মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে চিকিৎসকদের পছন্দের ৫ খেলা

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে নিয়মিত মানসিক চর্চা গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সুডোকু, শব্দের ধাঁধা, তাস, দাবার মতো বোর্ড গেম এবং জিগস পাজল হতে পারে আনন্দদায়ক উপায়। এসব খেলা মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা চর্চায় সহায়তা করতে পারে।

মস্তিষ্ক সক্রিয় রাখতে কোন ধরনের খেলা নিয়মিত খেলেন চিকিৎসকেরা—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিন বিশেষজ্ঞ তাঁদের পছন্দের কয়েকটি খেলার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, নিজের আগ্রহ অনুযায়ী চ্যালেঞ্জিং খেলা বেছে নেওয়া এবং নিয়মিত খেলার অভ্যাস গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ।

১. সুডোকু

মস্তিষ্কের একাধিক দক্ষতা একসঙ্গে কাজে লাগাতে সুডোকু বেশ কার্যকর একটি ধাঁধার খেলা। স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ও ব্রেন ডিফেন্ডার্স বইয়ের লেখক ডেভিড পার্লমাটার নিজেও নিয়মিত সুডোকু খেলেন। তাঁর মতে, সংখ্যাভিত্তিক এই খেলায় যুক্তি, মনোযোগ, স্বল্প সময়ের জন্য তথ্য মনে রাখা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা চর্চা হয়।

নিউ অরলিন্স ইস্ট হাসপাতালের স্ট্রোক বিভাগের মেডিকেল ডিরেক্টর শেরিল মার্টিন-শিল্ডও নিয়মিত সুডোকু খেলেন। তিনি মাঝারি কঠিন স্তরের সুডোকু পছন্দ করেন, কারণ এতে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ থাকে, আবার সমাধান করাও সম্ভব হয়।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সুডোকু খেলার সময় মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কিছু অংশ সক্রিয় হয়। মস্তিষ্কের এই অংশ মনোযোগ ও কার্যকরী স্মৃতিশক্তির সঙ্গে যুক্ত। এসব দক্ষতায় সমস্যা তৈরি করে এমন কিছু স্নায়ু ও মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত অবস্থার ক্ষেত্রে সুডোকু উপকারী হতে পারে বলেও গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

২. শব্দের ধাঁধা ও ওয়ার্ড গেম

ক্রসওয়ার্ডসহ বিভিন্ন শব্দের খেলা মস্তিষ্কের চর্চায় সহায়ক হতে পারে। মার্টিন-শিল্ড ক্রসওয়ার্ড পাজল খেলতে পছন্দ করেন। খেলাটিকে আরও আনন্দদায়ক করতে তিনি স্বামীকেও সঙ্গে নেন।

ভার্জিনিয়ার ম্যাকলিনে কাইজার পারমানেন্টের মেমোরি কেয়ার কর্মসূচির পরামর্শক ও বয়স্কদের চিকিৎসক অ্যাঞ্জেলা সু নিউইয়র্ক টাইমসের ওয়ার্ডল ও কানেকশনস গেম পছন্দ করেন। তাঁর মতে, এসব খেলায় ভিন্নভাবে চিন্তা করতে হয়। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে খেললে সামাজিক যোগাযোগও বাড়ে।

শব্দের খেলা খেলতে গিয়ে শব্দ মনে করা, শব্দের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করা এবং বিভিন্ন ধারণার মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করতে হয়। গবেষণায় নিয়মিত ক্রসওয়ার্ড পাজল সমাধানের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি উপকারের কথাও উঠে এসেছে। প্রাথমিক কিছু গবেষণা বলছে, আলঝেইমার রোগের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে ক্রসওয়ার্ডের মতো খেলা কম খরচের একটি সহায়ক উপায় হতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

৩. তাসের খেলা

তাসের মধ্যে কৌশলনির্ভর খেলা পছন্দ করেন ডেভিড পার্লমাটার। তাঁর পছন্দের তালিকায় রয়েছে ‘হার্টস’ ও ‘সাংহাই রামি’। এসব খেলায় অন্য খেলোয়াড়দের চালের দিকে মনোযোগ রাখা, আগের চাল মনে রাখা এবং পরবর্তী পদক্ষেপের পরিকল্পনা করতে হয়। একই সঙ্গে অন্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগও তৈরি হয়।

অ্যাঞ্জেলা সু কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনে তাস খেলার পরিবর্তে হাতে তাস নিয়ে খেলার পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, হাতে তাস নেড়েচেড়ে খেলার মাধ্যমে সূক্ষ্ম পেশির নড়াচড়া এবং স্থানিক ধারণাসংক্রান্ত দক্ষতাও কাজে লাগে। চারপাশের জায়গা ও বস্তুর অবস্থান বুঝতে এসব দক্ষতা প্রয়োজন।

৪. দাবা ও অন্যান্য বোর্ড গেম

কৌশলনির্ভর বোর্ড গেমের মধ্যে ব্যাকগ্যামন ও নিজের শৈশবের প্রিয় খেলা স্ট্র্যাটেগো পছন্দ করেন পার্লমাটার। এসব খেলায় কয়েক ধাপ আগের সম্ভাব্য চাল নিয়ে ভাবতে হয়। ফলে পরিকল্পনা, যুক্তি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা চর্চা হয়।

দাবাও মস্তিষ্কের জন্য উপকারী হতে পারে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পরিচর্যাকেন্দ্রে বসবাসকারী বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা সপ্তাহে দুবার এক ঘণ্টা করে দাবা খেলেছেন, তাঁদের জ্ঞানীয় দক্ষতা ও জীবনযাত্রার মানের কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি দেখা গেছে। তবে দাবা খেলার মাধ্যমে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কতটা বাড়ে, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

৫. জিগস পাজল

জিগস পাজল বা ছবির টুকরো মিলিয়ে সম্পূর্ণ ছবি তৈরির খেলাও মস্তিষ্কের চর্চায় সহায়ক হতে পারে। পার্লমাটার ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে এ খেলা খেলেন। সম্প্রতি তাঁরা পরিবারের সদস্যদের ছবি দিয়ে তৈরি একটি পাজল সম্পন্ন করেছেন বলে জানান তিনি।

জিগস পাজল সমাধান করতে ছবির বিভিন্ন অংশের অবস্থান বুঝতে হয়, দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে হয় এবং ধৈর্যের সঙ্গে টুকরোগুলো মিলিয়ে নিতে হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব দক্ষতায় পরিবর্তন আসতে পারে। গবেষণায় নিয়মিত জিগস পাজল খেলার সঙ্গে মস্তিষ্কের বিভিন্ন জ্ঞানীয় দক্ষতায় ভালো ফলের সম্পর্কও পাওয়া গেছে।

মস্তিষ্কের জন্য কার্যকর খেলা বেছে নেবেন যেভাবে

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো একটি খেলা ভালোভাবে শিখে ফেললেই দৈনন্দিন জীবনে স্মৃতিশক্তি বা সামগ্রিক চিন্তাশক্তি একই মাত্রায় বেড়ে যাবে—এমন শক্ত প্রমাণ এখনো নেই। শিকাগো স্কুলের ক্লিনিক্যাল নিউরোসাইকোলজিস্ট ও সহকারী অধ্যাপক জানিনা কাম এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

তবে সব খেলার উপকার এক রকম নয়। অ্যাঞ্জেলা সু বলেন, যেসব খেলা নিয়মিত খেলতে হয়, দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কঠিন হয়ে ওঠে এবং চিন্তাভাবনার নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, সেগুলো বেশি উপকারী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কাম বলেন, মানুষের মস্তিষ্ক পরিবর্তনশীল। নতুন কিছু শেখার সময় মস্তিষ্কে নতুন সংযোগ তৈরি হতে পারে, যা মস্তিষ্কের কার্যক্রমে এবং খুব সামান্য মাত্রায় এর গঠনেও পরিবর্তন আনতে পারে।

খেলা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে এমন কিছু নির্বাচন করা উচিত, যা চিন্তা করতে বাধ্য করে, কিন্তু অতিরিক্ত হতাশার কারণ হয় না। পাশাপাশি নিজের ভালো লাগে—এমন খেলা বেছে নেওয়াও জরুরি। এতে নিয়মিত খেলার অভ্যাস ধরে রাখা সহজ হয়।

বৈচিত্র্যও গুরুত্বপূর্ণ। সুডোকু, শব্দের ধাঁধা, তাস কিংবা বোর্ড গেম—প্রতিটি ভিন্ন ধরনের মানসিক দক্ষতা কাজে লাগায়। তাই প্রতিদিন শুধু একটি ধাঁধা সমাধান না করে বিভিন্ন ধরনের খেলা পাল্টে পাল্টে খেলার পরামর্শ দিয়েছেন মেমোরিয়াল হারম্যান মিশার নিউরোসায়েন্স অ্যাসোসিয়েটসের স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ লুইস ক্রুজ-সাভেদ্রা।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, মস্তিষ্ক সক্রিয় রাখতে আনন্দদায়ক ও চ্যালেঞ্জিং খেলা নিয়মিত খেলুন। তবে এসব খেলা সুস্থ জীবনযাপন বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বিকল্প নয়।

সূত্র: হেলথ ডট কম