চারদিকে শুধু কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী আর আগুনের লেলিহান শিখা। কেউ প্রাণপণ চেষ্টায় ঘর থেকে শেষ সম্বলটুকু বের করার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ কান্নাজড়িত চোখে পাগলের মতো খুঁজছেন আপনজনকে।
চোখের পলকেই রাজধানীর পল্লবীর কালশী বস্তির শত শত মানুষের স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে তীব্র আতঙ্ক ও হাহাকার।
সোমবার (২৫ মে) সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা ২৩ মিনিটে কালশী বস্তিতে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিটের ১২৩ জন ফায়ার ফাইটার স্থানীয় বাসিন্দা, স্বেচ্ছাসেবক, পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় প্রায় দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চেষ্টা চালিয়ে রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
সংকটের মুখে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত
আগুন নিয়ন্ত্রণে যখন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা প্রাণপণ লড়ছিলেন, তখন সাধারণ মানুষও ঘরে বসে থাকতে পারেননি। কাঁধে ভারী পানির পাইপ তুলে নিয়ে ফায়ার ফাইটারদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন স্থানীয় তরুণ ও যুবকেরা। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।
আগুন নিয়ন্ত্রণে বেগ পাওয়ার মূল কারণ
ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বস্তি এলাকার সরু রাস্তা এবং আশেপাশে পানির কোনো উৎস না থাকায় আগুন নেভাতে চরম বেগ পেতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘যেখানে আগুন লেগেছে, সেখানকার রাস্তাগুলো অত্যন্ত সরু হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সরাসরি পৌঁছাতে পারছিল না। এছাড়া পানির তীব্র সংকট থাকায় আমাদের ১৫টি বিশেষ পানিবাহী গাড়ি এনে দূর থেকে পানি সরবরাহ করতে হয়েছে।’
কেন এত দ্রুত ছড়ালো আগুন?
লে. কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার জানান, বস্তি এলাকায় ভাঙারি, প্লাস্টিক ও কাগজের অসংখ্য দোকান ছিল। ঘরগুলোতে কাপড় ও কাগজের মতো প্রচুর দাহ্য পদার্থ থাকায় এবং সন্ধ্যার পর বাতাসে গতি বেশি থাকায় আগুন মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ রূপ নেয়।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই বস্তিতে প্রায় ১,২০০ ঘর ও ভাঙারির দোকান রয়েছে, যেখানে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি মানুষের বসবাস ছিল। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত কোনো নিখোঁজ বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
উচ্ছেদ অভিযানের সাথে যোগসূত্র ও তদন্ত কমিটি
সম্প্রতি কালশী বস্তিতে একটি উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছিল। এর সাথে আগুনের কোনো যোগসূত্র আছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘তদন্ত ছাড়া এই মুহূর্তে কিছু বলা সম্ভব নয়। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত সাপেক্ষে আগুনের সূত্রপাত ও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ জানা যাবে।’
সব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা কালশী বস্তির মানুষগুলোর চোখে এখন শুধুই অন্ধকার আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।