উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় ভয়াবহ ফল বিপর্যয় ঘটেছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। গত ২২ বছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন পাসের হার। ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকট এবং দীর্ঘদিনের শিখন ঘাটতিকে এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এবার ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ২৯৩ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৮ হাজার ৭০১। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৮৫ হাজার ৫৯২।
ফলাফলে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এবার ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৭২ হাজার ১৭৬। এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ প্রাপ্তি কমেছে ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
কেন এমন ফল বিপর্যয়?
শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, গত দুই বছর ধরে পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে আগের মতো ‘সহানুভূতির নম্বর’ দেওয়ার অলিখিত চর্চা বন্ধ রয়েছে। আগে কোনো শিক্ষার্থী ২৮ নম্বর পেলে তাকে ৩৩ নম্বর দিয়ে পাস করানো কিংবা গ্রেড পরিবর্তনের জন্য অতিরিক্ত দুই থেকে পাঁচ নম্বর দেওয়ার অভিযোগ ছিল। এখন উত্তরপত্রের প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়ায় শিক্ষার্থীদের অর্জিত ফলাফলের বাস্তব চিত্র সামনে আসছে।
তবে শুধু মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন দিয়ে ফল বিপর্যয়ের পুরো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের দুর্বলতা এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকটও বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
শিক্ষাবিদদের ভাষ্য, শ্রেণিকক্ষে যেভাবে পড়ানো হয়, পরীক্ষায় অনেক সময় প্রশ্নের কাঠামো তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না। ফলে শিক্ষার্থীরা মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিলেও একটু ভিন্ন ধরনের প্রশ্নের মুখে সমস্যায় পড়ে। এতে বোঝা যায়, অনেক শিক্ষার্থী পাঠ্যবিষয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।
বিশেষ করে ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে শিক্ষক সংকট প্রকট। কলেজ ও মাদ্রাসায় এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের ভিত্তি দুর্বল থেকে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে পরীক্ষার ফলেও।
ইংরেজি ও আইসিটিতে বেশি অকৃতকার্য
বিষয়ভিত্তিক ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। এই দুই বিষয়ে মোট ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জনের খারাপ ফল সামগ্রিক পাসের হার কমিয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে বাংলা ও পদার্থবিজ্ঞানে তুলনামূলক ভালো ফল করেছেন শিক্ষার্থীরা। বাংলা বিষয়ে কুমিল্লা বোর্ডে পাসের হার ৯৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। পদার্থবিজ্ঞানে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৯৫ দশমিক ০১ শতাংশ। যুক্তিবিদ্যায় রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার ৯৪ দশমিক ৭১ শতাংশ।
ইংরেজিতে বরিশাল বোর্ডে পাসের হার সবচেয়ে কম, ৫৪ দশমিক ০৮ শতাংশ। হিসাববিজ্ঞানেও একই বোর্ডে পাসের হার মাত্র ৫২ দশমিক ২০ শতাংশ।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা কাটাতে বিশেষ কোর্স কারিকুলাম হাতে নেওয়া হয়েছে। সামগ্রিক ফলাফলে ইংরেজি ও আইসিটির খারাপ ফল বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও মানবিকে পাসের হারে বড় ব্যবধান
বিভাগভিত্তিক ফলাফলেও দেখা গেছে উল্লেখযোগ্য বৈষম্য। বিজ্ঞানে ২৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ, ব্যবসায় শিক্ষায় ৪৪ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং মানবিকে ৫৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন।
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের বিজ্ঞান শাখায় তুলনামূলক ভালো ফল করেছে ঢাকা বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৮১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ময়মনসিংহে ৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৭৪ দশমিক ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। বিজ্ঞানে সবচেয়ে কম পাসের হার বরিশাল বোর্ডে, ৫৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
মানবিক শাখায় সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে রাজশাহী বোর্ড। সেখানে পাসের হার মাত্র ৩৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ। যশোরে ৩৮ দশমিক ২১ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এ বিভাগে ঢাকা বোর্ডের পাসের হার সর্বোচ্চ ৪৮ দশমিক ২২ শতাংশ।
ব্যবসায় শিক্ষা শাখায়ও ঢাকা বোর্ড এগিয়ে। এ বোর্ডে পাসের হার ৬০ দশমিক ০৬ শতাংশ। চট্টগ্রামে ৫৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। সবচেয়ে কম পাসের হার রাজশাহী বোর্ডে, ৩৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
ঢাকা বোর্ড শীর্ষে, তলানিতে বরিশাল
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বরিশাল বোর্ড। সেখানে পাসের হার মাত্র ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
অন্যান্য বোর্ডের মধ্যে চট্টগ্রামে ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৫১ দশমিক ৪৪ শতাংশ, সিলেটে ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ, কুমিল্লায় ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ, দিনাজপুরে ৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ, রাজশাহীতে ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং যশোরে ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতেও বড় পতন
এবার নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। বোর্ডভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বোর্ডে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৭১৪ জন এবং রাজশাহী বোর্ডে ৪ হাজার ৫২০ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
এ ছাড়া যশোরে ৩ হাজার ২২৮, দিনাজপুরে ২ হাজার ৯৫৩, চট্টগ্রামে ২ হাজার ৯২৯, ময়মনসিংহে ২ হাজার ১৩৭, কুমিল্লায় ১ হাজার ৩১৩, সিলেটে ১ হাজার ২০৫ এবং বরিশালে ৯৫০ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন। মাদ্রাসা বোর্ডে ৩ হাজার ২৫০ এবং কারিগরি বোর্ডে ৮৮৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে বিজ্ঞান শাখা থেকেই এসেছে সবচেয়ে বেশি জিপিএ-৫। এ বিভাগে ২৬ হাজার ৭০২ জন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ফল অর্জন করেছেন। মানবিকে ৫ হাজার ৯৭৮ এবং ব্যবসায় শিক্ষায় ৩ হাজার ২৬৮ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
২৯৩ প্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেননি
এবার ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। গত বছর এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২। অর্থাৎ এক বছরে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি।
অন্যদিকে শতভাগ পাস করেছে মাত্র ১৩৯টি প্রতিষ্ঠান। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩৫৪। ২০২৪ সালে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৮৮। ধারাবাহিক এই পতন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান, শিক্ষকসংকট এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
পাসের হারে এগিয়ে ছাত্রীরা, জিপিএ-৫-এ ছাত্ররা
পাসের হারে এবারও ছাত্রদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন ছাত্রীরা। ছাত্রীদের পাসের হার ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ, আর ছাত্রদের ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ব্যবধান ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ পয়েন্ট।
তবে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এবার ছেলেরা মেয়েদের ছাড়িয়ে গেছেন। মোট ৪০ হাজার ৮৪ জন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ২০ হাজার ৩৬৩ জন এবং ছাত্রী ১৯ হাজার ৭২১ জন। অর্থাৎ মেয়েদের চেয়ে ৬৪২ জন বেশি ছেলে জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
এক-দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের এক মাসের মধ্যে পরীক্ষা
ফল বিপর্যয়ের মধ্যে এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন শিক্ষার্থী এক মাসের মধ্যে শুধু অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে আবার পরীক্ষা দিতে পারবেন।
সাধারণত পাবলিক পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হলে পরের বছর আবার পরীক্ষায় বসতে হয়। এতে শিক্ষাজীবনে এক বছর পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি হয়। নতুন উদ্যোগের ফলে এসব শিক্ষার্থীর অপেক্ষার সময় কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, ফল প্রকাশের পর এক মাস পুনর্নিরীক্ষণের কাজ চলবে। পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশের পর পুনঃপরীক্ষার রুটিন দেওয়া হবে। এরপর পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং ফল প্রকাশ করা হবে।
শিক্ষার মানোন্নয়নে জরুরি পদক্ষেপের তাগিদ
ফল বিপর্যয় আবারও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা সামনে এনেছে। শুধু পরীক্ষার নম্বর বাড়ানো বা পাসের হার উন্নত করাই যথেষ্ট নয়; শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে কতটা শিখছে, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জন করছে কি না এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক রয়েছেন কি না—এসব প্রশ্নের সমাধান জরুরি।
প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, ইংরেজি ও আইসিটি শিক্ষার মানোন্নয়ন, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান পদ্ধতির সংস্কার এবং মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিভাবকদেরও দাবি, শিক্ষার্থীদের ওপর শুধু ভালো ফলের চাপ না বাড়িয়ে শিক্ষার মৌলিক দুর্বলতা দূর করতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।