হেডফোনের অভ্যাসে কী হারাচ্ছেন তরুণেরা?

ঘুম থেকে ওঠা, কাজে যাওয়া, পড়াশোনা কিংবা ঘরের কাজ—দিনের প্রায় প্রতিটি মুহূর্তেই কানে হেডফোন রাখতে অভ্যস্ত অনেক তরুণ। গান, পডকাস্ট কিংবা পছন্দের অডিও কনটেন্ট শুনতে শুনতে সময় কাটানো তাঁদের দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত সময় হেডফোন ব্যবহার শুধু শোনার অভ্যাসেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ, নিজের চিন্তাভাবনায় মনোযোগ দেওয়া এবং চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন থাকার সুযোগও কমিয়ে দিতে পারে।

নিউইয়র্কের ২৪ বছর বয়সী আতিরা গালির কথাই ধরা যাক। গত বছরের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই তাঁর স্পটিফাই অ্যাকাউন্টে গান শোনার সময় ৩৩ হাজার ৫০০ মিনিট ছাড়িয়ে যায়। রান্নাঘরের কাজ করতেও হেডফোন ছাড়া তাঁর একঘেয়ে লাগে। সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে গান বা পডকাস্ট শোনা শুরু করেন তিনি। কর্মক্ষেত্রে বৈঠক কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় ছাড়া বেশির ভাগ সময়ই হেডফোন কানে থাকে। বাড়ি ফেরার পথ, রাতের ঘরের কাজ, এমনকি ঘুমানোর প্রস্তুতি নেওয়ার সময়ও চলে অডিও শোনা।

গালির মতো এমন অভ্যাস এখন অনেক তরুণের মধ্যেই দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এডিসন রিসার্চের মে মাসে প্রকাশিত এক জরিপ অনুযায়ী, ১৩ থেকে ৩৪ বছর বয়সীরা প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার ঘণ্টা গান, পডকাস্ট বা এ ধরনের অডিও কনটেন্ট শোনেন। অন্যদিকে স্পটিফাইয়ের এক মুখপাত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে প্ল্যাটফর্মটিতে যতবার গান স্ট্রিম করা হয়েছে, তার প্রায় ৫৬ শতাংশ এসেছে জেনারেশন জেড বা জেন জি শ্রোতাদের কাছ থেকে।

নিয়মিত হেডফোন ব্যবহার অনেকের কাছে নিরীহ অভ্যাস মনে হলেও গবেষক ও মনোবিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ, এর ফলে মানুষ ক্রমেই আশপাশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ এড়িয়ে চলতে পারেন। একই সঙ্গে নীরবতায় থাকা কিংবা নিজের চিন্তাভাবনাকে সময় দেওয়ার অভ্যাসও কমে যেতে পারে।

হেডফোন কী মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে?

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, আরভাইনের ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক গ্লোরিয়া মার্কের মতে, বেশির ভাগ মানুষ সচেতনভাবে অন্যদের এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হেডফোন ব্যবহার করেন না। এটি তাঁদের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তবে অজান্তেই হেডফোন অন্য মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে চলার একটি উপায় হয়ে উঠতে পারে।

ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের সেন্টার ফর হেলদি মাইন্ডসের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক রিচার্ড ডেভিডসনও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চলাফেরা করা শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের কানে হেডফোন থাকে। তাঁর ধারণা, ম্যাডিসন ক্যাম্পাসে চলাফেরা করা শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯০ শতাংশই হেডফোন ব্যবহার করেন। এক দশক আগে পরিস্থিতি এমন ছিল না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ডেভিডসনের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভিন্ন পরিবেশ ও পটভূমি থেকে আসা মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। কিন্তু শিক্ষার্থীরা যদি সব সময় হেডফোন কানে দিয়ে চলাফেরা করেন, তাহলে একে অন্যের সঙ্গে কথা বলা বা নতুন সম্পর্ক তৈরির সুযোগ কমে যায়।

শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নয়, ক্যাফে বা জনসমাগমের জায়গাতেও একই প্রবণতা দেখা যায়। কারও জন্য অপেক্ষা করার সময় অনেকে ফোন বের করে বসেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অপরিচিত কাউকে হাসিমুখে অভিবাদন জানানো কিংবা সামান্য কথোপকথনের সুযোগও কাজে লাগানো হয় না।

নিউইয়র্কের ২৪ বছর বয়সী অ্যানাবেল ফ্র্যাঙ্কলিন সম্প্রতি ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকের একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখছিলেন। সেখানে একটি দৃশ্যে তিনি দেখেন, একজন নারী বেঞ্চে বসে কারও জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি গান শুনছেন না, ফোনও দেখছেন না; বরং চারপাশের পরিবেশ দেখছেন।

ফ্র্যাঙ্কলিনের কাছে দৃশ্যটি অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। তাঁর মতে, এখনকার সময়ে কাউকে এভাবে একা বসে নিজের চিন্তায় ডুবে থাকতে দেখা বিরল। অথচ তিনি নিজেও ঘুম থেকে ওঠার পরপরই গান শোনা শুরু করেন এবং দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা গান বা পডকাস্ট চালিয়ে রাখেন।

হেডফোন ব্যবহারের বিষয়ে ফ্র্যাঙ্কলিন বলেন, তিনি এগুলোর ওপর নির্ভরশীল নন, তবে কানে হেডফোন রাখতে পছন্দ করেন। এটি তাঁর দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হয়ে গেছে।

মানুষের সঙ্গে ছোট যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত হেডফোন ব্যবহার মানুষের একাকিত্বের অনুভূতি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি পাঁচজনের একজন পর্যন্ত একাকিত্বে ভুগতে পারেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

ডেভিডসনের মতে, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো যোগাযোগও মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। দোকানে, ক্যাফেতে কিংবা পথে অপেক্ষা করার সময় কারও সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা বা সামান্য আলাপের সুযোগ মানুষের ভালো থাকার অনুভূতি বাড়াতে পারে।

তিনি বলেন, এ ধরনের যোগাযোগের সুযোগ সহজেই পাওয়া যায় এবং দৈনন্দিন জীবনেই তা কাজে লাগানো সম্ভব। কিন্তু মানুষ যদি সব সময় হেডফোনে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন, তাহলে এসব স্বাভাবিক সামাজিক অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

নীরবতা ও একাকী সময়েরও প্রয়োজন আছে

হেডফোন ব্যবহারের আরেকটি দিক হলো নীরবতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। গ্লোরিয়া মার্কের মতে, অনেকেই এখন কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা, নিজের চিন্তাকে স্বাভাবিকভাবে চলতে দেওয়া কিংবা একঘেয়েমি সহ্য করার অভ্যাস হারিয়ে ফেলছেন। বিরক্তি দূর করতে হাতের কাছেই ফোন, গান কিংবা অন্য কোনো বিনোদন থাকায় নীরব সময়কে আর স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা হয় না।

কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, নীরবতা মানেই সময়ের অপচয় নয়। বরং কোনো ধরনের অডিও বা ডিজিটাল বিভ্রান্তি ছাড়াই কিছুক্ষণ থাকা মানুষকে বর্তমান মুহূর্ত ও আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হতে সাহায্য করতে পারে।

ডেভিডসন সচেতন মনোযোগের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, একজন ব্যক্তি যা করছেন, তাতে তাঁর মনোযোগ আছে কি না, নাকি মন অন্য কোথাও চলে গেছে—এ বিষয়টি খেয়াল করা জরুরি।

তাঁর মতে, গান শোনা কিংবা ফোনে স্ক্রল করার মতো অভ্যাস সাময়িকভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা ও আবেগ থেকে মনোযোগ সরিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু এগুলো দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান করে না। বিনোদন বন্ধ হলে পুরোনো চিন্তা আবার ফিরে আসতে পারে।

২০১০ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জেগে থাকার সময়ের প্রায় ৪৭ শতাংশ এমনভাবে কাটান, যখন তাঁদের মন বর্তমান কাজ বা পরিস্থিতির বাইরে অন্য চিন্তায় ব্যস্ত থাকে। ডেভিডসনের ধারণা, বর্তমানে এই প্রবণতা আরও বেড়ে থাকতে পারে। তবে তাঁর এই ধারণাকে বর্তমান সময়ের নতুন পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

হেডফোন ছাড়া চলার পরীক্ষা

নিজের অভ্যাস নিয়ে কৌতূহল থেকেই হেডফোন ছাড়া চলাফেরা করার সিদ্ধান্ত নেন আতিরা গালি। তাঁর মনে হয়েছিল, গান শুনলে একঘেয়ে কাজ বা কর্মস্থলে যাওয়ার পথ কিছুটা উপভোগ্য হয়ে ওঠে। এমনকি কাজের সময়ও গান তাঁর অভিজ্ঞতাকে সহজ করে তোলে। তবে একই সঙ্গে তাঁর আশঙ্কা, এভাবে নিয়মিত গান শুনতে শুনতে তিনি হয়তো গান ছাড়া কাজ করতে বা চলাফেরা করতে অভ্যস্ততা হারাচ্ছেন।

কয়েক সপ্তাহ আগে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে গান না শোনার পরীক্ষা শুরু করেন গালি। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, এতে চারপাশের জগৎ সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়া যায় কি না, তা বোঝা।

পরীক্ষা শুরুর মাত্র দুই দিনের মধ্যে নিজের এলাকার নতুন দোকানের চারটি সাইনবোর্ড তাঁর চোখে পড়ে। অথচ প্রতিদিন একই পথে যাতায়াত করলেও আগে সেগুলো তাঁর নজরে আসেনি।

গালির উপলব্ধি, হেডফোন কানে থাকলে তিনি সাধারণত মাথা নিচু করে হাঁটেন এবং চারপাশের দিকে তেমন মনোযোগ দেন না।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, হেডফোন ব্যবহার পুরোপুরি বাদ দেওয়াই একমাত্র সমাধান নয়। বরং কখন, কতক্ষণ এবং কী উদ্দেশ্যে হেডফোন ব্যবহার করা হচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। মাঝে মাঝে গান বন্ধ রেখে হাঁটা, অপেক্ষার সময় ফোন সরিয়ে রাখা কিংবা আশপাশের মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক কথোপকথনের সুযোগ গ্রহণ করা দৈনন্দিন জীবনে মনোযোগ ও সামাজিক যোগাযোগের জায়গা বাড়াতে পারে।

সূত্র: সিএনএন