দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে আরও ৯ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে, যার মধ্যে ৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হামে এবং ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে উপসর্গ নিয়ে। মঙ্গলবার (১২ মে ২০২৬) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরে এ নিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২৪ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৬৮ জন। আর হামের লক্ষণ বা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩৫৬ জন। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, এই ৪২৪টি মৃত্যুই মূলত হামজনিত। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৮৭ জনের শরীরে সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে, যা মিলিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ২৪ জনে। এছাড়া মোট সন্দেহভাজন বা উপসর্গযুক্ত রোগীর সংখ্যা ৫১ হাজার ৫৬৭ জন।
পূর্বের ধারণা ছিল যে নবজাতক বা খুব অল্প বয়সী শিশুরা হামে আক্রান্ত হয় না। কিন্তু এবারের প্রাদুর্ভাব সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। ১৯ দিন ও ২৪ দিনের নবজাতকেরও আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ৬০টি মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মারা যাওয়া শিশুদের প্রায় অর্ধেকই (২৯টি) ছিল ৩ মাস থেকে ৮ মাস বয়সী। প্রচলিত টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী ৯ মাস বয়সের আগে হামের টিকা দেওয়া হয় না, ফলে এই শিশুরা কোনো সুরক্ষা ছাড়াই সংক্রমণের শিকার হচ্ছে। এছাড়া ৯ মাস থেকে ২ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মৃত্যু দেখা গেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে একটি উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। দেখা যাচ্ছে, হাসপাতালে ভর্তির পর প্রথম ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ৪০ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। ৬০টি মৃত্যুর তথ্যে দেখা যায়, ভর্তির দিনই ৫ জন এবং পরবর্তী দুই দিনের মধ্যে আরও ১৮ জন শিশু মারা গেছে। চিকিৎসকদের মতে, শিশুরা যখন হাসপাতালে পৌঁছাচ্ছে, ততক্ষণে তাদের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটছে। ঢাকার হাসপাতালগুলোতে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। মোট মৃত্যুর মধ্যে ৪৮টি শিশুই মারা গেছে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে, যার একটি বড় অংশ এসেছিল দেশের অন্যান্য জেলা থেকে উন্নত চিকিৎসার আশায়।
সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে একটি বড় ঘাটতি রয়ে গেছে মারা যাওয়া শিশুরা আগে টিকা পেয়েছিল কি না, তার কোনো রেকর্ড এমআইএস-এর কাছে নেই।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও সিডিসির সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বেনজীর আহমেদ এই তথ্য ঘাটতিকে ‘দুঃখজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে অন্তত ৩১ জনের টিকা পাওয়ার কথা ছিল। তারা টিকার ডোজ পূর্ণ করেছিল কি না, তা জানতে পারলে সংক্রমণের ধরণ ও টিকার কার্যকারিতা বুঝতে সুবিধা হতো। বিশেষজ্ঞ মহলের দাবি, মৃত্যুর সঠিক কারণ পর্যালোচনা ও টিকা না পাওয়া শিশুদের খুঁজে বের করে দ্রুত টিকাদানের আওতায় না আনলে এই মহামারি পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।