বিমানবন্দরে বিদায়ের মুহূর্তে মায়ের চোখের পানি দেখেও হাসতে হয়। স্ত্রীকে বলতে হয়, ‘ভালো থেকো, খুব শিগগিরই ফিরে আসব।’ সন্তানের মাথায় হাত রেখে প্রতিশ্রুতি দিতে হয়-‘তোমার জন্য অনেক কিছু নিয়ে আসব।’ তারপর ব্যাগ হাতে মানুষটি যখন ইমিগ্রেশনের দরজা পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যান, তখন শুরু হয় আরেকটি জীবনের গল্প।
এই গল্পে স্বপ্ন আছে, অর্থ আছে, পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে। কিন্তু তার ভেতরে এমন কিছু অধ্যায়ও থাকে, যেগুলো খুব কম মানুষই জানতে পারে। সেই অধ্যায়ের নাম-একাকিত্ব, অপেক্ষা আর না-বলা বিসর্জন।
প্রবাস মানেই শুধু ভালো বেতন, বিদেশের শহর, চকচকে রাস্তা কিংবা দেশে টাকা পাঠানোর সাফল্য নয়। প্রবাস মানে অনেক সময় নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষগুলোর কাছ থেকে দূরে থেকে তাদের জন্য বেঁচে থাকা। নিজের সুখকে পিছনে ফেলে পরিবারের স্বপ্নকে সামনে এগিয়ে নেওয়া।
যে মানুষটি পরিবারের জন্য দূরে
ঢাকার কোনো মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা হয়তো মাসের শেষে টাকা পাঠান। সেই টাকা দিয়ে সন্তানের স্কুলের বেতন হয়, গ্রামের বাড়িতে নতুন ঘরের কাজ হয়, মায়ের চিকিৎসা হয় কিংবা ছোট ভাইয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফি দেওয়া হয়।
পরিবারের কাছে তিনি সফল।
কিন্তু সেই সফলতার হিসাবের খাতায় লেখা থাকে না-কত রাত তিনি একা ঘুমিয়েছেন। লেখা থাকে না অসুস্থ হলে পাশে পানি এগিয়ে দেওয়ার মতো কেউ ছিল কি না। ঈদের সকালে নতুন জামা পরে পরিবারের সঙ্গে ছবি তুলতে পারেননি কতবার। বাবার জানাজায়, মায়ের অসুস্থতায় কিংবা সন্তানের প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিনটিতে তিনি কোথায় ছিলেন-সেসব প্রশ্নও হিসাবের অংশ হয় না।
প্রবাসী মানুষের জীবনে এমন অনেক ‘অনুপস্থিতি’ থাকে, যেগুলোর কোনো আর্থিক মূল্য নেই। অথচ সেগুলোই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
সন্তানের শৈশব-ভিডিও কলে দেখা
প্রবাসী বাবার কাছে সন্তানের বেড়ে ওঠা অনেক সময় একটি ভিডিও কলের গল্প।
আজ ছেলে নতুন কথা বলেছে।
আজ মেয়েটি প্রথমবার একা স্কুলে গেছে।
আজ পরীক্ষায় ভালো করেছে।
আজ সাইকেল চালানো শিখেছে।
সব খবরই আসে ফোনে।
কিন্তু ফোনের পর্দায় সন্তানের হাসি দেখা আর তাকে কাছে থেকে জড়িয়ে ধরা-দুটো এক নয়।
অনেক বাবা বছরের পর বছর সন্তানের শৈশবকে ভিডিও কলের ছোট ছোট ফ্রেমে দেখেছেন। সন্তান যখন একটু বড় হয়, তখন হয়তো প্রশ্ন করে, ‘বাবা, তুমি এত দূরে থাকো কেন?’
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে একজন প্রবাসী বাবা হয়তো বলেন, ‘তোমাদের জন্য।’
কিন্তু শিশুটি তখনও বুঝতে পারে না-তার জন্যই বাবা তার কাছ থেকে দূরে।
মায়ের অপেক্ষা
প্রবাসী জীবনের সবচেয়ে নীরব চরিত্র হয়তো মা।
ছেলে বিদেশে যাওয়ার পর মা প্রতিদিন অপেক্ষা করেন ফোনের। ফোন না এলে নিজেই কল করেন। কখনো বলেন, ‘খেয়েছিস?’ কখনো বলেন, ‘শরীর ভালো তো?’
কথা শেষ হওয়ার পরও মায়ের মনে হয়, ছেলেটা হয়তো কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু বলেনি।
অন্যদিকে বিদেশে থাকা ছেলেটিও অনেক কথা গোপন রাখে। কাজের চাপ, অর্থকষ্ট, অসুস্থতা, চাকরি হারানোর ভয়-সবকিছু মাকে বলা হয় না। কারণ মা চিন্তা করবেন।
এভাবেই দুজন মানুষ একে অপরকে ভালো রাখতে গিয়ে নিজেদের কষ্ট লুকিয়ে রাখেন।
প্রবাসজীবনের সবচেয়ে বড় বিসর্জনগুলোর একটি হয়তো এটাই-আপন মানুষকে ভালো রাখার জন্য নিজের কষ্টটুকু না বলা।
ঈদের আনন্দেও বিষণ্নতা
ঈদ আসে দেশে। বাড়ির উঠানে নতুন জামাকাপড়, রান্নার গন্ধ, আত্মীয়দের আসা-যাওয়া, মসজিদ থেকে তাকবিরের ধ্বনি-সবকিছু মিলিয়ে উৎসব।
কিন্তু প্রবাসীর ঈদ অনেক সময় অন্যরকম।
কাজের শিফট শেষ করে ছোট একটি ঘরে ফিরে ফোন খুলে পরিবারের ছবি দেখতে হয়। ভিডিও কলে মা নতুন শাড়ি দেখান, সন্তান নতুন জামা পরে ঘুরে বেড়ায়। স্ত্রী রান্না করা খাবারের ছবি পাঠান।
প্রবাসী মানুষটি হাসেন। বলেন, ‘খুব সুন্দর হয়েছে।’
তারপর কল কেটে গেলে ঘরটি আবার নীরব হয়ে যায়।
কখনো কখনো কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের উৎসবকে একটি মোবাইল ফোনের পর্দায় দেখতে হয়।
অসুস্থতার সময় বোঝা যায় দূরত্ব
মানুষের জীবনে অসুস্থতা এমন একটি সময়, যখন কাছের মানুষের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।
দেশে থাকলে জ্বর এলে মা মাথায় পানি দেন। স্ত্রী ওষুধ এনে দেন। সন্তান পাশে বসে থাকে। বন্ধু হাসপাতালে নিয়ে যায়।
প্রবাসে সেই একই জ্বর কখনো হয়ে ওঠে একাকিত্বের পরীক্ষা।
কাজ শেষে শরীর খারাপ নিয়ে ঘরে ফিরে নিজেকেই ওষুধ খুঁজতে হয়। রান্না করার শক্তি না থাকলে খাবার কিনে খেতে হয়। হাসপাতালে যেতে হলে নিজেকেই যেতে হয়।
ফোনের ওপাশ থেকে মা জিজ্ঞেস করেন, ‘ডাক্তার দেখিয়েছিস?’
‘হ্যাঁ, দেখিয়েছি।’
অনেক সময় সেটিও সত্যি নয়।
কারণ দূরের মানুষকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে চায় না কেউ।
টাকার সঙ্গে আসে দায়িত্ব
প্রবাসীরা শুধু নিজের জন্য বিদেশে যান না। অনেকের পেছনে থাকে একটি পুরো পরিবার।
কেউ বাবার ঋণ শোধ করতে গেছেন।
কেউ বোনের বিয়ে দিতে।
কেউ সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য।
কেউ নিজের বাড়ি বানাতে।
কেউ পরিবারের চিকিৎসার খরচ চালাতে।
মাস শেষে বেতন হাতে আসার পর নিজের প্রয়োজনের হিসাব করার আগেই দেশে টাকা পাঠাতে হয়।
কত টাকা নিজের জন্য রাখা যাবে-এই হিসাবের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, বাড়িতে কত টাকা পাঠানো সম্ভব।
অনেক প্রবাসীর জীবন তাই এক ধরনের নীরব অর্থনৈতিক দায়িত্বের নাম।
যে স্বপ্নের মূল্য অনেক বেশি
প্রবাসী মানুষকে বাইরে থেকে দেখে মনে হতে পারে, তিনি ভাগ্যবান। বিদেশে আছেন, ভালো আয় করছেন, পরিবারের জন্য বাড়ি করছেন।
কিন্তু সেই বাড়ির প্রতিটি ইটের সঙ্গে হয়তো মিশে আছে কোনো একটি রাতের ঘুমহীনতা।
সন্তানের পড়াশোনার খরচের সঙ্গে হয়তো জড়িয়ে আছে বাবার একাকী দুপুর।
মায়ের চিকিৎসার বিলের সঙ্গে হয়তো আছে ছেলের নিজের চিকিৎসা না করানোর সিদ্ধান্ত।
পরিবারের নতুন গাড়ির সঙ্গে হয়তো জড়িয়ে আছে প্রবাসীর বহু বছরের পুরোনো জুতা।
এই ত্যাগগুলো কেউ দেখতে পায় না।
কারণ প্রবাসীরা সাধারণত তাদের কষ্টের গল্প বলেন না।
তারা ছবি পাঠান নতুন পোশাকে।
বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।’
কিন্তু সেই ‘ভালো আছি’র ভেতরে কখনো কখনো জমে থাকে দীর্ঘশ্বাস।
সম্পর্কেও তৈরি হয় অদৃশ্য দূরত্ব
দীর্ঘদিন দূরে থাকার আরেকটি কঠিন দিক হলো সম্পর্কের পরিবর্তন।
সন্তান বড় হয়ে যায়। স্বামী-স্ত্রীর জীবনযাত্রা বদলে যায়। বাবা-মা বয়সী হয়ে পড়েন। বন্ধুদের জীবনেও আসে নতুন অধ্যায়।
প্রবাসী মানুষটি ফিরে এসে কখনো কখনো আবিষ্কার করেন-যে বাড়ির জন্য এত বছর দূরে ছিলেন, সেই বাড়ির মানুষগুলোর জীবনেও তিনি কিছুটা অতিথি হয়ে গেছেন।
সন্তানের সঙ্গে নতুন করে বন্ধুত্ব করতে হয়। স্ত্রীর সঙ্গে আবারও ভাগ করে নিতে হয় দৈনন্দিন জীবন। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে কাটানো সময় তখন হয়ে ওঠে সবচেয়ে মূল্যবান।
কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সময় আর ফিরে পাওয়া যায় না।
প্রবাসের অর্জন কি শুধু অর্থ?
অবশ্যই নয়।
প্রবাসীরা শুধু টাকা পাঠান না; তাঁরা দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁদের পাঠানো অর্থে অসংখ্য পরিবার টিকে থাকে, শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ চলে, ঘরবাড়ি নির্মিত হয়, ছোট ব্যবসা শুরু হয়।
কিন্তু অর্থনৈতিক অবদানের পাশাপাশি তাঁদের মানবিক গল্পটিও মনে রাখা জরুরি।
একজন প্রবাসী যখন দেশে টাকা পাঠান, তখন সেই টাকার সঙ্গে তাঁর শ্রম, সময়, ঘাম এবং জীবনের একটি অংশও পাঠান।
একজন মা যখন বলেন, ‘আমার ছেলে বিদেশে, ভালো আছে’-তখন হয়তো তিনি ছেলের সাফল্য নিয়ে গর্ব করেন। কিন্তু সেই গর্বের আড়ালে থাকে বছরের পর বছর অপেক্ষার কষ্ট।
ফিরে আসার স্বপ্ন
প্রায় প্রতিটি প্রবাসীর মনে একটি ‘ফিরে আসার দিন’ থাকে।
কেউ বলেন, ‘আর দুই বছর।’
কেউ বলেন, ‘বাড়িটা শেষ হলেই।’
কেউ বলেন, ‘ছেলেটার পড়াশোনা শেষ হলে।’
কেউ বলেন, ‘ঋণটা শোধ হয়ে গেলে।’
কিন্তু সেই দুই বছর কখনো পাঁচ বছর হয়ে যায়। পাঁচ বছর দশ বছরে পৌঁছায়।
জীবন অপেক্ষা করতে করতে এগিয়ে যায়।
একসময় হয়তো মানুষটি দেশে ফেরেন। বিমানবন্দরের বাইরে পরিবারের মানুষ অপেক্ষা করে। বহু বছরের বিচ্ছেদের পর আলিঙ্গনে চোখ ভিজে যায়।
কিন্তু তখনও মনে পড়ে-এই মানুষগুলোর সঙ্গে থাকার জন্যই তো এত বছর দূরে থাকা।
প্রবাসজীবনের সবচেয়ে বড় পরিহাস হয়তো এখানেই।
যাদের কাছে থাকার জন্য মানুষটি দূর দেশে গিয়েছিলেন, তাদের কাছেই থাকার সময়টুকু হারিয়ে ফেলেন।
না বলা বিসর্জনের গল্প
প্রবাসের গল্প তাই শুধু সাফল্যের গল্প নয়। এটি অপেক্ষার গল্প, দায়িত্বের গল্প, চোখের পানি লুকানোর গল্প।
এটি সেই বাবার গল্প, যিনি সন্তানের জন্মদিনে ভিডিও কলে কেক কাটেন।
সেই মায়ের গল্প, যিনি বিদেশে থাকা সন্তানের ফোনের অপেক্ষায় রাত জাগেন।
সেই স্ত্রীর গল্প, যিনি একা সংসার সামলান এবং স্বামীর কষ্টের কথা শুনেও বলেন, ‘তুমি চিন্তা করো না।’
সেই সন্তানের গল্প, যে বাবাকে ছবিতে বেশি দেখে, সামনে কম।
আর সেই প্রবাসীর গল্প-যিনি নিজের যৌবনের একটি বড় অংশ দূর দেশে রেখে আসেন, শুধু আপন মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ একটু সুন্দর করার জন্য।
তাঁর অর্জনের হিসাব হয় ব্যাংক ব্যালান্সে, বাড়ির দলিলে, সন্তানের শিক্ষায় কিংবা পরিবারের স্বচ্ছলতায়।
কিন্তু তাঁর না-বলা বিসর্জনের হিসাব কোথাও লেখা থাকে না।
সেই হিসাব থাকে শুধু মায়ের চোখে, স্ত্রীর নীরবতায়, সন্তানের অপেক্ষায় আর প্রবাসীর বুকের গভীরে।
আর তাই প্রবাসজীবনের গল্প যখন বলা হয়, তখন শুধু বলতে হয় না-‘তিনি কত টাকা আয় করেছেন।’
একবার অন্তত প্রশ্ন করতে হয়-
এই অর্জনের জন্য তিনি কী কী হারিয়েছেন?