ফের বৈঠার ছন্দ, মাঝিদের উচ্ছ্বাস আর নদীর দুই পাড়ে মানুষের ঢল। দীর্ঘ ১৬ বছর পর ফরিদপুরের ভাঙ্গার কুমার নদে ফিরলো দুই শতাধিক বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ। বিশ্বকর্মা পূজাকে ঘিরে নদীর বুকে রঙিন নৌকার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে ভাঙ্গা। নদীর দুই তীর, সেতু ও আশপাশের ভবনের ছাদ পরিণত হয় দর্শকের গ্যালারিতে। হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাসে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে উৎসবের নগরী।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উপজেলার কুমার নদের চরকান্দা পয়েন্ট থেকে ভাঙ্গা খাদ্যগুদাম এলাকা পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটারজুড়ে এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ছোট-বড় মিলিয়ে এতে অংশ নেয় প্রায় ২৬টি বাইচের নৌকা। দীর্ঘ বিরতির পর প্রিয় এই লোকজ উৎসব ফিরে আসায় সকাল থেকেই নদীর পাড়ে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়।
সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নৌকা বাইচের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এ সময় তিনি গ্রামবাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন।
নৌকা বাইচ শুরু হওয়ার পর কুমার নদের দুই পাড়ে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ নদীর তীরে দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন। কেউ আবার পরিবার-পরিজন নিয়ে ট্রলার ও নৌকা ভাড়া করে নদীতে নেমে পড়েন। প্রতিযোগী নৌকাগুলো নদীর বুকে ছুটে চলার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের উচ্ছ্বাস আর করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।
অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নদীর দুই তীরেও বসে নানা ধরনের অস্থায়ী দোকান। মিষ্টি, খাবারসহ গৃহস্থালি বিভিন্ন পণ্যের দোকানে জমে ওঠে বেচাকেনা। ফলে নৌকা বাইচকে ঘিরে কয়েক ঘণ্টার জন্য কুমার নদপাড় পরিণত হয় বড় এক লোকজ মেলায়।
দীর্ঘ বিরতির পর ঐতিহ্যের প্রত্যাবর্তন
স্থানীয়রা জানায়, বিশ্বকর্মা পূজা উপলক্ষে কুমার নদে নৌকা বাইচের ঐতিহ্য বহু পুরোনো। স্থানীয় প্রবীণদের কেউ কেউ এ আয়োজনের ইতিহাস দুই শত বছরেরও বেশি বলে উল্লেখ করেন। ২০১৭ সালেও কুমার নদে নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এরপর দীর্ঘ বিরতির পর আবারও এ আয়োজন হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়।
ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল ছিলেন এবারের আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর ভাঙ্গাবাসীর প্রাণের দাবি পূরণ হয়েছে। লোকসংস্কৃতির শেকড়ের টানে নৌকা বাইচের পাশাপাশি জারি, সারিগানসহ গ্রামবাংলার অন্যান্য ঐতিহ্যও ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন রয়েছে।
নদীর দুই পাড়ে মানুষের ঢল
নৌকা বাইচকে ঘিরে সকাল থেকেই ভাঙ্গা ও আশপাশের এলাকায় উৎসবের আমেজ দেখা যায়। প্রতিযোগিতা শুরুর আগেই নদীর দুই তীরে ভিড় করতে থাকেন দর্শনার্থীরা। অনেকে আশপাশের ভবনের ছাদে অবস্থান নেন। ব্রিজের ওপরও ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়।
স্থানীয়দের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থীরাও এ আয়োজন উপভোগ করেন। দীর্ঘদিন পর ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ দেখতে পেয়ে অনেকেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
স্থানীয়দের কাছে এই আয়োজন কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়; বরং এটি গ্রামীণ বাংলার পুরোনো সংস্কৃতি, নদীকেন্দ্রিক জীবন ও সামাজিক মিলনমেলারও অংশ। দীর্ঘ বিরতির পর আয়োজনটি ফিরে আসায় নতুন প্রজন্মের কাছেও হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহ্যকে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পুরস্কার পেল বিজয়ী নৌকা
প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারী বড় বাইচের নৌকাগুলোকে ফ্রিজ এবং ছোট নৌকাগুলোকে রঙিন টেলিভিশন পুরস্কার দেওয়া হয়। অতিথিরা বিজয়ীদের হাতে এসব পুরস্কার তুলে দেন।
ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক আফজালুর রহমান খান পলাশ, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. শামীমুজ্জামান, ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেন সেলিম, সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব মোল্লা, ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
দীর্ঘ বিরতির পর কুমার নদে আবারও নৌকার ছুটে চলা আর বৈঠার ছন্দে ফিরে এসেছে ভাঙ্গার পুরোনো উৎসব। নদীর বুকে রঙিন নৌকার প্রতিযোগিতা আর দুই পাড়ের মানুষের উচ্ছ্বাস যেন মনে করিয়ে দিল নদী ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে গ্রামবাংলার মানুষের সম্পর্ক এখনো কতটা গভীর।