠন করে পরে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের প্রশ্নে ছাড় দিয়ে অতি-রক্ষণশীল দুই দলকে জোটে টানার চেষ্টা করতে পারেন। এতে পরবর্তী সময়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর ওপর নির্ভরতার বিরোধিতা করেছেন আইজেনকটের কয়েকজন মিত্র। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি হুঁশিয়ারি দিয়েছে, আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা ইসরায়েলের জন্য ‘বিপজ্জনক’ হবে।

জয়েন্ট লিস্টের জ্যেষ্ঠ নেতা আহমেদ তিবি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) বলেন, ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব প্রত্যাখ্যান করা হলে তা প্রমাণ করবে, ইসরায়েল সব নাগরিকের জন্য পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্র নয়; বরং একটি জাতিগত আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র।

নতুন সরকারের কাছে কী চায় ফিলিস্তিনি দলগুলো?

ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর প্রথম লক্ষ্য নেতানিয়াহুর সরকারের অবসান। জয়েন্ট লিস্ট জানিয়েছে, আইজেনকটকে সর্বসম্মত সমর্থন দেওয়ার মধ্য দিয়ে নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকারকে আবার ক্ষমতায় আসা থেকে ঠেকানোর জনদাবির প্রতিফলন ঘটেছে।

আইজেনকটের পক্ষে সমর্থন বাড়িয়ে জাতীয় ঐক্যের এমন সরকার গঠনের সম্ভাবনা কমাতে চায় দলটি, যে সরকারে নেতানিয়াহু আবারও ক্ষমতায় থাকতে পারেন। তবে তাদের সমর্থনের অর্থ এই নয় যে, বিরোধী জোটের প্রতি তাদের সব আপত্তি দূর হয়েছে। জয়েন্ট লিস্টের অভিযোগ, নেতানিয়াহুর নীতি এবং ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিরুদ্ধে উসকানির বিষয়ে বিরোধী দলগুলো এখনো কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রস্তুতি দেখায়নি।

সরকারের বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার বিনিময়ে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো ফিলিস্তিনি নাগরিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি চাইছে। এর মধ্যে রয়েছে বাড়িঘর ধ্বংস বন্ধ, উসকানিমূলক বক্তব্যের অবসান, অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ এবং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা।

আহমেদ তিবি এপিকে বলেন, এমন একটি ‘সংস্কারমূলক সরকার’ গঠিত হলে ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধ হবে বা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে—এমন কোনো প্রত্যাশা তাঁর নেই। তবে এ ধরনের সরকার ফিলিস্তিনি নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে তাঁদের বসবাসের এলাকাগুলোতে সহিংস অপরাধ দমনে পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হতে পারে।

রা'আম নেতা মানসুর আব্বাসও বলেছেন, নেতানিয়াহুর সরকার এবং উগ্র ডানপন্থী রাজনীতিক অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের প্রভাব থেকে দেশকে বের করে আনাই তাঁদের অগ্রাধিকার।

সরকার গঠন ব্যর্থ হলে কী হবে?

প্রেসিডেন্ট হারজগ যাঁকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন, তিনি এ জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজন হলে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানো যাবে। প্রথম মনোনীত ব্যক্তি ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। তাঁকেও সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় দেওয়া হবে।

দ্বিতীয় মনোনীত ব্যক্তিও ব্যর্থ হলে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা তৃতীয় একজন প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন জানাতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে সরকার গঠনের জন্য শেষবারের মতো ১৪ দিন সময় দেওয়া হবে।

তৃতীয় প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হলে নেসেট ভেঙে দেওয়া হবে এবং ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। এ সময় পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

ইসরায়েলবিষয়ক বিশ্লেষক নেহরু জামহুর আলজাজিরাকে বলেন, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থাই সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি বলে মনে হচ্ছে। আর এমন পরিস্থিতি নেতানিয়াহুর জন্যও সুবিধাজনক হতে পারে। তাঁর ধারণা, নতুন নির্বাচন হলে প্রতিদ্বন্দ্বীদের অবস্থান দুর্বল করার পাশাপাশি ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়ার আশাও করছেন নেতানিয়াহু।

সূত্র: আল-জাজিরা

ওয়াইএ
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত