দুঃখের গান গেয়েই সুখের ঠিকানা খুঁজে পেলেন অলিভিয়া রদ্রিগো

বিচ্ছেদের বেদনা, প্রেমের টানাপোড়েন আর নিজের ভেতরের দ্বন্দ্বকে গানে রূপ দিয়ে বিশ্বজুড়ে শ্রোতাদের মন জয় করেছেন মার্কিন পপ তারকা অলিভিয়া রদ্রিগো। বছরের পর বছর হৃদয়ভাঙার গল্প গেয়ে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছানো এই শিল্পী এখন নিজের জীবনেও সুখের নতুন অর্থ খুঁজে পাচ্ছেন। নতুন অ্যালবামের বিপুল সাফল্য, টানা আট মাসের বিক্রীত মঞ্চানুষ্ঠানের সফর এবং নারীদের নেতৃত্বে নিজস্ব সংগীত উৎসব আয়োজন, সব মিলিয়ে ২৩ বছর বয়সী এই শিল্পীর জীবনে এসেছে নতুন এক অধ্যায়।

সম্প্রতি নিজের উদ্যোগে আয়োজিত নারীশিল্পীদের দাতব্য সংগীত উৎসব ‘ডেইজি চেইন ফিল্ডস’-এ ৫০ হাজার দর্শকের সামনে পরিবেশনা করেন রদ্রিগো। ক্যালিফোর্নিয়ার আরভিনের গ্রেট পার্কে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই উৎসবের আয়োজন ও ব্যবস্থাপনা করেছিলেন তিনি নিজেই। উৎসবে মঞ্চে ওঠার অভিজ্ঞতাকে নিজের বিয়ের সঙ্গে তুলনা করে রদ্রিগো বলেন, তাঁর জীবনে পরিচিত প্রায় সবাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। দুই দিকের পরিবারের সদস্যরাও এসেছিলেন।

উৎসবটির পরিকল্পনা করতে তাঁর দেড় বছর লেগেছে। সংগীতশিল্পী অ্যালানিস মরিসেটের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার সময় মরিসেট তাঁকে বলেছিলেন, এই আয়োজন তাঁর বিয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। কথাটি শুনে নিজের কাজের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করেছিলেন রদ্রিগো। তবে এত বড় আয়োজনের দায়িত্ব, নিজের সংগীতের আদর্শদের সঙ্গে একই মঞ্চ ভাগ করে নেওয়া এবং বিপুল দর্শকের সামনে পরিবেশনা, সব মিলিয়ে তাঁর মধ্যে কিছুটা উদ্বেগও কাজ করেছিল।

স্টিভি নিকস, সারা ম্যাকলাকলান ও অ্যালানিস মরিসেটের মতো শিল্পীদের উপস্থিতি উৎসবটিকে বিশেষ করে তোলে। তবে রদ্রিগোর কাছে ডেইজি চেইন কেবল একটি সংগীত আয়োজন কিংবা নারীকেন্দ্রিক অলাভজনক সংস্থাগুলোর জন্য দুই কোটি ডলার তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ ছিল না। ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজেকে যে শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলেছেন, এই উৎসব ছিল তারই এক গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি। নতুন অ্যালবামের মাধ্যমে নিজের সংগীতজীবনের সবচেয়ে পরিণত কাজগুলোর একটি উপহার দেওয়ার পর এখন তিনি নিজের প্রজন্মের অন্যতম স্বতন্ত্র কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন।

মাত্র ২৩ বছর বয়সেই রদ্রিগোর অভিজ্ঞতার ঝুলি অনেক সমবয়সীর চেয়ে আলাদা। অনেকেই এই বয়সে প্রথম চাকরি শুরু করেন, বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও বসবাস করতে যান কিংবা জীবনের নতুন অধ্যায়ে পা রাখেন। কিন্তু রদ্রিগো মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকেই কাজ করছেন। ডিজনির শিশু অভিনয়শিল্পী হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল। এরপর ২০২১ সালে ‘ড্রাইভার্স লাইসেন্স’ গানটি তাঁকে রাতারাতি আন্তর্জাতিক পপ তারকায় পরিণত করে।

নিয়মিত অ্যালবাম তৈরি ও সংগীত সফরে ব্যস্ত থাকার কারণে কোনো একটি জায়গায় দীর্ঘদিন থাকা হয় না তাঁর। রদ্রিগোর ভাষায়, তাঁর কাজের আশীর্বাদ যেমন আছে, তেমনি অভিশাপও রয়েছে, তিনি আসলে কোথাও স্থায়ীভাবে থাকেন না; এক জায়গায় দুই-তিন মাসের বেশি কাটানো তাঁর পক্ষে কঠিন। নিউইয়র্কে অনেকটা সময় কাটালেও লস অ্যাঞ্জেলেসকেই নিজের বাড়ি বলে মনে করেন তিনি।

উৎসবের সাফল্য উদ্‌যাপনে বন্ধুদের নিয়ে পুল পার্টি করার পরও বিশ্রামের সুযোগ বেশিক্ষণ পাননি রদ্রিগো। তাঁর ভাষায়, জীবন আবার শুরু হয়েছে সেই চেনা ছন্দে, ছুটে চলা, একের পর এক কাজ করে যাওয়া। সাক্ষাৎকারের তিন সপ্তাহ পরই শুরু হওয়ার কথা তাঁর আট মাসব্যাপী ৮৬টি মঞ্চানুষ্ঠানের সফর। সফরের সব টিকিট ইতিমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে।

নতুন অ্যালবামে প্রেম, বিচ্ছেদ ও নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া

রদ্রিগোর সর্বশেষ অ্যালবাম ‘ইউ সিম প্রিটি স্যাড ফর আ গার্ল সো ইন লাভ’ এ বছরের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করেছে। অ্যালবামের প্রথম গান ‘ড্রপ ডেড’ এপ্রিলে বিলবোর্ড হট হান্ড্রেডের শীর্ষে জায়গা করে নেয়। গানটির স্পটিফাইয়ে পরিবেশনার সংখ্যা ইতিমধ্যে ৫০ কোটির সীমা ছাড়িয়েছে। অ্যালবাম থেকে ‘দ্য কিউর’ ও ‘স্টুপিড সং’, আরও দুটি গানও শীর্ষ পাঁচে জায়গা করে নিয়েছে।

এ বছরের নারীশিল্পীদের মধ্যে অ্যালবামটির প্রথম সপ্তাহের বিক্রিও ছিল সর্বোচ্চ, ৪ লাখ ৮৫ হাজার কপি। ১২ জুন প্রকাশের পর থেকে এটি ধারাবাহিকভাবে শীর্ষ পাঁচে অবস্থান করছে।

বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি অ্যালবামটি রদ্রিগোর সংগীতজীবনের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ কাজ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। ২০২৩ সালে ‘গাটস’ প্রকাশের সময় তিনি কৈশোর পেরিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে প্রবেশ করছিলেন। তার আগে প্রকাশিত প্রথম অ্যালবাম ‘সাওর’ তাঁকে বিপুল খ্যাতি এনে দিয়েছিল। নারীশিল্পীদের অ্যালবামগুলোর মধ্যে স্পটিফাইয়ে সবচেয়ে বেশি পরিবেশিত অ্যালবামের রেকর্ডও রয়েছে ‘সাওর’-এর।

‘গাটস’ প্রথম অ্যালবামের মতো বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন না করলেও রদ্রিগোকে দীর্ঘমেয়াদি সংগীতজীবনের উপযোগী শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। ‘সাওর’ ছয়বার প্লাটিনাম মর্যাদা অর্জন করেছিল, আর ‘গাটস’ অর্জন করে তিনবার। তবে মঞ্চে তাঁর জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়তে থাকে এবং বড় বড় মঞ্চানুষ্ঠানের টিকিট বিক্রি করে তিনি নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করেন।

নতুন অ্যালবামে রদ্রিগোর লক্ষ্য শুধু আগের বিক্রি কিংবা দর্শকসংখ্যার রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়া নয়। নিজের গানের বক্তব্যকে আরও গভীর করা এবং গীতিকার হিসেবে নতুন চ্যালেঞ্জ নেওয়াও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ব্রিটিশ রক ব্যান্ড দ্য কিউরের প্রধান গায়ক রবার্ট স্মিথ রদ্রিগোর গীতিকার হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, রদ্রিগোর এই আকাঙ্ক্ষা বর্তমান সময়ের সংগীতজগতে কিছুটা ব্যতিক্রমী। নতুন অ্যালবামের ‘হোয়াটস রং উইথ মি’ গানে কণ্ঠ দিয়ে স্মিথ প্রথমবারের মতো রদ্রিগোর কোনো অ্যালবামে অংশ নিয়েছেন। গানটিকে নিজের অ্যালবামের সেরা কাজ বলে মনে করেন রদ্রিগো।

স্মিথ বলেন, সংগীতের প্রতিটি খুঁটিনাটি ঠিক করতে রদ্রিগো অনেক সময় ব্যয় করেন। তবে তিনি একই সঙ্গে দ্রুত সঠিক জায়গায় পৌঁছাতেও পারেন। স্মিথের ভাষায়, এমন কিছু ভাবনা রদ্রিগো এক সকালেই লিখে ফেলতে পারেন, যা অন্য অনেক গীতিকারের লিখতে ১৪ বছর লেগে যেতে পারে।

আকর্ষণীয় সুর ও স্মরণীয় কোরাস রদ্রিগোর জনপ্রিয়তার একটি কারণ হলেও তাঁর গানের বড় শক্তি হলো ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশের ধরন। তরুণ বয়সের প্রেম, আকর্ষণ, ঈর্ষা, আসক্তি ও সম্পর্কের জটিলতা তিনি গানে অকপটে তুলে ধরেন। নিজের দুর্বলতা কিংবা নেতিবাচক অনুভূতিগুলোও আড়াল করেন না। ফলে শ্রোতাদের কাছে তাঁর গান কেবল বিনোদন নয়, নিজেদের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি চিনে নেওয়ারও একটি জায়গা হয়ে উঠেছে।

বর্তমান মূলধারার পপসংগীতে প্রায়ই একই ধরনের ছকে তৈরি গান শোনা যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি বিপুলসংখ্যক গানও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংগীতের স্বকীয়তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে। এ ক্ষেত্রে রদ্রিগো নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, নিজের কোনো সংগীত তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করবেন না। একবার প্রযোজক ড্যান নাইগ্রোর সঙ্গে মজা করে চ্যাটজিপিটিকে তাঁর জন্য গানের নাম প্রস্তাব করতে বলার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু রদ্রিগোর ভাষায়, সেসব প্রস্তাব ছিল অত্যন্ত বাজে।

নতুন অ্যালবামটি মূলত তাঁর প্রথম প্রাপ্তবয়স্ক সম্পর্কের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আবেগের পরিবর্তন তুলে ধরে। যদিও সেই সম্পর্কটি ইংরেজ অভিনেতা লুই পার্টরিজের সঙ্গে ছিল বলে ধারণা করা হয়, রদ্রিগো নিজে অ্যালবামের প্রতিটি গানের পেছনের ব্যক্তিগত ঘটনাকে বিস্তারিতভাবে নিশ্চিত করেননি। পার্টরিজই তাঁর প্রথম প্রেমের গান ‘সো আমেরিকান’-এর অনুপ্রেরণা ছিলেন বলে মনে করা হয়। গানটি ‘গাটস’ অ্যালবামের বর্ধিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছিল।

নতুন অ্যালবামে প্রেমের প্রথম আকর্ষণ ও উত্তেজনা থেকে শুরু করে সম্পর্কের মধুর সময়, প্রথম সংকেতের মতো সমস্যা, বিচ্ছেদের কঠিন আলোচনা এবং বিচ্ছেদের পর লস অ্যাঞ্জেলেসে নতুন করে প্রেম খোঁজার অভিজ্ঞতা পর্যন্ত নানা পর্যায় উঠে এসেছে। ‘ড্রপ ডেড’ গানে নতুন আকর্ষণের রোমাঞ্চ, ‘হানিবি’তে সম্পর্কের মধুর সময়, ‘পার্পল’-এ সমস্যার আভাস, ‘লেস’-এ বিচ্ছেদের আলোচনা এবং ‘এক্সপেকটেশনস’-এ বিচ্ছেদের পরের হতাশা ফুটে উঠেছে।

অ্যালবামটি এভাবে সাজানোর পরিকল্পনা শুরুতে রদ্রিগোর ছিল না। প্রথম দিকে তিনি প্রচলিত প্রেমের গানই লিখছিলেন। কিন্তু একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর অ্যালবামের ধারণা বদলে যায়। হাতে তখন রেকর্ডিং শেষ করার জন্য আরও দুই-তিন মাস সময় ছিল। নতুন গান লেখার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের প্রযোজক নাইগ্রোর সঙ্গে পুরোনো গানগুলোও নতুন করে সম্পাদনা করেন তিনি। প্রেমের গানগুলোর মধ্যে বিষণ্নতার অনুভূতি যোগ করে সম্পর্কের ভালো-মন্দের মধ্যবর্তী ধূসর জায়গাটিও তুলে ধরতে চেয়েছেন তাঁরা।

‘হোয়াটস রং উইথ মি’ গানটির কথাই ধরা যাক। শুরুতে গানটি ছিল এমন এক মানুষের প্রেমে পড়ার গল্প, যেখানে প্রেমের তীব্রতায় নিজেকেই অস্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু বিচ্ছেদের পর সেই অনুভূতির অর্থ বদলে যায়। রদ্রিগোর ভাষায়, তখন উপলব্ধি হয় যে সম্পর্কটি আর তাঁর জন্য ভালো কিছু বয়ে আনছে না এবং সেটিই বিষণ্নতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরুণ বয়সে শুধু লিখে যাওয়ার অভ্যাস থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পাদনা ও অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়ার দক্ষতা শেখা জরুরি হয়ে উঠেছে বলেও জানান তিনি।

বিষণ্নতাকে প্রেমের গানের কেন্দ্রে রাখলেও ভালোবাসার প্রতি রদ্রিগোর আশাবাদ কমেনি। সাক্ষাৎকারের ফাঁকে তিনি সাংবাদিকের আসন্ন বিয়ে নিয়ে নানা প্রশ্ন করেন। বিশেষ করে বিয়েতে প্রথম নাচের জন্য কোন গান বেছে নেওয়া হবে, তা জানতে চান। নিজের স্বপ্নের বিয়ের গানের তালিকায় আগে থেকেই রয়েছে মডার্ন ইংলিশের ‘আই মেল্ট উইথ ইউ’। এবার তিনি টম পেটি অ্যান্ড দ্য হার্টব্রেকার্সের ‘দেয়ার্স আ ব্রেক ইন দ্য রেইন’ গানটিও প্রস্তাব করেন, যাতে তুলনামূলক প্রাণবন্ত গানের পাশাপাশি একটি ধীরলয়ের গানও রাখা যায়।

নিজের প্রেমজীবনের নানা জটিলতা নিয়ে এত খোলামেলা একজন শিল্পী অন্যের বিয়ে নিয়ে এত আগ্রহী, এ বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করা হলে রদ্রিগো বলেন, তিনি আসলে প্রেমে বিশ্বাসী একজন মানুষ। ভালোবাসা নিয়ে তিনি খুবই আশাবাদী এবং একদিন বিয়ে করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।

সংগীতের আদর্শ ও নিজস্ব পরিচয়

অন্য শিল্পীদের সংগীত নিয়ে কথা বলার সময় রদ্রিগোকে সবচেয়ে প্রাণবন্ত দেখা যায়। স্টিভি নিকসকে তিনি নিজের আদর্শ বলে মনে করেন। সারা ম্যাকলাকলানকে ডেইজি চেইন আয়োজনের অন্যতম অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেন। আর অ্যালানিস মরিসেটের ‘জ্যাগড লিটল পিল’ অ্যালবাম তাঁর সংগীতজীবনকে যেভাবে প্রভাবিত করেছে, তা নিয়েও খোলামেলা কথা বলেন।

উৎসবে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত মরিসেট রদ্রিগোকে এমন একজন শিল্পী হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যাঁর মূল্যবোধ তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়। সত্য বলা, নারীবাদ, মানবিকতা, সংবেদনশীলতার মধ্যেও শক্তি খুঁজে পাওয়া এবং সক্রিয়ভাবে সামাজিক বিষয়ে ভূমিকা রাখার প্রবণতা, এসব রদ্রিগোর কাজ ও পরিবেশের সঙ্গে মিশে আছে বলে মনে করেন তিনি।

মরিসেটের মতে, নারীদের মধ্যে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর প্রবণতা নতুন করে শক্তিশালী হচ্ছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কারণে একে অপরের ওপর নির্ভর করতেও নারীদের সতর্ক থাকতে হয়েছে। তবে কিছু শিল্পীর মধ্যে তিনি এখন একে অপরের ওপর আস্থা রাখার নতুন সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, রদ্রিগো এই পরিবর্তনের সামনের সারিতে রয়েছেন।

বর্তমানে রদ্রিগো সংগীতশিল্পী পি জে হার্ভির গান শুনছেন এবং নারী সদস্যদের নিয়ে গঠিত পাঙ্ক রক ব্যান্ড ডাই স্পিৎসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ডেইজি চেইনের মঞ্চে ব্যান্ডটির পরিবেশনা দেখে তিনি এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে পুরো সময় তাঁর গায়ে কাঁটা দিয়েছিল বলে জানান। ব্যান্ডটিকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন। ডাই স্পিৎস রদ্রিগোর আসন্ন ‘আনর‍্যাভেলড ট্যুর’-এর উদ্বোধনী শিল্পীদের মধ্যেও রয়েছে।

জ্যাক হোয়াইটের সংগীতেরও বড় ভক্ত রদ্রিগো। দ্য হোয়াইট স্ট্রাইপসের ‘এলিফ্যান্ট’ অ্যালবামের প্রচ্ছদে মেগ হোয়াইট যে পুরোনো সাদা গান্নে স্যাক পোশাক পরেছিলেন, সেটি সংগ্রহ করতে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন। নিলামে পোশাকটি ২৫ হাজার ৬০০ ডলারে বিক্রি হয়েছিল। আগস্টে ডেইজি চেইনে পোশাকটি পরার পরিকল্পনাও ছিল তাঁর। কিন্তু প্রচণ্ড গরমের কারণে শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। শীতকালে উৎসব আয়োজন করা হলে পোশাকটি পরার ইচ্ছা রয়েছে বলে রসিকতা করেন তিনি।

রদ্রিগোর সংগীতে তাঁর প্রভাবগুলোর উপস্থিতি বরাবরই স্পষ্ট। রবার্ট স্মিথের গান ‘জাস্ট লাইক হেভেন’-এর অনুষঙ্গ পাওয়া যায় ‘ড্রপ ডেড’-এ। নতুন অ্যালবামের ‘দ্য কিউর’ নামটিও স্মিথের ব্যান্ডের নামের সঙ্গে মিলে যায়। এ নিয়ে স্মিথ রসিকতা করে বলেছেন, এখন থেকে তাঁর ব্যান্ডের নাম দিয়ে ইন্টারনেটে খোঁজ করলে রদ্রিগোর গানও সামনে চলে আসবে।

স্মিথ, হোয়াইট, ফিওনা অ্যাপল, লর্ড, বিকিনি কিল এবং ক্যাথলিন হানার মতো শিল্পীদের প্রভাব রদ্রিগোকে তাঁর প্রথম দিকের তরুণ পপ শ্রোতাদের বাইরেও বৃহত্তর শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। একই সঙ্গে তাঁর সংগীতের ধরনেও এসেছে স্বাভাবিক পরিবর্তন। ‘সাওর’-এ শোবার ঘরকেন্দ্রিক পপসংগীতের প্রভাব, ‘গাটস’-এ পপ-পাঙ্কের ঝোঁক এবং নতুন অ্যালবামে নিউ ওয়েভ সংগীতের ছাপ লক্ষ করা যায়।

রদ্রিগোর এই পরিবর্তনকে প্রশংসা করেছেন রোলিং স্টোনসের মিক জ্যাগারও। তাঁর মতে, অনেকেই শুরুতে রদ্রিগোকে এক ধরনের গায়িকা হিসেবে দেখেছিলেন, কিন্তু পপ থেকে রকসংগীতে যাওয়া নারীশিল্পীদের ইতিহাস রয়েছে। ঘরানা বদলানোর এই সক্ষমতাই তাঁকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

তবে নিজের সংগীতের প্রভাবগুলো প্রকাশ্যে স্বীকার করার কারণে রদ্রিগোকে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে। ‘সাওর’-এর ‘দেজা ভু’, ‘গুড ফোর ইউ’ ও ‘ব্রুটাল’ গানগুলোর সঙ্গে টেইলর সুইফটের ‘ক্রুয়েল সামার’, প্যারামোরের ‘মিজারি বিজনেস’ এবং এলভিস কস্টেলোর ‘পাম্প ইট আপ’-এর মিল নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সুইফটকে নিজের অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা বলে উল্লেখ করা রদ্রিগো পরে ‘দেজা ভু’ গানের কৃতিত্বের তালিকায় সুইফট, জ্যাক অ্যান্টনফ ও সেন্ট ভিনসেন্টের নাম যুক্ত করেন। কেন তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং এতে দুই গায়িকার মধ্যে কোনো বিরোধ তৈরি হয়েছিল কি না, তা নিয়ে এখনো ইন্টারনেটে আলোচনা চলে।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রদ্রিগো বলেন, তিনি সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ঘটনাটি অনেক আগের, তাই সেটি নিয়ে বারবার আলোচনা করে লাভ নেই। তবে সমালোচনা সত্ত্বেও সংগীতের প্রতি নিজের ভালোবাসা কিংবা অনুপ্রেরণার উৎস নিয়ে কথা বলা বন্ধ করতে চান না তিনি। তাঁর বক্তব্য, সংগীতকে ভালো না বাসলে তিনি এই কাজই করতেন না।

নারীদের সংহতি ও প্রতিবাদের মঞ্চ

ডেইজি চেইন আয়োজনের অনুপ্রেরণা ছিল নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে শুরু হওয়া ‘লিলিথ ফেয়ার’, নারীশিল্পীদের নিয়ে আয়োজিত একটি ভ্রাম্যমাণ সংগীত উৎসব। নারীশিল্পীদের পর্যাপ্ত সুযোগ না পাওয়ার হতাশা থেকেই সারা ম্যাকলাকলান ওই উৎসবের সূচনা করেছিলেন। নিজের উৎসবের পরিকল্পনা করার সময় রদ্রিগো প্রথমেই ম্যাকলাকলানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাঁর সমর্থন চান। ম্যাকলাকলান তাঁকে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি উৎসবে অংশ নেন এবং তাঁদের দুজনকে মিলিয়ে তৈরি একটি লিলিথ নেকলেস উপহার দেন, যা তাঁরা মঞ্চে পরেছিলেন।

রদ্রিগো বলেন, ৩০ বছর আগে লিলিথ ফেয়ার আয়োজনের সময় যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের অধিকার ও নিজেদের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা আজকের তুলনায় বেশি ছিল। নিজের তরুণ ভক্তদের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি সব সময়ই ভাবেন। কনসার্টে যখন তরুণীদের বন্ধু, মা কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখতে পান, তখন তাঁদের সঙ্গে নিজের এক ধরনের আত্মীয়তা অনুভব করেন। তাঁর আশা, পৃথিবীকে তাঁদের বেড়ে ওঠার জন্য আরও নিরাপদ ও ভালো জায়গা করে তুলতে তিনি সামান্য হলেও ভূমিকা রাখতে পারবেন।

উৎসবের এক সপ্তাহ আগে রদ্রিগো প্রকাশ করেন ‘সেরেনা জয়’ গানটি। সাম্প্রতিক সময়ের মূলধারার জনপ্রিয় সংগীতে প্রতিবাদী বক্তব্যের কাছাকাছি গানগুলোর মধ্যে এটিকে অন্যতম হিসেবে দেখা হচ্ছে। গানটির নাম নেওয়া হয়েছে ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’-এর সেরেনা জয় চরিত্র থেকে, যিনি নারীবিদ্বেষী ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, অথচ শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবস্থাই তাঁর ক্ষমতা কেড়ে নেয়। গানটিতে সতর্ক করা হয়েছে, অন্যদের ওপর যা ঘটতে দেওয়া হয়, তা একসময় নিজের ওপরও নেমে আসতে পারে।

গানটিকে প্রতিবাদী সংগীত বলা হবে কি না, এমন প্রশ্নে রদ্রিগো বলেন, তাতে তাঁর আপত্তি নেই। তবে তাঁর মতে, ‘গাটস’ অ্যালবামের শুরুতে থাকা ‘অল-আমেরিকান বিচ’ গানটিও প্রতিবাদী সংগীত। ওই গানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীদের ওপর যে পরস্পরবিরোধী ও অসম্ভব প্রত্যাশা চাপিয়ে দেয়, তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি।

গানটির পরিবেশনার সময় রদ্রিগো প্রায়ই দর্শকদের চিৎকার করতে বলেন, যাতে তাঁরা নিজেদের ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করতে পারেন। ডেইজি চেইন উৎসবে তিনি দর্শকদের এমন কিছুর কথা ভাবতে বলেন, যা তাঁদের ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ করে। এরপর ৫০ হাজার মানুষের সম্মিলিত চিৎকারে প্রায় ১৩ সেকেন্ড ধরে উৎসবস্থল মুখর হয়ে ওঠে।

রদ্রিগো জানান, মঞ্চে পরিবেশনার সময় কানে মনিটর লাগিয়ে রাখেন, যাতে নিজের গান শুনতে পারেন। কিন্তু ওই অংশে তিনি মনিটর খুলে ফেলেন, কারণ দর্শকদের চিৎকার সরাসরি শুনতে চান। এমন প্রতিটি পরিবেশনার সময় কিছুক্ষণ থেমে সেই মুহূর্তটি উপভোগ করেন বলেও জানান তিনি।

বর্তমান সংগীতজগতে প্রতিবাদী গান তুলনামূলক কম কেন, এ নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। কেউ কেউ এর কারণ হিসেবে শিল্পীদের রাজনৈতিক বিষয়ে নীরবতা কিংবা রেকর্ড কোম্পানিগুলোর চাপকে দায়ী করেন। রদ্রিগোর মতে, প্রতিবাদী গান লেখা সহজ নয়। তাঁর ভাষায়, বক্তব্য এমনভাবে তুলে ধরতে হয়, যাতে তা উপদেশ দেওয়ার মতো না শোনায়। কিছুটা ব্যঙ্গ না থাকলে গানটি কেবল সবার সঙ্গে হাত ধরে শান্তির গান গাওয়ার মতো হয়ে যেতে পারে।

‘সেরেনা জয়’-এর প্রথম স্তবকে একটি টাওয়ার নির্মাণ এবং তার দেয়ালে সোনালি রং করার কথা রয়েছে। অনেকে এই কথাগুলোকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি সরাসরি ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিই অভিবাসীদের স্বেচ্ছায় দেশত্যাগে উৎসাহিত করার বিজ্ঞাপনে ‘অল-আমেরিকান বিচ’ ব্যবহার করলে রদ্রিগো সংস্থাটিকে ‘নিষ্ঠুর ও বর্বর’ বলে সমালোচনা করেছিলেন। গত মাসে জাতীয় গণমাধ্যম এনপিআরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি বলেন, পপ তারকাদের সঙ্গে বিবাদে জড়ানো এমন একটি কৌশল, যা দিয়ে কর্তৃপক্ষ অন্য গুরুতর কর্মকাণ্ড থেকে মানুষের মনোযোগ সরাতে পারে।

‘সেরেনা জয়’-এর নির্দিষ্ট কথাগুলো ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে লেখা কি না, জানতে চাইলে রদ্রিগো কিছুক্ষণ থেমে যান। পরে তিনি বলেন, গানটি মূলত নিষ্ক্রিয়তা ও উদাসীনতা নিয়ে। একজন মানুষের মানবাধিকারের ওপর আঘাত আসলে সবার মানবাধিকারের ওপর আঘাত। বিষয়টি নিয়ে তিনি অনেক ভাবছেন বলেও জানান।

ডেইজি চেইন ফিল্ডস রাজনৈতিক ছিল কি না, এ প্রশ্নের উত্তরে রদ্রিগো বলেন, অবশ্যই। তবে একই সঙ্গে এটি আনন্দের উৎসবও। তাঁর মতে, রাজনীতি ও আনন্দ পাশাপাশি থাকতে পারে, বরং থাকা প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, তরুণেরা নিজেদের নেতা এবং একে অপরের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন। মানুষকে একত্র করে, একটি উদ্যোগের অংশ বানিয়ে এবং সম্মিলিতভাবে অবদান রাখার মাধ্যমে কী সম্ভব, তা দেখাতে চেয়েছেন তিনি।

রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করা শিল্পীদের জন্য ঝুঁকিমুক্ত নয়। অনেকে ভক্ত হারানোর আশঙ্কায় কিংবা বিতর্ক এড়াতে এ ধরনের বিষয় থেকে দূরে থাকেন। সেপ্টেম্বরে ফিলিস্তিনের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার কারণে র‍্যাপার ম্যাকলমোরকে এড শিরানের সফর থেকে বাদ দিতে প্রভাব খাটিয়েছিলেন রবার্ট ক্রাফটের নেতৃত্বাধীন একদল এনএফএল দলের মালিক, এমন অভিযোগ উঠেছিল। অন্যদিকে ম্যাকলমোরের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান না নেওয়ায় শিরানও সমালোচনার মুখে পড়েন।

তবে রদ্রিগোকে এসব ঝুঁকি খুব একটা বিচলিত করছে বলে মনে হয় না। গর্ভপাতের অধিকার থেকে শুরু করে গাজার ভয়াবহ পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের স্পর্শকাতর বিভিন্ন বিষয়ে তিনি প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। ডেইজি চেইন উৎসব সম্পর্কে তিনি বলেন, সবাই সেখানে স্বাগত। কিন্তু উৎসবের বার্তার সঙ্গে কেউ একমত না হলে তাঁর টিকিট কেনার প্রয়োজন নেই।

খ্যাতির বোঝা থেকে ইতিবাচক পরিবর্তনের শক্তি

ডেইজি চেইনে নারীদের সংহতির বার্তা যেমন হাজারো দর্শকের কাছে আবেগঘন অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছিল, তেমনি এই উৎসব রদ্রিগোর নিজের জীবনেও পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে নিজের খ্যাতি সম্পর্কে দীর্ঘদিনের জটিল অনুভূতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বদলে দিয়েছে আয়োজনটি।

রদ্রিগো বলেন, ১৭ বছর বয়স থেকে তাঁকে ঘিরে যে বিপুল মনোযোগ তৈরি হয়েছে, এত দিন সেটিকে তিনি গলার ওপর ঝুলে থাকা ভারী বোঝার মতো মনে করতেন। মানুষের ছবি তোলা, ব্যক্তিগত জীবন কিংবা কার সঙ্গে সম্পর্কে রয়েছেন তা গোপন রাখতে না পারা, এসব তাঁর কাছে নেতিবাচক অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু ডেইজি চেইন তাঁকে বুঝিয়েছে, খ্যাতি কেবল বোঝা নয়; চাইলে তা ইতিবাচক পরিবর্তনের শক্তিতেও পরিণত করা যায়।

নিজের পরিচিত শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি উৎসবের জন্য তাঁদের একত্র করা এবং নারীদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার জন্য দুই কোটি ডলার সংগ্রহ করতে পারাকে তিনি এই শক্তির উদাহরণ হিসেবে দেখেন। পরিকল্পিত সংস্থাগুলোর মধ্যে ছিল পরিকল্পিত অভিভাবকত্ববিষয়ক সংস্থা, জাতীয় নারী আইন কেন্দ্র এবং বেবিটুবেবি। রদ্রিগোর মতে, খ্যাতির নেতিবাচক দিক থাকলেও তা দিয়ে সুন্দর ও অর্থবহ কাজ করা সম্ভব।

তবে জনসমক্ষে বড় হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের ওপর চাপও তৈরি করেছে। ১৩ বছর বয়সে ডিজনির অভিনয়শিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করে তিনি ‘বিজার্ডভার্ক’ ধারাবাহিকে অভিনয় করেন। পরে ‘হাই স্কুল মিউজিক্যাল: দ্য মিউজিক্যাল: দ্য সিরিজ’-এও অভিনয় করেন। কিন্তু ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ‘ড্রাইভার্স লাইসেন্স’ প্রকাশের পর তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মানুষের আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়। ‘সাওর’ অ্যালবামের একের পর এক সফল গান তাঁকে আন্তর্জাতিক তারকার আসনে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

নিজের জীবনকে দুর্ভাগ্যের গল্প হিসেবে তুলে ধরতে চান না রদ্রিগো। তিনি জানেন, যে জীবন ও সুযোগ পেয়েছেন, তা বিশেষ সুবিধাও এনে দিয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে মূল্য দেওয়া একজন শিল্পীর জন্য নিজের জীবনের গভীর ব্যক্তিগত অনুভূতি নিয়ে গান গাওয়া এবং একই সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনকে মানুষের নজর থেকে আড়াল রাখা কঠিন।

এ গ্রীষ্মে নিউইয়র্কের এক তরুণ বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের কর্মীর সঙ্গে কয়েকবার বাইরে যাওয়ার ছবি প্রকাশিত হলে তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। অর্থ খাতের কর্মীদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে প্রচলিত আলোচনার পাশাপাশি রদ্রিগোর মূল্যবোধের সঙ্গে এমন সম্পর্ক কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন। অথচ রদ্রিগো নিশ্চিত করেন, ওই ব্যক্তি তাঁর প্রেমিক ছিলেন না।

তিনি বলেন, সম্পর্ক ব্যক্তিগত বিষয় হওয়া উচিত। অথচ কোনো ছেলের সঙ্গে সাধারণভাবে বাইরে গেলেই তার ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর মানুষ এমনভাবে আলোচনা করে, যেন তাঁরা বিবাহিত। নিজের বাড়ির বাইরে তাঁকে অনুসরণ করা, ছবি তুলে সেগুলোকে তাঁর চরিত্র বিচারের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা, এসব অভিজ্ঞতাকে তিনি অনধিকারচর্চা ও হয়রানিমূলক বলে মনে করেন।

রদ্রিগো বলেন, তিনি অবিবাহিত এবং তাঁর কোনো প্রেমিক নেই। নিজের পরিচয় ও মূল্যবোধ সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত থাকলেও অন্যদের বিচার থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকা কঠিন। তাঁর ইচ্ছা, অন্য ২৩ বছর বয়সীদের মতো স্বাভাবিকভাবে জীবন উপভোগ করার সুযোগও যেন তিনি পান।

খ্যাতির কারণে কৈশোর ও তরুণ বয়সের অনেক সাধারণ অভিজ্ঞতা থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন রদ্রিগো। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ অন্যতম। ২০২২ সালে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় কবিতার একটি ক্লাসে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তিনি কিছুটা হলেও শ্রেণিকক্ষে ফেরার অভিজ্ঞতা পেয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ‘গাটস’ অ্যালবামের ‘লেসি’ গানটি লেখার অনুপ্রেরণা পান।

ভবিষ্যতে আবার পড়াশোনা শুরু করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। রদ্রিগোর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হলে ১৯ বছর বয়সেই ভর্তি হতে হবে, এ ধারণা ঠিক নয়। তিনি শ্রেণিকক্ষে বসে বক্তৃতা শুনতে চান, নতুন বিষয় শিখতে চান। তাঁর কাছে এগুলো খুব সাধারণ অভিজ্ঞতা হলেও নিজের জীবনে সেগুলো পাওয়ার সুযোগ হয়নি।

প্রথাগত কোনো ডিগ্রি অর্জন করবেন, নাকি আগ্রহের কয়েকটি কোর্সে অংশ নেবেন, এখনো তা ঠিক করেননি তিনি। তবে মেগান থি স্ট্যালিয়নের স্বাস্থ্য প্রশাসনে ডিগ্রি অর্জনের উদাহরণ এবং অভিনেত্রী এমা ওয়াটসনের স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনার কথা তাঁকে ভাবায়। তিনি বলেন, ‘ড্রাইভার্স লাইসেন্স’ গানটি প্রকাশিত না হলে এবং তাঁর কর্মজীবন এভাবে এগিয়ে না গেলে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন এবং কোনো অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন।

আপাতত তাঁর পড়াশোনার পরিকল্পনা অপেক্ষা করবে। কারণ, তাঁর ভক্তদের অপেক্ষা করার সুযোগ নেই, সামনেই দীর্ঘ সংগীত সফর, নতুন পরিবেশনা এবং আরও অনেক কাজ। তবে ডেইজি চেইনের অভিজ্ঞতা রদ্রিগোকে বুঝিয়েছে, খ্যাতির শীর্ষে থেকেও নিজের জন্য সুখের জায়গা তৈরি করা যায়। হৃদয়ভাঙার গান দিয়ে যাত্রা শুরু করা এই শিল্পীর কাছে এখন সেই সুখের একটি বড় অংশ হলো সংগীতের মাধ্যমে মানুষকে একত্র করা এবং নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়ানো। সূত্র: দ্য হলিউড রিপোর্টার