জাতীয় গ্রিডে বাড়ল গ্যাস, তিতাসের ২৮ নম্বর কূপ চালু

দেশের চলমান গ্যাস সংকটের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। 

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র তিন মাসের মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে নতুন এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলো বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়। তিতাস-২৮ নম্বর কূপের খননকাজ শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর। প্রায় ছয় মাসের কাজ শেষে চলতি বছরের ১৯ জুন খনন শেষ হয়। কূপটির গভীরতা ৩ হাজার ৬০১ মিটার বা প্রায় ১৩ হাজার ফুট। এটি খননে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। কূপটি থেকে দৈনিক ১২ থেকে ১৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, গ্যাসের চলমান সংকট মোকাবিলায় আমদানির পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে। বর্তমানে আমদানি করা এলএনজির জন্য দেশীয় গ্যাসের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় এভাবে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। তাই দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, তিতাস-২৮ থেকে দৈনিক ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ায় শিল্পকারখানার উৎপাদন বাড়বে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে। একই সঙ্গে তিতাস-২৯, তিতাস-৩০ ও তিতাস-৩১ নম্বর কূপের খননকাজও চলমান রয়েছে।

অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, জ্বালানি খাতে সরকার সম্মিলিতভাবে ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট দেশীয় গ্যাস এবং একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল থেকে আরও ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। সব মিলিয়ে ৩ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩০ সাল নাগাদ সম্ভাব্য ৫ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা গেলে দেশের চাহিদা পূরণে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানান তিনি।

দেশে গ্যাসের স্বাভাবিক দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট বলে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সংকট শুরুর আগে দেশে দৈনিক ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। সংকটের কারণে তা কমে ২ হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। তবে সরকারের জরুরি পদক্ষেপের ফলে গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। পাশাপাশি অনশোর ও অফশোর—দুই ক্ষেত্রেই গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, তিতাস-২৮ কূপ চালু হওয়া দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আস্থা ও আত্মবিশ্বাসের বিষয়। দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতার চাপ কমানোর চেষ্টা চলছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে তিতাস ও বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের আরও চারটি কূপ থেকে প্রায় সাড়ে ৫৫ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিতাস-২৯, তিতাস-৩০, তিতাস-৩১ এবং বাখরাবাদ-১১ নম্বর কূপের কাজ শেষ হলে তিতাস-২৮-এর সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুটসহ পাঁচটি কূপ থেকে মোট সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।

বিজিএফসিএলের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, উদ্বোধনের পরপরই তিতাস-২৮ নম্বর কূপকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে আমদানিনির্ভরতার চাপ কিছুটা কমিয়ে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে।

‘তিতাস ও কামতা ফিল্ডে ৪টি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ খনন’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম জসীম উদ্দিন জানান, তিতাস-২৮ নম্বর কূপের মূল খননকাজ প্রায় এক মাস আগে শেষ হয়েছে। প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিতাস-২৮, ২৯, ৩০ ও কামতা-২ নম্বর কূপ খননের কাজ শুরু হয়েছিল। এর মধ্যে তিতাস-২৮ উৎপাদনে গেছে। অন্য কূপগুলোর কাজও দ্রুত শেষ করে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজিএফসিএলের গভীর অনুসন্ধান গ্যাস কূপ খনন প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব জানান, তিতাস-৩১ নম্বর গভীর অনুসন্ধান কূপের খননকাজ চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে কূপটির খনন গভীরতা প্রায় ৪ হাজার ৯২০ মিটারে পৌঁছেছে। এর লক্ষ্যমাত্রা ৫ হাজার ৬০০ মিটার, যা প্রায় ১০০ মিটার কমবেশি হতে পারে। গভীরতার কারণে কূপটির খননকাজে তুলনামূলক বেশি সময় লাগছে। ভূতাত্ত্বিক জটিলতা দেখা না দিলে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এর কাজ শেষ করার আশা রয়েছে। কূপটি সফল হলে দৈনিক প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।

তিনি আরও জানান, তিতাস-২৯ নম্বর কূপের মূল খননকাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে লগিংসহ আনুষঙ্গিক কাজ চলছে। এসব কাজ শেষ করে আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে কূপটি উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। কূপটি থেকে দৈনিক প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিতাস-৩০ নম্বর কূপের কাজও আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখান থেকেও দৈনিক ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

দেশের গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে আগামী ১০ বছরের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বল্পতম সময়ে ৩১টি কূপ খননের কাজ শেষ হয়েছে এবং আরও সাতটি কূপের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ১৫০টি কূপ খনন সম্পন্ন হলে দৈনিক ১ হাজার ৭৬২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান দুটি এফএসআরইউ থেকে ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং পরিকল্পিত আরও দুটি এফএসআরইউ থেকে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ রয়েছে।

বিজিএফসিএলের কর্মকর্তারা জানান, তিতাস-৩১-এর কাজ শেষ হওয়ার পর বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের ১১ নম্বর গভীর কূপের খননকাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। কূপটির লক্ষ্যমাত্রা গভীরতা ৪ হাজার ৫০০ মিটার। সফলভাবে খনন ও পরীক্ষা সম্পন্ন হলে বাখরাবাদ-১১ থেকে দৈনিক প্রায় ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।

তিতাস-২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং বাখরাবাদ-১১ থেকে প্রায় ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর সঙ্গে তিতাস-২৮-এর সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট যোগ হলে পাঁচটি কূপ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের বর্তমান মজুদ আনুমানিক দেড় ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে তিতাস-৩১ একটি অনুসন্ধানমূলক কূপ হওয়ায় সেখানে নতুন গ্যাসের মজুদ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে কূপটির মাধ্যমে আরও প্রায় দুই টিসিএফ গ্যাসের মজুদ যুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে খননকাজ শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন স্তরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল না পাওয়া পর্যন্ত নতুন মজুদের পরিমাণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।