জনস্বাস্থ্যকে অবহেলার ফলেই বর্তমান হাম সংকট

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এটি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়; বরং দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা, টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অব্যবস্থাপনারই নগ্ন প্রতিফলন। গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা এই মন্তব্য করেন।

সংবাদ সম্মেলনে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “টিকাদানে গাফিলতি, জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং কিছু ভুল নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণেই আমরা আজ এ সংকটে পড়েছি। জনস্বাস্থ্যকে কোনো সরকারই কখনো সঠিকভাবে মূল্যায়ন করেনি।”

বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় দেশে হামের মহামারি রূপ নেওয়ার পেছনে প্রধানত কয়েকটি বড় কারণ উঠে এসেছে -

টিকাদানে গাফিলতি ও অবহেলা: নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়া এবং প্রান্তিক পর্যায়ে শিশুদের টিকার আওতায় আনতে না পারা।

ভিটামিন-এ কর্মসূচি বন্ধ থাকা: হামের জটিলতা প্রতিরোধে ভিটামিন-এ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে সরকারিভাবে শিশুদের প্রতি ছয় মাস পর ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এই কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে।

পিআইসিইউ ও আইসোলেশনের অভাব: দেশে বয়স্কদের আইসিইউ থাকলেও শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত পিআইসিইউ (Pediatric ICU) নেই। এছাড়া আক্রান্ত শিশুদের জন্য হাসপাতালে বিশেষ আইসোলেশন ব্যবস্থার তীব্র সংকট রয়েছে।

পুষ্টিহীনতা ও ব্রেস্টফিডিং হ্রাস: মায়ের দুধ খাওয়ানোর প্রচারণা কমে যাওয়ায় ব্রেস্টফিডিংয়ের হার হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি কোভিড-পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য ও মাতৃ পুষ্টিহীনতা বাড়ায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে ৯৬১ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে দেশে মোট ৪৫৩টি শিশু প্রাণ হারিয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছে ৫৬ হাজারেরও বেশি শিশু।

এই সংকট থেকে উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা সারা দেশে দ্রুত গণটিকাদান জোরদার করা, নিয়মিত ভিটামিন-এ কর্মসূচি পুনরায় চালু করা, হাসপাতালে বিশেষ ‘হাম কর্নার’ স্থাপন এবং জাতীয় বাজেটের অন্তত ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।